ভীষণ গরম পড়া শুরু হয়েছে। ঘরে-বাইরে কোথাও স্বস্তি নেই এতটুকু। সারাক্ষণ এসি চালিয়ে রাখতে হচ্ছে। সবসময় এসি চালিয়ে রাখা যেমন সম্ভব না, তেমনি অনেকের বাড়িতেই এসি নেই। এ ক্ষেত্রে সমাধান টানতে পারেন প্রাকৃতিক উপায়ে ঘর যতটা সম্ভব শীতল রাখা। কীভাবে প্রাকৃতিক উপায়েই ঘরের ভেতরের আবহাওয়া ঠান্ডা রাখবেন জানালেন নাহার সুলতানা
ঘরে যা করবেন
সকালের রোদে তাপ ততটা না থাকলেও দিন গড়াতে থাকলে রোদের তীব্রতাও বাড়তে থাকে। জানালা বন্ধ করে পর্দা টেনে দিন বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। বিশেষ করে সকাল ১০টার পর থেকে তাপ বাড়তে থাকে। তাই এ সময় জানালা বন্ধ রেখে পর্দা টেনে দিলে ঘরে তাপ ঢুকবে কম। ফ্যান চালিয়ে রাখলেও আরাম পাবেন। আবার সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় জানালা খুলে দিন। মুখোমুখি জানালা থাকলে ঘরে হাওয়া বাতাস চলাচল করবে ভালো।
সুতির বা লিনেনের মতো কাপড়ের পর্দা এবং বেডশিট ব্যবহার করুন। তা যেন হাল্কা রঙের হয়। হাল্কা রঙের চাদর আর পর্দা তাপ প্রতিফলিত করবে, এতে ঘর ঠান্ডা রাখতে সুবিধা হবে। চাদর আর পর্দা বেশি ময়লা হওয়ার আগেই ধুয়ে ফেলুন।
আবছা অন্ধকার ঘর বেশি ঠান্ডা হয়। ঘরে আলো কম হলে ঠান্ডা ভাব থাকে বেশি। তবে কিছু কাজ রয়েছে, যা হয়তো অল্প আলোয় করা সম্ভব না। সে ক্ষেত্রে টিউবলাইটের চেয়ে সিএফএল ল্যাম্পের আলো বেশি ঠান্ডা। সম্ভব হলে বদলে নিতে পারেন।
ঘরের মধ্যে গাছ রাখলে দেখতেও সুন্দর লাগে, তাপও শুষে নেয়। মানিপ্ল্যান্ট, অ্যালোভেরা, স্নেক প্ল্যান্ট, এরিকা পাম ঘরে রাখলে সুন্দর লাগে দেখতে। রান্না করার সময় ঘরের ভেতর গরম হয়ে যায়। অবশ্যই এগজস্ট ফ্যান চালিয়ে রাখুন। সম্ভব হলে সকাল সকাল রান্না সেরে ফেলুন। উচ্চতাপে রান্না করা থেকে বিরত থাকুন। ঘর, জানালার গ্রিল দিনে দুবার পানি দিয়ে মুছে রাখলেও ঘরের তাপমাত্রা কমে যায়। ঘর মুছে পাখা চালিয়ে দিন। তার আগেই জানালা বন্ধ করে পর্দা টেনে দিন। ঘর ঠান্ডা থাকবে।
সঠিকভাবে পর্দা ব্যবহার করতে হবে। সূর্যের আলো ঘরের ভেতর প্রবেশ করলেই ঘরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। তাই দিনের সবচেয়ে গরম সময়, বিশেষ করে দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত জানালার পর্দা টেনে রাখা উচিত। হাল্কা রঙের ঘন কাপড়ের পর্দা সূর্যের তাপ প্রতিহত করতে সাহায্য করে। কিছু ক্ষেত্রে রিফ্লেকটিভ বা হিট ব্লকার পর্দা ব্যবহার করাও কার্যকর হতে পারে।
জানালা-দরজার সঠিক ব্যবহার করে তাপ কমানো। রাতে বাইরের তাপমাত্রা অপেক্ষাকৃত কম থাকে। তখন জানালা খুলে ঘরে ঠান্ডা বাতাস ঢোকানো উচিত। আবার সকালে যখন সূর্যের তাপ বাড়তে শুরু করে, তখন জানালা ও দরজা বন্ধ রাখলে বাইরের গরম বাতাস ঘরে ঢুকতে পারে না। এর ফলে ঘর অনেকটা সময় ঠান্ডা থাকে।
প্রাকৃতিক বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা। বাতাস চলাচলের সহজ ব্যবস্থা থাকলে ঘরে তাপ জমে থাকতে পারে না। জানালা ও দরজার এমন অবস্থানে রাখা উচিত, যাতে এক পাশ দিয়ে হাওয়া ঢুকে আর অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। এ ছাড়া ছাদে বা জানালায় ছোট এগজস্ট ফ্যান বসালে গরম বাতাস দ্রুত বের হয়ে যায়।
ছাদে বা দেয়ালে সবুজায়ন করুন। ছাদে গাছ লাগানো, ছাদবাগান তৈরি করা বা দেয়ালে লতা জাতীয় গাছের ব্যবস্থা করা ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে খুব কার্যকর। গাছপালা সূর্যরশ্মি শোষণ করে এবং তাদের ঘাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবেশ ঠান্ডা রাখে। বিশেষ করে ফ্ল্যাট বাড়ির ক্ষেত্রে ছাদে বারান্দায় গাছ লাগানো খুবই কার্যকর পদ্ধতি।
আধুনিক নির্মাণ উপাদান ব্যবহার করতে পারেন। নতুন বাড়ি নির্মাণের সময় তাপ প্রতিরোধক নির্মাণসামগ্রী যেমন হিট- রেজিস্টেন্ট রঙ, ইনসুলেটেড ছাদ ও দেয়াল ইত্যাদি ব্যবহার করলে ঘর অনেকটাই ঠান্ডা রাখা যায়। পুরনো ঘরের ক্ষেত্রে ছাদের ওপর হিট রিফ্লেক্টিং পেইন্ট বা সাদা রঙ ব্যবহার করতে পারেন, যা সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে।
ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার যতটা কম। ফ্যান, লাইট, ফ্রিজ, টিভি বা কম্পিউটারের মতো ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি তাপ উৎপন্ন করে। তাই অপ্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখা উচিত, বিশেষ করে দুপুরে। খঊউ বা ঈঋখ বাতি ব্যবহার করলে কম তাপ উৎপন্ন করতে।
ঠান্ডা রঙের ব্যবহার করুন। ঘরের দেয়ালে হাল্কা ও ঠান্ডা রঙ যেমন হাল্কা নীল, সবুজ বা সাদা রঙ ব্যবহার করলে ঠান্ডা অনুভব হয়। গাঢ় রঙ গরম শোষণ করে বলে তাপ বাড়িয়ে তোলে। তাই ভিজ্যুয়াল কুলিং ইফেক্টও গুরুত্বপূর্ণ।
ঠান্ডা পানির ব্যবহার করুন। মাটির কলসিতে পানি রেখে ঘরে ঠান্ডা পরিবেশ তৈরি করা যেতে পারে। এমনকি বরফের টুকরা একটা বালতিতে রেখে সেটা ফ্যান চালিয়ে তার নিচে রাখুন। ঘর আপনা থেকেই ঠান্ডা হয়ে যাবে। এ ছাড়া হাল্কা ভেজা পর্দা বা তোয়ালে জানালায় টাঙিয়ে দিলে বাতাস ঠান্ডা হয়ে ঘরে ঢোকে।
বাঁশের পর্দা বা ছাউনি ব্যবহার করুন। বাঁশ বা খড়ের তৈরি পর্দা জানালায় টানিয়ে দিলে তা সূর্যের তাপ সরাসরি ঘরে ঢুকতে বাধা দেয় এবং হাওয়াও চলাচল করতে পারে। এতে ঘরের ভেতরে প্রাকৃতিকভাবে শীতল পরিবেশ তৈরি হয়।
ঠান্ডা খাদ্যাভ্যাস ও পোশাক নির্বাচন করুন। গরমে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। পানি, ফলমূল ও ঠান্ডা পানীয় গ্রহণ করলে শরীর ঠান্ডা থাকে। হাল্কা রঙের সুতি ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান করলে তাপ শোষণ কম হয় এবং আরামদায়ক অনুভূতি দেয়।
ছাদের তাপ কমাবেন
অনেকেই আছেন ছাদের নিচের ঘরে বা টপ ফ্লোরে বসবাস করেন। এই গরমে তাদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। প্রখর রোদের কারণে ছাদ গরম হয়, এরপর ছাদ থেকে ঘরও গরম হতে শুরু করে। এসি লাগিয়েও ঘর ঠান্ডা করতে অনেক কষ্ট পেতে হয়। বিদ্যুৎ বিলও বেশি ওঠে। তবে কিছু নিয়ম মেনে চললে গরমকালেও ছাদ ঠান্ডা রাখা সম্ভব। চলুন দেখে নেই কীভাবে এই তীব্র গরমে ছাদ ঠান্ডা রাখা সম্ভব।
ছাদ ঠান্ডা রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় ছাদে বাগান করা। নিজের বাড়ি হলে সহজেই এটি করা যায়। ছাদে টবে করে অনেক গাছ লাগাতে পারেন। পানিতে গাছ লাগাতে পারেন। আবার ঘাসও বিছিয়ে দিতে পারেন। এই ঘাসগুলো সূর্যের আলো থেকে সরাসরি ছাদের মেঝেকে ছায়া দেবে। আবার ফুলের বা গাছের গামলায় রাখা মাটি সূর্যরশ্মি শোষণ করে নেবে। যার ফলে ছাদ সহজে গরম হতে পারবে না। তবে ছাদে বাগান করার আগে লক্ষ্য রাখবেন, ছাদটি যাতে ওয়াটার প্রুফ হয় এবং ছাদের বাইরের দেওয়াল বা সø্যাব পানি টানতে না পারে। তা না হলে বাড়ির ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
ছাদের তাপমাত্রা কম করার অপর একটি পদ্ধতি হলো রিফ্লেক্টিভ রুফ সারফেস। অর্থাৎ ছাদের মেঝেকে রঙ করে দিতে হবে। এই রঙগুলো সূর্যরশ্মিকে প্রতিফলিত করে তাপ নিরোধকের কাজ করে। এর সাহায্যে ঘর ঠান্ডা রাখা যায়।
তবে কম খরচে ছাদ ঠান্ডা রাখতে চাইলে ছাদে চুন লাগান। বাড়িতে বাড়িতে সবুজ বা নীল চুন রঙ করা হতো? ঘর ঠান্ডা রাখতে এবার ছাদেও চুন রঙ করুন। তবে এর একটি সমস্যা হলো, বর্ষাকালে এই রঙগুলো ধুয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে প্রতি গ্রীষ্মে এটি করাতে হবে। এ ছাড়া আর একটি উপায় আছে ছাদ ঠান্ডা রাখার। সে ক্ষেত্রে সিরামিক বা পোর্সিলিন দিয়ে ছাদের মেঝে মুড়িয়ে দিন।
ছাদে শেড লাগাতে পারেন। ছাদের মেঝে বা সø্যাব কংক্রিটের তৈরি। এটি অনেকক্ষণ পর্যন্ত তাপ ধরে রাখতে পারে। পরে সেই তাপই নিচের তলার ঘরকে গরম করে দেয়। এই সমস্যার সমাধানের জন্য ছাদের ওপর শেড লাগাতে পারেন। ছাদের পরিসরে দেয়াল তুলে বা জালজাতীয় শেড লাগিয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারেন। আবার ছাদে পারগোলা বানিয়ে তাতে লতা-পাতা জড়িয়ে দিতে পারেন। ছাদ ঠান্ডা তো থাকবেই, সৌন্দর্যও বেড়ে যাবে বহুগুণ। এ ছাড়াও ক্যানভাসের আধা-স্থায়ী কাঠামোর সাহায্যে ছাদে শেডের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
সোলার প্যানেলের সাহায্যেও ছাদ ঢেকে দেওয়া যেতে পারে। এই সোলার প্যানেলগুলোতে ফোটোভোলটাইক সেল থাকে, যা ছাদ গরম হতে দেয় না। পরে সোলার প্যানেল সূর্যরশ্মি সংগ্রহ করে সৌরশক্তিতে পরিণত হবে। তবে মনে রাখবেন, মাল্টি স্টোরি বিল্ডিং হলেই পুরো ছাদে এই সোলার প্যানেলগুলো লাগানো যেতে পারে।
উডেন ডেক টাইলস বা টেরাকোটা টাইলস লাগাতে পারেন ছাদে। এর ফলে ছাদের নিচের তলার ঘর বেশি গরম হবে না। এ ছাড়াও ছাদে হাঁটার সময় পা-ও পুড়বে না। এমন অনেক টাইলস রয়েছে, যা সূর্যরশ্মি প্রতিফলিত করে এবং ছাদ ঠান্ডা রাখে। ছাদ ঠান্ডা রাখার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ছাদে খড়কুটো ছড়িয়ে দেওয়া। এ পদ্ধতি অবলম্বন করেও দেখতে পারেন গরমের এই সময়ে।
