প্রথমবার নিলামের ৬০ শতাংশ মূল্য না পেলে নিলাম প্রক্রিয়া শেষ করা যেত না। দ্বিতীয় নিলামে আবার একই পণ্য উত্থাপন করা হতো। আর এভাবে বছরের পর বছর ধরে আটকে থাকত পণ্য। এ কারণেই চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে প্রায় ১০ হাজার কনটেইনার আটকে রয়েছে। এসব কনটেইনারে এমনও অনেক রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে, যা বন্দরে নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। তবে এখন থেকে প্রথমবারের নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতাকে পণ্য বরাদ্দ দেওয়া যাবে। বুধবার এ-সংক্রান্ত বিশেষ অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
কাস্টমসের সহকারী কমিশনার (নিলাম শাখা) সাকিব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণত প্রথম নিলামে ভিত্তিমূল্যের ৬০ শতাংশ দাম পাওয়া না গেলে দ্বিতীয় নিলামে। দ্বিতীয় নিলামে আবার প্রথম নিলামের সমান মূল্য পাওয়া না গেলে তৃতীয় নিলামে যেতে হয়। এতে বিলম্বিত হচ্ছে। আবার কোনো পণ্যের ওপর মামলা থাকলে তা নিলামও করা যায় না। সব মিলিয়ে আমরা চাইলেও পণ্য নিলাম বা ধ্বংস করতে পারতাম না। বিশেষ অধ্যাদেশে এগুলো থাকছে না। আমরা এখন প্রথমবারের নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতাকে পণ্য বরাদ্দ দিয়ে দিত পারব।’
সাকিব হোসেন বলেন, ‘২০২৩-এর আগ পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে পড়ে রয়েছে। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে সেসব কনটেইনার নিলাম প্রক্রিয়ায় দ্রুত নিষ্পত্তি করত পারব।’
নতুন এই বিশেষ অধ্যাদেশে সব পণ্যের নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কী পরিমাণ সময় লাগতে পারে প্রশ্নের জবাবে সাকিব হাসান বলেন, ‘আশা করছি আগামী ছয় মাসের মধ্যে নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বন্দর থেকে সব কনটেইনার সরিয়ে নিতে পারব।’
এদিকে বন্দর সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে প্রায় ১০ হাজার কনটেইনার পড়ে রয়েছে। নিলামের অপেক্ষায় থাকা এসব কনটেইনারের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ৫৩ হাজার ৫১৮ একক কনটেইনার ধারণক্ষমতা বন্দরের ইয়ার্ডে এসব কনটেইনার বছরের পর বছর পড়ে থাকায় বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে ১০ থেকে ১৫ বছর আগের পণ্যও এখনো রয়ে গেছে। তাই এসব পণ্য আমরা বন্দর থেকে খালি করতে গিয়ে দেখি নিলাম আইনগত জটিলতা রয়েছে। কাস্টমস চাইলেও এগুলো নিলাম প্রক্রিয়া শেষ করতে পারছিল না। সেজন্য আমরা বিশেষ অধ্যাদেশ জারির লক্ষ্যে কাজ করেছিলাম এবং এখন তা জারি হওয়ায় বন্দরের সক্ষমতা আরও ৩০ শতাংশ বেড়ে যাবে।’
বন্দর সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড এবং শেডে পণ্যবোঝাই অবস্থায় ২ হাজার ৮৩৫টি ২০ ফুট সাইজের এবং ৩ হাজার ৮০৬টি ৪০ ফুট সাইজের এফসিএল (পণ্যভর্তি) কনটেইনার বছরের পর বছর নিলামের অপেক্ষায় পড়ে রয়েছে। এর বাইরে ৭২ হাজার ৪৮৪ প্যাকেজ এলসিএল খোলা পণ্য এবং ৬ হাজার ৭৮৪ প্যাকেজ বাল্ক কার্গো নিলামে বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী আমদানির ৩০ দিনের মধ্যে কেউ ডেলিভারি না নিয়ে নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পণ্যগুলো বন্দর থেকে নিতে হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা হয়নি। আর এতেই বন্দরে কনটেইনারের জট বাড়ছে। পুরনো এসব কনটেইনারের পাশাপাশি নতুন নতুন আমদানি পণ্য নিয়ে কনটেইনার আসছে এবং সেগুলো থেকেও আইনি জটিলতায় কনটেইনার থেকে যাওয়ায় বন্দরে বাড়ছে কনটেইনার জট।
এদিকে নতুন এই আদেশের বিষয়ে কাস্টমস বিডার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব চৌধুরী বলেন, ‘এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এক নিলামেই সব পণ্য বিক্রি হয়ে যাবে। এখন আর দীর্ঘসূত্রের সুযোগ নেই। সর্বোচ্চ দরদাতা পণ্য নিয়ে যেতে পারবে।’
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ বলেন, অবশ্যই এটি একটি বিশাল কাজ হয়েছে। এর মাধ্যমে শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের কনটেইনারগুলো দ্রুত ফেরত পাবে এবং তারা আবার ভাড়া দিতে পারবে। অন্যদিকে বন্দর থেকেও কনটেইনারগুলো দ্রুত নিয়ে গেলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে। তবে শঙ্কা হচ্ছে, নিলামে অংশগ্রহণকারী বিডারদের মধ্যে যাতে সিন্ডিকেট না হয়। যদি সিন্ডিকেট হয়, তাহলে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে।
বিডাররা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কমমূল্য অফার করার সুযোগ তৈরি হবে? এতে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। এই প্রশ্নের জবাবে কাস্টমস বিডার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব চৌধুরী বলেন, যেহেতু অকশনের মাধ্যমে বিডাররা বিশে^র যেকোনো প্রান্ত থেকে দর সাবমিট করতে পারবেন। তাই এতে দর উন্মুক্ত থাকবে এবং সিন্ডিকেট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, ‘কোনো পণ্য দ্রুত নিলাম হয়ে গেলে পণ্যটির বিক্রয়মূল্য থাকে এবং তা ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সময় অতিবাহিত করে নিলাম করা হলে তা আর ব্যবহার করা যায় না এবং আর্থিকও ক্ষতি হয়ে থাকে।’
