প্রতি বছরের মতোই দেশের ব্যবসায়ীরা আসন্ন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসার বিভিন্ন ধাপে শুল্ক-করে বড় ছাড় দাবি করেছেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এবার বলা হচ্ছে ঢালাও ছাড় না দিয়ে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নেই বেশি মনোযোগী সরকার। একইসঙ্গে যৌক্তিক করের বিধান রেখে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য একটি বাস্তবসম্মত বাজেট প্রণয়ন করতে চায় সরকার।
গতকাল বুধবার ঢাকার একটি হোটেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও দি ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) আয়োজিত এনবিআরের পরামর্শক কমিটির ৪৫তম সভায় সরকার পক্ষ ও ব্যবসায়ীদের আলোচনায় এ তথ্য উঠে এসেছে। অনুষ্ঠানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন, এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান খান, বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান, এফবিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আব্দুল আউয়াল মিন্টুসহ সারা দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এ আলোচনায় অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে এফবিসিসিআই ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন, আমদানি পর্যায়ে করছাড়, ভ্যাটের কাঠামো পরিবর্তনসহ ব্যবসাবান্ধব কর কাঠামোর জন্য এনবিআরের কাছে এক হাজারেরও বেশি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। সরকার পক্ষ বলছে, বিগত সরকারের সময়ে সরকারের সব খাতেই ব্যয়ের একটা মহোৎসব চলছিল। যেখান থেকে সরকার বেরিয়ে আসতে চায়। সরকার এবার রাজস্ব আদায় বাড়ানোর চিন্তা থেকে ব্যবসায়ীদের ঢালাও ছাড় না দিয়ে ন্যয্যতার ভিত্তিতে করহার নির্ধারণে কাজ করছে। যেখান থেকে বাড়তি রাজস্ব আদায় হবে এবং ব্যবসায়ীরা ব্যবসার জন্য একটি স্বস্তির পরিবেশ পাবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আসন্ন অর্থবছরের জাতীয় বাজেট হবে বাস্তবসম্মত এবং ব্যবসাবান্ধব। বাজেটে চেষ্টা করব ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ আরও সহজ করার। কর অব্যাহতির দিন শেষ।
অর্থ উপদেষ্টা জানান, দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বেশকিছু বিনিয়োগকারীর সঙ্গে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি, আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের সঙ্গেও আলোচনা হচ্ছে। শুধু সরকারি খাত নয়, বেসরকারি খাতের টেকসই উন্নয়নে সরকার কাজ করছে। আমাদের ভুল-ত্রুটি হতে পারে, তবে আমরা আপনাদের জন্যই কাজ করছি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালেয়র উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো ব্যয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে ন্যায্যতাভিত্তিক এবং লক্ষ্যভিত্তিক বাজেট প্রণয়ন করা।
তিনি বলেন, আজকের আলোচনায় এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন, ট্রাম্পের কারণে রপ্তানি বাণিজ্যে যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এর প্রভাব মোকাবিলায় কোনো আলোচনা নেই। সবাই শুধু ছাড় চাচ্ছেন। আপনারা যে প্রস্তাবনাগুলো দিয়েছেন সেগুলো অস্পষ্ট, অথচ আপনারা বহু দিন ধরে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করেন। আপনারা যদি দায়িত্ব নিয়ে (গুরুত্ব বিবেচনায়) প্রস্তাবনা না দেন, তাহলে এনবিআরও আপনাদের দায়িত্ব নেবে না। এতদিন হয়েছেও এমনটাই। আপনারা যদি ট্যাক্সের বিষয়গুলো রিয়ালাইজ না করেন তাহলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, বিগত সময়ে নয়-ছয়ের অর্থনীতিতে ব্যয়ের মহোৎসব ছিল, সবগুলো বিভাগে মনে হয়েছে ঈদ পালন করা হচ্ছে। অথচ সেভাবে রাজস্ব আদায় নেই। খরচের মহোৎসবের জন্যই বাজেট করা হতো। এখন কর ন্যয্যতা বাস্তবায়ন না করা গেলে দুর্বৃত্তায়ন থেকে যাবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের দেশে ডিরেক্ট কর থেকে বেশিরভাগ রাজস্ব আসে, যা দুই-তৃতীয়াংশ গরিবরা দেয়। আর এক -তৃতীয়াংশ আসে আয়কর থেকে। অথচ উন্নত দেশগুলোতে আয়কর থেকে রাজস্ব আদায়ের হার প্রায় ৫০ ভাগের কাছাকাছি।
তিনি বলেন, ভ্যাট কমানোর প্রস্তাব পেয়েছি, সব প্রস্তাবেই ট্যাক্স কমানোর কথা বলা হচ্ছে। করপোরেট কর আরও কমানোর দাবি করা হচ্ছে। অথচ প্রতিষ্ঠানগুলোর মার্কেট শেয়ার ও ট্যাক্স অনুপাত ঠিক নেই। এই যে একটা অবস্থা এখান থেকে বের হতে হবে। এর জন্য অটোমেশন জরুরি। যেটা আমরা শুরু করেছি।
রিহাব আমাদের জমির নিবন্ধন ফি কমানোর কথা বলছে, যাতে জমিতে ব্যয় কমানো যায়। কিন্তু দলিল রেজিস্ট্রেশন প্রকৃত মূল্যের কাছাকাছি না আসলে ট্যাক্স কমানো যাবে না। এখানে রুল অব ল- না থাকার কারণে করদাতারা ফাঁকি দিয়েও পার পেয়ে যান।
এদিকে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক বলেন, চাকরির সুযোগ তৈরিতে বেসরকারি খাতের বিকল্প নেই। যে কারণে সরকারকে ব্যবসা থেকে সরিয়ে আনার কাজ চলছে, ব্যবসা করবে ব্যবসায়ীরা। এ জন্য বেসকারি খাতের কাছে আরও সুনির্দিষ্ট এবং গঠনমূলক বাজেট প্রস্তাবনা আসা উচিত। এই যে ১ হাজারের বেশি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে এগুলোর কোনোটাই রাখতে পারবেনা, সময় নেই। এর জন্য সারা বছর খাতভিত্তিক আলোচনা দরকার।
তিনি বলেন, আপনারা এক হাজারের বদলে ১৫টা প্রস্তাবনা দেন, যেটা বাস্তবভিত্তিক। যেখানে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হবে, থাকবে ফেয়ার কম্পিটিশন। দেখা যায়, আপনাদের মার্কেট শেয়ার ও ট্যাক্স শেয়ারে মিসম্যাস নেই। এ জন্য কোনো কাঠামোগত পরিবর্তনে নির্দিষ্ট পরামর্শ দিতে পারেন বলে ব্যবসায়ীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বক্তৃতাকালে মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, জাহাজশিল্পে যন্ত্রপাতি আমদানিতে এক সময় শুল্ক ছিল ১ শতাংশ। কয়েক মাস আগে এটা সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে গত পাঁচ মাসে একটি জাহাজও কেনা হয়নি। আমদানি শুল্ক আবার ১ শতাংশে নামলে আনলে তা কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়াতে সহায়ক হবে।
পারভেজ সাজ্জাদ আখতার নামের ব্যবসায়ী ভ্যাট না বাড়ানোর দাবি করেন। অন্য ব্যবসায়ীরা বলেন, সরকার ৪ দিনের মধ্যে পোর্ট থেকে পণ্য খালাস করতে বলেছে। এটা সম্ভব নয়, আবার পোস্ট ড্যামেজ চার্জ ডাবল করেছে। এটা কমাতে হবে। প্রকৃত মূল্যে পণ্যের শুল্কায়ন, এআইটি বাতিল করাসহ বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন।
ব্যবসায়ীদের হাজারের বেশি প্রস্তাবনার কিছু মূল অংশ তুলে ধরেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক হাফিজুর রহমান। তিনি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানকে দৃঢ় করতে- ব্যবসায়িক খরচ কমিয়ে আনা, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও সুরক্ষা, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুষম বিনিয়োগ সহায়ক মুদ্রা ও শুল্ক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, শিপিং ও পরিবহন ব্যয় হ্রাস, সাশ্রয়ী ও গুণগত জ্বালানি নিশ্চিতকরণ, স্বচ্ছতা ও সুশাসন বাস্তবায়নের পাশাপাশি কর আদায়ের ক্ষেত্রে হয়রানি ও জটিলতা দূরীকরণের মাধ্যমে ব্যবসাবান্ধব কর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতের দাবি তুলেন তিনি।
তিনি প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানির বিপরীতে উৎসে করহার ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫০ শতাংশ করা, করমুক্ত আয়সীমা এক লাখ টাকা বাড়ানো, স্থানীয় ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূসকের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারণ, শিল্পের উপকরণ ও কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন।
