আপাতত রাখাইনে হচ্ছে না মানবিক করিডর

আপডেট : ০৫ মে ২০২৫, ০৭:২১ এএম

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান সহিংসতা এবং দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের প্রস্তাবিত ‘মানবিক করিডর’ আপাতত হচ্ছে না। বাংলাদেশ নীতিগতভাবে সম্মতি প্রকাশ করলেও বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় শুরু হয়। নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি ও আরও রোহিঙ্গা দেশে প্রবেশের আশঙ্কা করা হয়। এ ছাড়া জাতিসংঘের এ প্রস্তাবে মিয়ানমার সরকার রাজি নয়। আবার ঢাকার সঙ্গেও এ নিয়ে কোনো চুক্তি হয়নি। তাছাড়া সহযোগিতা পাঠানোর ক্ষেত্রে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধসহ আরাকান আর্মিকে জাতিসংঘ থেকে যে সব শর্ত দেওয়া হয়েছে সেটিরও খেলাপ হচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, করিডর ইস্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক চাপ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যু এবং আরাকান আর্মির আস্থাহীনতা এবং নেপিদোর রাজি না হওয়া এই মুহূর্তে মানবিক করিডর থেকে সরে আসার মূল কারণ।

এরই মধ্যে গতকাল রবিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক ত্রাণ সহায়তা পাঠাতে বাংলাদেশ সরকার কোনো ধরনের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। তিনি বলেন, মানবিক করিডর নিয়ে কেবল প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে, কোনো চুক্তি নয়।

করিডর নিয়ে যা যা হলো : এ বছরের মার্চে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বাংলাদেশ সফরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। জানা গেছে, সে সময়ই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, মিয়ানমারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জাতিসংঘ বাংলাদেশ থেকে মানবিক সহায়তা চ্যানেল চালু করতে চায়। সফরকালে এক প্রশ্নের জবাবে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছিলেন, মিয়ানমারের ভেতরে মানবিক সহায়তা জোরদার করা খুব দরকার। এতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হবে। আর এজন্য বাংলাদেশকে চ্যানেল হিসেবে ব্যবহার করতে অনুমোদন ও সহযোগিতা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গুতেরেসের সফরে সরকারের পক্ষ থেকে রাখাইনে মানবিক করিডরের নীতিগত সম্মতির কথা জানানো হয়। ঠিক সেই সময় থেকেই ঢাকার পক্ষ থেকে মানবিক চ্যানেল চালু করার বিষয়ে নেপিদোর কূটনীতিকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। আবার জাতিসংঘ থেকেও এ নিয়ে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হয়। কিন্ত নেপিদো তাদের নেতিবাচক মনোভাবের কথা জানায়। ঢাকাকেও এ বিষয়টি বলা হয়।

এদিকে, এপ্রিলের শেষদিকে মানবিক করিডর নিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছিলেন, ‘নীতিগতভাবে আমরা এতে সম্মত, তবে শর্তসাপেক্ষে।’ তার এ বক্তব্যের পর করিডর ইস্যুতে বিতর্ক শুরু হলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব তা প্রত্যাখ্যান করেন সরকার এমন কোনো আলোচনাতেই যায়নি বলে দাবি করেন তিনি। উপদেষ্টার বক্তব্যের দুদিন পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘সরকার জাতিসংঘ বা অন্য কোনো সংস্থার সঙ্গে তথাকথিত মানবিক করিডর নিয়ে কোনো আলোচনা করেনি। এখনো রাখাইনে মানবিক সহায়তা পাঠানোর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। আমাদের অবস্থান হলো, যদি জাতিসংঘের নেতৃত্বে রাখাইনে মানবিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে বাংলাদেশ লজিস্টিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত আছে। আমরা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। যথাসময়ে এ বিষয়ে দেশের প্রাসঙ্গিক স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।’

জাতিসংঘও বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। গত বুধবার ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর মুখপাত্র বলেছেন, ‘করিডর চালু করতে হলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ের অনুমতি লাগবে। তা না হলে জাতিসংঘের পক্ষে রাখাইনে সরাসরি কোনো সহায়তা পাঠানো সম্ভব নয়।’

এর আগে গত ৮ এপ্রিল এক প্রেস ব্রিফিংয়ে খলিলুর রহমান বলেন, করিডর কথাটি তিনি (জাতিসংঘ মহাসচিব) বলেননি, চ্যানেল বলেছেন। করিডরের একটি আইনগত অর্থ আছে। চ্যানেলের বিষয়টি তিনি (জাতিসংঘের মহাসিচব) আমাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেই বলেছেন। আমি যখন তার (জাতিসংঘ মহাসচিব) সঙ্গে গত ৭ ফেব্রুয়ারি দেখা করতে গেলাম, আমাদের পরিকল্পনা, মিয়ানমার, আরাকান আর্মি কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থা, সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই আমি জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে গিয়েছি। রাখাইনে যে মানবিক সমস্যা ও সংকট, সেটা মোকাবিলার জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্যের বিকল্প নেই। সেই কাজটি জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানেই হবে।

করিডর ইসুতে দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়, বিশেষ করে বিএনপি, জামায়াত, হেফাজতে ইসলাম, এনসিপি এবং সুশীল সমাজের সমালোচনার ফলে সরকার অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য হয়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত আসতে হবে জনগণের কাছ থেকে। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সংসদের কাছ থেকে।

দিলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মানবিক করিডর দেওয়ার ব্যাপারে সরকার যে ‘নীতিগত সিদ্ধান্ত’ নিয়েছে তাতে দেশের ‘স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির’ মুখে পড়বে।

জানা গেছে, মানবিক করিডর নিয়ে মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে মিয়ানমার সরকার বলছে যে রাখাইনে কোনো মানবিক সংকট নেই এবং সেখানে কেউ না খেয়ে মারা যাচ্ছে, এমন নজিরও নেই। তা হলে কেন মানবিক চ্যানেল চালু করা হবে।

‘করিডর নিয়ে শুধু আলোচনা হয়েছে কোনো চুক্তি হয়নি’ : গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক ত্রাণ সহায়তা পাঠাতে বাংলাদেশ সরকার কোনো ধরনের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান। গতকাল বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি বলেন, মানবিক করিডর নিয়ে শুধু প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে, কোনো চুক্তি নয়। সেমিনারটির যৌথ আয়োজক সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও বিইউপি।

ড. খলিল বলেন, ‘কিছু প্রতিবেশী দেশের গণমাধ্যম বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে আরাকানে “প্রক্সিযুদ্ধ” শুরু করার গুজব ছড়াচ্ছে, যা অনভিপ্রেত।’ তিনি সাফ জানিয়ে দেন, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তাহলে বাংলাদেশ পরিণত হবে ‘প্রতিবেশী দেশের ডাম্পিং গ্রাউন্ডে’।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এখনই কেন সম্ভব নয়, জানালেন উপদেষ্টা এদিন সেমিনারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘গৃহযুদ্ধ, নিরাপত্তাহীনতা ও নাগরিকত্ব নিশ্চয়তার অভাবে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা এখন অনেক দূরে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গাদের সেই জায়গায় ফিরিয়ে দিতে পারি না, যেখান থেকে নির্যাতনের ভয়ে পালিয়ে এসেছে।’

দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ব্যর্থতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বহু বছর ধরে আলোচনা চললেও একটি রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো যায়নি। তাই এখন আন্তর্জাতিক স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।’ তার মতে, স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারের তিন প্রধান পক্ষÑ সামরিক জান্তা, এনইউজি এবং আরাকান আর্মির সম্মিলিত ভূমিকা দরকার।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যেতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পরই তারা ফিরে যাবে। মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ, দেশটির অভ্যন্তরে বিভক্তি এবং বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তার অব্যাহত অনুপস্থিতির কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা এখন সুদূর পরাহত।

মিয়ানমারে কখনো গণতন্ত্র ছিল না উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, ‘মিয়ানমারে কখনো গণতন্ত্র ছিল না। অং সান সু চির অধীনেও এটি একটি আধাসামরিক শাসনব্যবস্থা হিসেবে কাজ করেছিল। আমরা এখন যা দেখছি, তা হলো পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধ। মিয়ানমারের এখন মূল অংশীদার সামরিক জান্তা, আরাকান আর্মি এবং জাতীয় ঐক্য সরকার (এনইউজি)। যেকোনো স্থায়ী সমাধানে এই তিনপক্ষকেই যুক্ত হতে হবে। বিশেষ করে আরাকান আর্মিকে, যারা এখন রাখাইন নিয়ন্ত্রণ করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত