বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের হিসাব অনুসারে দেশে হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর হার সাড়ে ৫ শতাংশে নামে। কিন্তু নানা অস্থিরতায় ২০২৪ সালে অর্থনৈতিক কর্মকা- ধীর হয়ে পড়ে। মানুষ নতুন করে হতদরিদ্র হতে শুরু করে। ফলে ২০২৪ সালে দেশে হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর হার দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। চলতি বছর সেটি আরও বেড়ে ৯ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছাবে। নতুন করে হতদরিদ্র হবে অন্তত ৩০ লাখ মানুষ। আগামী জাতীয় নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার অভাব দেখা দিলে নির্বাচনও অনিশ্চয়তায় পড়বে। নির্বাচনের সময় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতের অমিলের কারণে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে। ফলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এমন পূর্বাভাস দিয়েছে দেশের বৃহত্তম উন্নয়ন সহযোগী বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে সংস্থাটি এ তথ্য জানিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় থেকে প্রতিবেদনটি গণমাধ্যমকে জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছর শ্রমবাজারের দুর্বল অবস্থা অব্যাহত থাকবে। সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের প্রকৃত আয় কমতে পারে। অর্থনৈতিক কর্মকা-ের শ্লথগতি ঝুঁকিতে থাকা গরিব মানুষের ওপর বেশি প্রভাব ফেলছে। এতে বৈষম্য আরও বাড়বে।
শুধু অতিদারিদ্র্যের হার নয়, জাতীয় দারিদ্র্য হারও বাড়বে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। তাদের প্রতিবেদন অনুসারে, অতিদারিদ্র্যের হার বর্তমানের ৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ হবে। জাতীয় দারিদ্র্য হার গত বছরে ছিল সাড়ে ২০ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ হবে। ২০২২ সালে এটি সাড়ে ১৮ শতাংশে নেমেছিল। অবশ্য ২০২৬ সাল থেকে দারিদ্র্য ফের নিম্নমুখী হবে।
আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখা দিয়ে গরিব মানুষ চিহ্নিত করা হয়। ক্রয়ক্ষমতা সমতা (পারচেজ পাওয়ার প্যারিটি বা পিপিপি) অনুসারে, দিনে ২ দশমিক ১৫ ডলার আয় করে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা কেনার সামর্থ্য না থাকলে তাকে অতিদরিদ্র গণ্য করা হয়। তবে প্রতিটি দেশের জন্য নিজস্ব একটি দারিদ্র্যরেখা ঠিক করা হয়। বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যসীমার মানদ- হলো খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবা কেনার জন্য একজন মানুষের প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ৮২২ টাকা খরচ করার সামর্থ্য থাকতে হয়। তা যদি না থাকে তাহলে তিনি দারিদ্র্যসীমার নিচের লোক বা গরিব লোক বলে গণ্য হন। পাশাপাশি দারিদ্র্য পরিমাপে ১১৯ ধরনের বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কর্মকর্তারা।
বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখা অনুসারে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষর অনুপাত দাঁড়াবে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ, যাদের দৈনিক মাথাপিছু আয় ২ দশমিক ১৫ পিপিপি ডলারের নিচে। সংস্থাটির নিম্নমধ্য আয় দারিদ্র্য হার হিসাব অনুসারে চলতি বছর বাংলাদেশে দারিদ্র্য হার ৩৪ শতাংশ, যাদের দৈনিক মাথাপিছু আয় ৩ দশমিক ৬৫ পিপিপি ডলারের নিচে। আর সংস্থাটির উচ্চমধ্যম আয় দারিদ্র্যরেখা অনুসারে বর্তমানে দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অনুপাত ৭৫ দশমিক ২ শতাংশ, যাদের দৈনিক মাথাপিছু আয় ৬ দশমিক ৮৫ পিপিপি ডলারের নিচে।
বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ভোটের তারিখ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতের অমিলের কারণে রাজনৈতিক উত্তেজনা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। এসব কারণে অর্থনীতি ব্যাহত হবে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকবে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে মুদ্রানীতিতে কঠোর অবস্থান ধরে রাখতে হবে। ফলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সংস্থাটি মনে করে, টাকার অবমূল্যায়ন হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসবে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় বিনিয়োগই কমছে। নীতিগত অনিশ্চয়তা ও উচ্চসুদের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগে তেমন একটা গতি আসবে না। অন্তর্বর্তী সরকার মূলধনি ব্যয় হ্রাসের নীতি গ্রহণ করায় সরকারি বিনিয়োগ কমবে। কিন্তু ভর্তুকি ও সুদ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এর সুবিধা তেমন একটা পাওয়া যাবে না।
