পবিত্র কোরআনের সুরা কাহাফে হজরত মুসা (আ.) ও হজরত খিজির (আ.)-এর সাক্ষাতের বিস্ময়কর ঘটনা উল্লেখ আছে। এটি এক অনন্য ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, যেখানে জ্ঞানের প্রকৃতি, ধৈর্য, মহান আল্লাহর হেকমত, গায়েবের ওপর ইমান, এই সব বিষয় চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। একবার হজরত মুসা (আ.) মনে করেছিলেন, তার চেয়ে জ্ঞানী কেউ নেই। মহান আল্লাহ তাকে জানালেন, এক বান্দা আছেন যিনি বিশেষ জ্ঞানপ্রাপ্ত, তিনি হচ্ছেন খিজির (আ.)। হজরত মুসা (আ.) সমুদ্র পথে সফর করে তার খুঁজ করেন এবং তার সঙ্গে সফর করার অনুমতি চান। খিজির (আ.) শর্ত দেন, তিনি যেসব কাজ করবেন সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না যতক্ষণ না তিনি নিজেই ব্যাখ্যা দেন। সেই সফরে তিনটি ঘটনা ঘটে। প্রতিটি ঘটনার পর মুসা (আ.) প্রশ্ন করেন এবং খিজির (আ.) তাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, তিনি প্রশ্ন না করার কথা বলেছিলেন। শেষে খিজির (আ.) মুসা (আ.)-কে ব্যাখ্যা করেন যে, এসব কাজ তিনি আল্লাহর নির্দেশে করেছেন এবং এর পেছনে ছিল গভীর হেকমত। কোরআনের সেই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণী তুলে ধরা হলো।
একদিন হজরত মুসা (আ.) বনি ইসরাইলের এক সভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। সেখানে এক ব্যক্তি মুসা (আ.)-কে প্রশ্ন করেন, মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী কে? হজরত মুসা (আ.) বলেন, আমিই সবার চেয়ে বেশি জ্ঞানী। এই উত্তরের কারণ ছিল, হজরত মুসা (আ.)-এর জানামতে, মহান আল্লাহ তাকেই বেশি জ্ঞান দিয়েছেন। কিন্তু মহান আল্লাহ মুসা (আ.)-এর এই উত্তর পছন্দ করলেন না। এখানে বিষয়টি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়াই ছিল আদব। অর্থাৎ মুসা (আ.)-এর এ কথা বলা উচিত ছিল যে, মহান আল্লাহই ভালো জানেন, কে অধিক জ্ঞানী।
এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে হজরত মুসা (আ.)-এর কাছে ওহি নাজিল হলো যে, দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে অবস্থানকারী আমার এক বান্দা আপনার চেয়ে বেশি জ্ঞানী। এ কথা শুনে মুসা (আ.) তার কাছ থেকে জ্ঞানলাভের প্রার্থনা জানালেন। বললেন, হে আল্লাহ! আমাকে তার ঠিকানা বলে দিন। মহান আল্লাহ বললেন, থলের মধ্যে একটি মাছ নিয়ে নিন এবং দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলের দিকে সফর করুন। যেখানে পৌঁছার পর মাছটি নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে, সেখানেই আমার এই বান্দার সাক্ষাৎ পাবেন। মুসা (আ.) নির্দেশমতো থলের মধ্যে একটি মাছ নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন। সঙ্গে তার খাদেম ইউশা ইবনে নুনও ছিলেন।
পথিমধ্যে প্রস্তরখণ্ডের ওপর মাথা রেখে তারা ঘুমিয়ে পড়লেন। এখানে হঠাৎ মাছটি নড়াচড়া করতে লাগল এবং থলে থেকে বের হয়ে সমুদ্রে চলে গেল। (মাছটি জীবিত হয়ে সমুদ্রে যাওয়ার সময় আরও একটি মুজেজা প্রকাশ পেল যে,) মাছটি সমুদ্রের যে পথ দিয়ে চলে গেল, মহান আল্লাহ সে পথে পানির স্রোত বন্ধ করে দিলেন। ফলে সেখানে পানির মধ্যে একটি সুড়ঙ্গের মতো হয়ে গেল। ইউশা ইবনে নুন এই আশ্চর্যজনক ঘটনাটি দেখছিলেন।
মুসা (আ.) যখন ঘুম থেকে জাগলেন, তখন ইউশা ইবনে নুন আশ্চর্যজনক ঘটনাটি তাকে বলতে ভুলে গেলেন এবং সেখান থেকে তারা সামনে রওনা হয়ে গেলেন। পূর্ণ একদিন একরাত সফর করার পর সকাল বেলা মুসা (আ.) খাদেমকে বললেন, আমাদের নাশতা আনো; যথেষ্ট ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। নাশতা চাওয়ার পর ইউশা ইবনে নুনের মাছের ঘটনা মনে পড়ে গেল। তিনি ভুলে যাওয়ার ওজর পেশ করে বললেন, শয়তান আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল।
অতঃপর বললেন, মৃত মাছটি জীবিত হয়ে আশ্চর্যজনকভাবে সমুদ্রে চলে গেছে। তখন মুসা (আ.) বললেন, সে স্থানটিই তো আমাদের লক্ষ্য ছিল। (অর্থাৎ মাছের জীবিত হয়ে নিরুদ্দেশ হওয়ার স্থানটিই ছিল গন্তব্যস্থল।) সে মতে তৎক্ষণাৎ তারা ফিরে চললেন এবং স্থানটি পাওয়ার জন্য পূর্বের পথ ধরেই চললেন।
প্রস্তরখণ্ডের কাছে পৌঁছে দেখলেন, এক ব্যক্তি আগাগোড়া চাদরে আবৃত হয়ে শুয়ে আছেন। মুসা (আ.) তাকে সালাম জানালেন। খিজির (আ.) বললেন, এই (জনমানবহীন) প্রান্তরে সালাম কোথা থেকে এলো? মুসা (আ.) বললেন, আমি মুসা। খিজির (আ.) প্রশ্ন করলেন, বনি ইসরাইলের মুসা? তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ, আমিই বনি ইসরাইলের মুসা। আমি আপনার কাছ থেকে ওই বিশেষ জ্ঞান অর্জন করতে এসেছি, যা মহান আল্লাহ আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন। খিজির (আ.) বললেন, যদি আপনি আমার সঙ্গে থাকতে চান, তবে কোনো বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন না, যে পর্যন্ত আমি নিজে তার প্রকৃত অর্থ বলে না দিই। এ কথা বলার পর উভয়ে সমুদ্রের তীর ধরে চলতে লাগলেন। ঘটনাক্রমে একটি নৌকা এসে গেলে তারা নৌকায় আরোহণের ব্যাপারে কথাবার্তা বললেন। মাঝিরা খিজিরকে চিনে ফেলল এবং পারিশ্রমিক ছাড়াই তাদের নৌকায় তুলে নিল। নৌকায় চড়েই খিজির (আ.) কুড়ালের সাহায্যে নৌকার একটি তক্তা তুলে ফেললেন।
এতে মুসা (আ.) (স্থির থাকতে না পেরে) বললেন, তারা কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই আমাদের নৌকায় তুলে নিয়েছে। আপনি কি এরই প্রতিদানে তাদের নৌকা ভেঙে দিলেন যাতে সবাই ডুবে যায়? আপনি অতি মন্দ কাজ করলেন। খিজির (আ.) বললেন, আমি আগেই বলেছিলাম, আপনি ধৈর্য ধরতে পারবেন না। তখন মুসা (আ.) ওজর পেশ করে বললেন, আমি ওয়াদার কথা ভুলে গিয়েছিলাম; আমার প্রতি রুষ্ট হবেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ ঘটনা বর্ণনা করে বললেন, মুসা (আ.)-এর প্রথম আপত্তি ভুলক্রমে, দ্বিতীয় আপত্তি শর্ত হিসেবে এবং তৃতীয় আপত্তি ইচ্ছাক্রমে হয়েছিল।
অতঃপর তারা নৌকা থেকে নেমে সমুদ্রের তীর ধরে চলতে লাগলেন। হঠাৎ খিজির এক বালককে অন্যান্য বালকের সঙ্গে খেলা করতে দেখলেন। খিজির নিজ হাতে বালকটির মাথা তার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন। বালকটি মারা গেল। মুসা (আ.) বললেন, আপনি একটি নিষ্পাপ শিশুকে বিনা অপরাধে হত্যা করেছেন। এ যে বিরাট গুনাহের কাজ করলেন। খিজির বললেন, আমি তো আগেই বলেছিলাম, আপনি ধৈর্য ধরতে পারবেন না। মুসা (আ.) দেখলেন, এ ব্যাপারটি আগের ঘটনার চেয়েও গুরুতর। তাই বললেন, এরপর যদি কোনো প্রশ্ন করি তবে আপনি আমাকে পৃথক করে দেবেন। আমার ওজর-আপত্তি চূড়ান্ত হয়ে গেছে।
অতঃপর তারা আবার চলতে লাগলেন। এক গ্রামের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় তারা গ্রামবাসীর কাছে খাবার চাইলেন। গ্রামবাসীরা খাবার দিতে অস্বীকার করল। খিজির এই গ্রামের একটি প্রাচীরকে দেখলেন পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থায়। তিনি নিজ হাতে প্রাচীরটি সোজা করে দিলেন। মুসা (আ.) বিস্মিত হয়ে বললেন, আমরা তাদের কাছে খাবার চাইলে তারা দিতে অস্বীকার করল। অথচ আপনি তাদের এত বড় কাজ করে দিলেন; ইচ্ছা করলে এর পারিশ্রমিক তাদের কাছ থেকে আদায় করতে পারতেন। খিজির (আ.) বললেন, এখন শর্ত পূর্ণ হয়ে গেছে। এটাই আমার ও আপনার মধ্যে বিচ্ছেদের সময়। এরপর তিনি তিনটি ঘটনার প্রকৃত কারণ মুসা (আ.)-এর কাছে বর্ণনা করেন।
নৌকা ছিদ্র করার কারণ : নৌকাটি ছিল কয়েকজন দরিদ্র ব্যক্তির। তারা সমুদ্রে জীবিকা অন্বেষণ করত। আমি ইচ্ছা করলাম যে, সেটিকে ত্রুটিযুক্ত (নষ্ট) করে দিই। (কেননা) তাদের অপরদিকে ছিল এক বাদশাহ। সে বলপ্রয়োগে প্রত্যেকটি (ভালো) নৌকা ছিনিয়ে নিত। (সুরা কাহাফ ৭৯)
ছোট বাচ্চাকে মারার কারণ : বাচ্চাটির পিতা-মাতা ছিল মুমিন। অতঃপর আশঙ্কা করলাম যে, সে সীমালঙ্ঘন ও কুফরির মাধ্যমে তাদের অতিষ্ঠ করে তুলবে। তাই আমরা চাইলাম যে, তাদের রব যেন তাদের তার পরিবর্তে এক সন্তান দান করেন, যে হবে পবিত্রতায় উত্তম ও দয়া-মায়ায় ঘনিষ্ঠতর। (সুরা কাহাফ ৮০-৮১)
প্রাচীর সোজা করার কারণ : প্রাচীরটি ছিল নগরের দুজন পিতৃহীন বালকের। এর নিচে ছিল তাদের (বাবার রেখে যাওয়া) গুপ্তধন এবং তাদের পিতা ছিল সৎকর্মপরায়ণ। সুতরাং আপনার পালনকর্তা দয়াপরবশ ইচ্ছা করলেন যে, তারা যৌবনে পদার্পণ করুক এবং নিজেদের গুপ্তধন উদ্ধার করুক। আমি নিজ মতে এটা করিনি। আপনি যে বিষয়ে ধৈর্যধারণ করতে অক্ষম হয়েছিলেন, এই হলো তার ব্যাখ্যা। (সুরা কাহাফ ৮২)
