কার্বন নিঃসরণ কমবে ৫০ শতাংশের বেশি

আপডেট : ২১ মে ২০২৫, ০৭:০৫ এএম

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে পৃথিবীতে তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ। গ্রিন হাউজ গ্যাসের মধ্যে সবচেয়ে নিঃসরণ হয় কার্বন ডাই অক্সসাইড। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) নেতৃত্বে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর বিল্ডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন (গ্লোবালএবিসি) বিশে^র বিভিন্ন দেশের সরকার ও অংশীজনের সহায়তা জলবায়ু-সচেতন নির্মাণ পরিকল্পনা তৈরির কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ গ্লোবালএবিসি ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী ‘বাংলাদেশে ভবন নির্মাণ খাতে জলবায়ু কার্যক্রমের রূপরেখা’ নামক একটি জাতীয় রোডম্যাপ তৈরি প্রণয়ন করেছে। এখন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় রোডম্যাপের আলোকে একটি অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়নের খসড়া প্রস্তুতের কাজ করছে। সরকার এই রোডম্যাপের মাধ্যমে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে নির্মাণ খাতে কার্বনমুক্ত, সহনশীল ও জনবান্ধব একটি ভবিষ্যৎ গড়তে চায়। নগর বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশ সরকারের এ রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করা গেলে শহরের কার্বন নিঃসরণ ৫০-৬০ শতাংশ কম আসবে।

নগর বিশেষজ্ঞরা জানান, গ্রিন হাউজ গ্যাস ভূপৃষ্ঠের বিকিরিত রশ্মিকে শোষণ করে বায়ুম-লের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে। কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসকে মূলত প্রধান গ্রিন হাউজ গ্যাস। এ ছাড়া জলীয়বাষ্প, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, ফ্রিয়ন বা ক্লোরোফ্লোরো কার্বন ও ওজোন গ্যাস গ্রিন হাউজ গ্যাসের অংশ। নির্মাণ খাতে পোড়ানো ইট ব্যবহার হচ্ছে কার্বন নিঃসরণের একটি বড় মাধ্যম। পোড়ানো ইটের পরিবর্তে যদি কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার হয়, তাহলে পরিবেশবান্ধব ভবন তৈরি হবে। এটি করলে বিল্ডিংয়ের ওজন কমবে, সর্বোচ্চ আলো ব্যবহার করা যাবে এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের (এসি) নির্ভরশীলতা কমে যাবে। এসিও গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ করে। শহরে প্রচুর পরিমাণে এসি ব্যবহার করা হয়। সরকার একটি রোডম্যাপ তৈরির মাধ্যমে ঢাকার ডিটেইল এরিয়ার প্ল্যানের (ড্যাপ) আওতাধীন এলাকায় যত ভবন তৈরি হবে সেগুলোতে পোড়ানো ইটের পরিবর্তে ব্লকের ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায়। ধীরে ধীরে প্রাইভেট ডেভেলপারদের যেন পোড়ানো ইট ব্যবহার বন্ধ করা যায় তার একটি গাইডলাইন তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মিজ নায়লা আহমেদকে প্রধান করে সরকার একটি কমিটি করে। কমিটি ‘বাংলাদেশে ভবন নির্মাণ খাতে জলবায়ু কার্যক্রমের রোডম্যাপ প্রস্তত করে। সরকারের এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে শহরের কার্বন নিঃসরণ ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ হ্রাস পাবে। বর্তমানে এই রোডম্যাপের ওপর অ্যাকশন প্ল্যান তৈরির কাজ চলছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির সদস্য ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইটভাটাগুলোতে কাঠ পোড়ানোর কারণে প্রচুর পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়। রাজধানীর কার্বন নিঃসরণ কমাতে ঢাকার আশপাশের ইটভাটাগুলো বন্ধ করতে হবে। শহর এলাকায় যে সব শিল্পকারখানায় জীবাষ্ম জ্বালানির ব্যবহার হয়, সেগুলোকে গ্রিন ইন্ডাস্ট্রিজে রূপান্তর করতে হবে। শহরে মেট্রোরেল যোগাযোগ বৃদ্ধি ও জ্বালানি ব্যবহৃত গাড়ির পরিবের্তে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সবুজায়ন বাড়াতে হবে। তাহলে কার্বন নিঃসরণ কমে আসবে।

রোডম্যাপের খসড়ায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ভবন ও নির্মাণ খাতের কার্বন নির্গমন হ্রাসের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রাথমিক অবস্থা বিশ্লেষণ, ভবিষ্যদ্বাণীমূলক চিত্র তৈরি এবং যেসব জায়গায় উন্নয়ন প্রয়োজন তা চিহ্নিত করতে তিনটি ব্যবহার করা হবে। এ ছাড়া রোডম্যাপে তিনটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমত, উৎপাদন ও ব্যবহার পর্যায়ে কার্বন নিঃসরণ কমানো। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং সর্বশেষ সবার জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা।

খসড়ায় বলা হয়েছে, রোডম্যাপে প্রধান পাঁচটি কার্যক্রমের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে- জাতীয় নীতি, বাজেট ও প্রণোদনা প্রদান। শহর ও গ্রামীণ এলাকায় জমির ব্যবহার, পরিবহন ও সবুজায়ন। নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব ডিজাইন ও নির্মাণ। পুরনো ভবন সংস্কারের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি। নির্মাণের খাতে পরিবেশবান্ধব উপকরণ ও উৎপাদন। বাংলাদেশ রোডম্যাপের মাধ্যমে ২০৫০ সালের মধ্যে নির্মাণ খাতে কার্বনমুক্ত, সহনশীল ও জনবান্ধব ভবিষ্যৎ গড়তে চায়।

খসড়ায় আরও বলা হয়, ভবন নির্মাণ খাত বাংলাদেশের জিডিপিতে ৮ শতাংশ অবদান রাখে। এই খাতে কর্মরত ২৪ লাখ মানুষ। যা মোট কর্মসংস্থানের ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। বর্তমানে নির্মাণ খাতের বাজারমূল্য প্রায় ৩২ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালে এটি বেড়ে দাঁড়াবে ৪৪ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। পরিবেশের ওপর সর্বনিম্ম প্রভাব রেখে নগরায়ণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নির্মাণ খাতসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো অগ্রাধিকারে রাখা হয়।

রোডম্যাপ খসড়ায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, যেখানে প্রতি বর্গমিটারের ১ হাজার ১১৯ জন মানুষ বাস করে। বাংলাদেশ নদীবিধৌত ও নিম্নভূমির দেশ। দেশের গড় উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৮৫ মিটার এবং দেশের ৬০ শতাংশের বেশি এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬ মিটারেরও কম উচ্চতায় রয়েছে।

খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে কম গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমনকারী দেশ। তারপরও গত ২০ বছরে বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণ প্রায় ৪০০ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে মোট ২১৩ দশমিক ১৯ মিলিয়ন টন গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ হয়েছে। আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ বেড়ে দাঁড়াবে ৪২৭ দশমিক ৭২ মিলিয়ন টন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান নবম। ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, খরা, উপকূল ও নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, অগ্নিকা-, সুনামি ও ভূমিকম্প। বাংলাদেশে ২০০০ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আবহাওয়াজনিত ১৮৫টি ঘটনা ঘটেছে। এতে ১১ হাজার ৪৫০ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে উদ্বাস্তু বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে ১ দশমিক ৩৩ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত কপ-২১ সম্মেলনে জাতিসংঘের বেশির ভাগ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই চুক্তির শর্ত ছিল আগামী ২০৩০ সাল পর্যন্ত সদস্য রাষ্ট্রগুলো প্রতি বছর কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনবে এবং বিশে^র তাপমাত্রা কোনোভাবেই ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়তে দেওয়া যাবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত