স্থানীয় ও বৈশ্বিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগী সক্ষমতা বাড়াতে আমদানি ও রপ্তানি নীতির সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি পণ্যের স্বল্প বৈচিত্র্য, প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে আমদানি পণ্যের অতিরিক্ত শুল্ক, বাণিজ্য সুবিধায় নানা চ্যালেঞ্জ এবং সীমিত বিদেশি বিনিয়োগের যে সংকট তা কাটাতে হলে ধারাবাহিকভাবে শুল্ক হ্রাস, আমদানি নীতির আধুনিকীকরণ, শুল্ক পদ্ধতির সরলীকরণ, বাণিজ্য সুবিধার উন্নয়ন ও অটোমেশনের কোনো বিকল্প নেই বলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়।
গতকাল শনিবার ঢাকা চেম্বার আয়োজিত ‘বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি নীতিমালা : এলডিসি পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয়তা এবং চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদের সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিকবিষয়ক সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে শুল্ক ও শুল্কের হার বেশি। অন্যদিকে এখনো আমদানি করের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে। রাজস্ব খাতে সংস্কারের অভাব এবং প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়াতে সরকারের ব্যর্থতার ফলে পরোক্ষ কর ও আমদানি করের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা দেখা দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি নীতি অনুসারে, আমাদের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যে ঘাটতি, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) সীমাবদ্ধতা এবং বাণিজ্যের সুবিধার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ব্যাপক নির্ভরশীলতা শুধু তৈরি পোশাকে। অন্যদিকে আমদানি নীতির পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলাদেশ তার প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে উচ্চতর শুল্কসহ কোথাও জটিল প্যারা-ট্যারিফ ব্যবস্থা অনুসরণ করছে। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায়, এটি বাণিজ্যিক নীতি, গতিশীল শুল্ক সমন্বয়, নীতিগুলোর মধ্যকার কার্যকর সমন্বয় জরুরি হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ব্যবহার করার জন্য সম্ভাবনাময় তালিকার বাইরে পণ্য এবং বাজারের বৈচিত্র্যের ওপর আরও জোর দিতে হবে। এ ছাড়া ক্রমান্বয়ে শুল্ক হ্রাস, আমদানি নীতির আধুনিকীকরণ, শুল্ক পদ্ধতির সরলীকরণ, বাণিজ্যের সুবিধার উন্নতি, অটোমেশনের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। বাণিজ্যিক, শিল্প ও আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্ট নীতিগুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমে বিদ্যমান পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব।
প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিকবিষয়ক সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যকার কাঠামোগত সংস্কার জরুরি হলেও যে গতিতে বর্তমানে সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় বেশ কম। সত্যিকারে শিল্প খাতসহ অন্যান্য সেক্টরে আমাদের কোনো দীর্ঘমেয়াদে রোডম্যাপ নেই, যা হতাশার বিষয়।
তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি সরকারের সংস্থাগুলোর মধ্যকার সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। সব বন্দরগুলো অর্থনীতির হৃদপি-, তাই এগুলোর ব্যবস্থাপনা সচল রেখে নির্বিঘেœ কার্যক্রম পরিচালনা করা একান্ত অপরিহার্য। ব্যবসায়ী সমাজের দাবিগুলো যৌক্তিক আকারে সরকারের কাছে উপস্থাপন করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশকে এলডিসি উত্তরণ করতেই হবে, এখান থেকে ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। তবে এলডিসি পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের উচ্চমানের তৈরি পোশাক পণ্য, ওষুধ এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের ওপর বেশি হারে মনোযোগী হতে হবে।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পারস্পরিক শুল্কারোপ, রপ্তানির ওপর ভারতের নিষেধাজ্ঞা প্রদান, জ¦ালানি সংকট, রিজার্ভ স্বল্পতা ও আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা এবং আইনশৃঙ্খলার অস্থিরতার কারণে শিল্প খাতে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানি কার্যক্রমে স্থবিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিদ্যমান বাস্তবতা বিবেচনা, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এবং ২০২৬ সালে বাংলাদেশের এলডিসি-পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের আমদানি-রপ্তানি নীতিমালার পুনর্মূল্যায়নের কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, চামড়া, ওষুধ, পাটপণ্য এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রভৃতি পণ্যগুলোর রপ্তানির সম্ভাবনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। অন্যদিকে মোট রপ্তানি ৮৪ শতাংশ তৈরি পোশাক ও সুনির্দিষ্ট কিছু বাজারের ওপর নির্ভরশীল। এ অবস্থায় আমদানি পর্যায়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার পাশাপাশি শুল্ক ও ট্যারিফ কাঠামোর দক্ষ ব্যবস্থাপনা খুবই জরুরি। এ ছাড়া শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের তাগিদ দেন তাসকীন আহমেদ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, এলডিসি-পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নগদ প্রণোদনার চেয়ে কার্যকর নীতি সহায়তাই মূল হিসেবে কাজ করবে। এ সময় পণ্য বহুমুখীকরণের জন্য নন-ট্রেডিশনাল খাতের ওপর জোর দিতে হবে। যথাযথ অবকাঠামো, জ্বালানি নিরাপত্তা, আর্থিক ও নীতি সহায়তা এবং লজিস্টিক সেবা নিশ্চিত করতে পারলে আগামী দুই-তিন বছরে তৈরি পোশাক খাত থেকেই ১০০ বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব।
এনবিআরের সদস্য (কাস্টমস) কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এলডিসি-পরবর্তী নেগোশিয়েশনে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি থাকা প্রয়োজন। আমাদের রপ্তানি শুধু তৈরি পোশাকে নির্ভরশীল হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে বৈশ্বিক দরকষাকষিতে আমরা পিছিয়ে পড়ি।
তিনি বলেন, এনবিআর ইলেকট্রনিক ডেটা এক্সচেঞ্জ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যেটি চালু হলে ব্যবসায়ীরা আরও স্বল্প সময়ে আমদানিকৃত পণ্য ছাড় করতে পারবেন।
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত ধ্বংস হয়ে যাবে, এ সম্ভাবনা নেই। তবে আমাদের এ খাতে উচ্চমানের পণ্যের উৎপাদনে মনোযোগ দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার একদিকে প্রণোদনা সহায়তা হ্রাস করছে, অন্যদিকে জ্বালানিসহ অন্যান্য সেবার মূল্য বৃদ্ধি করছে, ফলে বেসরকারি খাত ক্রমাগত প্রতিকূল অবস্থায় পড়ছে, যা মোটেই কাম্য নয়।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের যুগ্ম প্রধান মো. মসিউল আলম বলেন, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে ৪৩টি পণ্যের ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রাপ্তি হতে বঞ্চিত হব, তাই এলডিসি-পরবর্তী সময়ে শিল্প খাতে নগদ সহায়তা কীভাবে বিকল্প পন্থায় প্রদান করা যায়, সে বিষয়ে নীতি কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। তৈরি পোশাক উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমাদের এখন কমপক্ষে ৭০ শতাংশ ম্যান-মেইড ফাইবার ব্যবহারের দিকে এগোতে হবে, কেননা বিশ্ববাজারে এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
