বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে মেয়র পদে শপথ গ্রহণ করানোর দাবিতে আন্দোলন করছেন স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। গতকাল শনিবারও নগর ভবনের সব ফটকে তালা ঝুলিয়ে আন্দোলন করেন তারা। এতে নাগরিক সেবা ও সিটি করপোরেশনের স্বাভাবিক কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে এই ভবনে থাকা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়েও কোনো কার্যক্রম চালাতে পারেনি। পরে সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে এসে শপথ না পড়ানোর বিষয়ে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন ইশরাক।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণে ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করা হচ্ছে। নির্বাচন ট্রাইব্যুনালের রায় ও নির্বাচন কমিশনের গেজেট প্রকাশের পরও শপথ অনুষ্ঠানে গড়িমসি করছে সরকার। তিনি বলেন, শপথ গ্রহণের দাবিতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
ইশরাক হোসেন বলেন, ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ডিএসসিসি নির্বাচনে আমি বিএনপির মনোনীত মেয়র প্রার্থী ছিলাম। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস প্রশাসনের সহযোগিতায় নির্বাচনী অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে বিজয়ী হন। ভোটারবিহীন কেন্দ্রে ইভিএম দখল করে ভোটগ্রহণ করা হয়। ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন তাপসকে বিজয়ী ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে। তিনি বলেন, নির্বাচনের ৩০ দিনের মধ্যে মামলা করা হয়েছিল। তাপস প্রভাব খাটিয়ে এ মামলা থামানোর চেষ্টা করেন। তখন আদালত আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে সব আইনি পদক্ষেপ মেনে আমরা রায় পেয়েছি। কাজেই আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে যারা কথা বলছেন তারা আদালত অবমাননা করছেন। আইন উপদেষ্টা বলেছেন, তাদের মতামত না নিয়েই গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও তার মতামতের জন্য ফাইল টেবিলে পড়েছিল। কিন্তু ১০ কার্যদিবসের মধ্যে নিয়ম মেনেই নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে গেজেট প্রকাশ করা হয়। গেজেট প্রকাশের ২০ দিন পার হলেও তাকে শপথ পড়ানো হয়নি। আমরা শপথ গ্রহণের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
ইশরাক বলেন, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হলে এবং তার নাম সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হলে, ৩০ দিনের মধ্যে শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু গেজেট প্রকাশের পর প্রায় তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও শপথ গ্রহণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, আইনের স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নীরব ভূমিকা পালন করছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, তারা যেন অবিলম্বে আমাকে নির্বাচিত মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করেন।
ইশরাক হোসেন বলেন, শপথ পড়ানোর ইস্যুতে চলমান আন্দোলনের জন্য আমি কোনো ঘোষণা দিইনি, তাই আন্দোলন নিয়ে কোনো পদক্ষেপের সঙ্গেও আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে জনগণের আন্দোলনের অধিকারকেও অস্বীকার করতে পারি না। যারা বাধা দিয়েছে তারা ফ্যাসিবাদের দোসর। এ সময় তার পাশে দুজন আইনজীবীসহ সাবেক সচিব মশিউর রহমান উপস্থিত ছিলেন। যিনি চলমান আন্দোলনেও নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
নগর ভবনে তালা : গতকাল সকালে ডিএসসিসি নগর ভবনের সব ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন ইশরাক হোসেনের সমর্থকরা। এতে নগর ভবন থেকে সেবা-সংক্রান্ত সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। বিক্ষোভকারীরা ৬৫টি তালা লাগানোর দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা। বিএনপি ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ডিএসসিসির শ্রমিক-কর্মচারীরা যোগ দেন। মূলত শ্রমিক-কর্মচারীরা নগর ভবনে তালা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এ সময় ডিএসসিসির কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কেউ নগর ভবনে ঢুকতে পারেননি। নগর ভবনে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিস করেন। তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার কারণে এই অফিসের সব কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাহত হয় নাগরিক সেবা কার্যক্রম। এ সময় জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, হোল্ডিং ট্যাক্সসহ প্রয়োজনীয় অনেক কাজ করতে এসে ফিরে গেছেন নগরবাসীর অনেকেই। অঞ্চলিক অফিসগুলোতেও সেবা কার্যক্রম বন্ধ করে আন্দোলন করার খবর পাওয়া গেছে।
বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে ইশরাক হোসেনের সমর্থকরা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও তার সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদীকে নগর ভবনে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। পাশাপাশি তাদের যেখানে পাওয়া যাবে, সেখানে প্রতিহত করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টার পদত্যাগও দাবি করেন।
গতকাল সকাল ৯টার দিকে নগর ভবনের সামনে এসে জড়ো হতে থাকেন ইশরাক হোসেনের সমর্থকরা। তারা বেলা ১১টা পর্যন্ত নগর ভবন প্রাঙ্গণে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। বেলা ১১টার দিকে সচিবালয়ের দিকে মিছিল নিয়ে যান। সচিবালয়ের দিকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে গেলেও চারদিকে পুলিশের ব্যারিকেডের কারণে ইশরাকের সমর্থকরা সচিবালয়ের সামনে যেতে পারেননি। সেখান থেকে ফিরে দুপুর দেড়টার দিকে নগর ভবনের সামনে আজও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন তারা। এ সময় অবসরপ্রাপ্ত সচিব মশিউর রহমান বলেন, রবিবারও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে ‘ঢাকাবাসী’।
এর আগে গত বুধ এবং বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনের মতো একই দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা। সেদিন নগর ভবনের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে অবস্থান কর্মসূচি চলে। সেই কর্মসূচিতে নগরবাসীর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এরপর প্রতিদিনই দপ্তর ছেড়ে আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা।
আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ঘোষণা করে গত ২৭ এপ্রিল গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর ১৮ দিন পর গত বৃহস্পতিবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২০২০ সালের মেয়র নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী ইশরাক হোসেনের দায়েরকৃত নির্বাচনী মামলার রায় ও নির্বাচন কমিশনের আপিল দায়ের না করা বিষয়ে কোনো আইনি জটিলতা আছে কি না, সে বিষয়ে আইন ও বিচার বিভাগে চিঠি দিয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মাহবুবা আইরিন স্বাক্ষরিত ‘মতামত প্রদান-সংক্রান্ত’ শিরোনামে চিঠিটি গত বৃহস্পতিবার আইন ও বিচার বিভাগের সচিব বরাবর পাঠানো হয়।
শপথ পড়াতে আবেদন : ডিএসসিসির মেয়র হিসেবে শপথ পাঠ করানোর জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ইশরাক হোসেন। গতকাল তিনি এ আবেদন করেন। এতে গত ২৭ মার্চের রায় ও নির্বাচন কমিশন থেকে প্রকাশিত গেজেট যুক্ত করা হয়। আবেদনে বলা হয়, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনের বরাত দিয়ে অনতিবিলম্বে তাকে মেয়র হিসেবে শপথ পাঠ করানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জোর দাবি জানান ইশরাক।
