আগামী বছরের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে যাবে বাংলাদেশ। এর ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ কিছু সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে বাংলাদেশ। বিশেষ করে প্রধান প্রধান রপ্তানি বাজারে বর্তমানে যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার রয়েছে, সেটি আর থাকবে না। বর্তমানে বাংলাদেশ যে কম সুদে বৈদেশিক ঋণ পায়, সেটির সুদ বেড়ে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে বিরূপ প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। এমনকি এর প্রভাবে হঠাৎ করে বেড়ে যেতে পারে দারিদ্র্য। আর এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো বিশেষ করে ভারত লাভবান হবে।
রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে গতকাল বুধবার ‘স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ : প্রস্তুতি ও বাস্তবতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এ কথা বলেন। গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সভায় সম্মানিত অতিথির বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এছাড়া বক্তব্য দেন ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের দ্য স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের অধ্যাপক মুশতাক খান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক, গবেষক ও আমলারা।
আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থনীতিবিদ মুশতাক খান বলেন, জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ যদি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে যায়, তাহলে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্কছাড় সুবিধা কমবে, বিদেশি ঋণের সুদের হার বাড়বে এবং দেশি শিল্পকারখানা তীব্র প্রতিযোগিতায় পড়ে অনেকগুলো বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। এ সবের প্রভাবে দেশে দারিদ্র্য বেড়ে যেতে পারে।
এই অর্থনীতিবিদের মতে, বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো চাইবে, এ দেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে যাক। তাহলে তাদের সুবিধা হয়। প্রতিযোগী দেশের মধ্যে অন্যতম ভারত। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে গেলে, অর্থাৎ বাণিজ্য সুবিধা না পেলে ভারতই সবচেয়ে লাভবান হবে। জাতিসংঘের কাছে বাংলাদেশ যদি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করে, সে ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে প্রতিযোগীরা। তারা চাইবে, বাংলাদেশের আবেদন যেন বিবেচনা করা না হয়।
মুশতাক খান মনে করেন, বাংলাদেশের উচিত নেপাল, ভুটানের মতো বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা, যারা উত্তরণ পিছিয়ে দিতে আগ্রহী। বাংলাদেশ একা পিছিয়ে দিতে চাইলে প্রতিযোগীরা সেটা আটকে দিতে পারে। প্রতিযোগীদের মধ্যে ভারত থাকবে। কারণ বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধা না পেলে ভারত সবচেয়ে উপকৃত হবে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও এখন ভালো নয়। বাংলাদেশ কয়েকটি দেশকে নিয়ে একটি ব্লক (জোট) করে জাতিসংঘে যেতে পারলে উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগটি পেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৈরি করা অর্থনীতির নানা পরিসংখ্যান ছিল ত্রুটিপূর্ণ। সেই ত্রুটিপূর্ণ উপাত্তের ওপর ভিত্তি করেই স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথে যাচ্ছে বাংলাদেশ।’ তিনি আর্থিক খাতের দুরবস্থা, ব্যাংক খাতের সংকট, রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য না আসাসহ নানা সংকটের কথা উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের বিষয়টিতে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন থাকতে হবে। বিগত ১৫ বছরে দেশে গণতন্ত্র ছিল না। এখন বাংলাদেশ গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের আশা করছে। ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকার আসবে। উত্তরণের বিষয়টি নিয়ে সংসদে বিতর্ক হওয়া উচিত।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ নিয়ে একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষণা প্রধান ইশতিয়াক বারী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের তিনটি শর্তই পূরণ করেছে। ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ এ তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা। কিছু দেশ ও অঞ্চলে বাংলাদেশের বাণিজ্যে শুল্কছাড় সুবিধা ২০২৯ সাল পর্যন্ত থাকবে। আর ওষুধ উৎপাদনে মেধাস্বত্বে ছাড় সুবিধা থাকবে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে ৭১ শতাংশ রপ্তানি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ইশতিয়াক বারী উপস্থাপনায় বলেন, কোনো দেশ নিজের সিদ্ধান্তে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ পিছিয়ে দিতে পারে না। পেছাতে চাইলে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে আবেদন করতে পারে। অবশ্য এ জন্য শক্ত যুক্তি থাকতে হয়। আবেদন সিডিপি যাচাই করবে এবং সিদ্ধান্ত হবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী মো. জাকির হোসেইন খান বলেন, ‘এলডিসি থেকে বের হওয়ার জন্য সরকার তাড়াহুড়ো করছে। কিন্তু এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে যেসব সমস্যা সৃষ্টি হবে, সেগুলো সমাধানে কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আমাদের কিছুই জানা নেই।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার চিন্তা করেছিল। তবে সরকার সেখান থেকে সরে এসেছে। গত ১৩ মার্চ উপদেষ্টা পরিষদের সভায় নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আগামী বছরেই উত্তরণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে ফ্রান্সের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এএফডির কান্ট্রি ডিরেক্টর সিনথিয়া মেলা, প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ কে এম সোহেল, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ, ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকসের সহপ্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান প্রমুখ বক্তব্য দেন।
