কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন ইসলামি সংগীতের সর্বশ্রেষ্ঠ রচয়িতা। তার জীবনের সূচনালগ্ন থেকেই ইসলামি চেতনার এক গভীর ধারা বইতে থাকে। কৈশোরে মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার মনোজগতে যে ইসলামি আবহ তৈরি করেছিল, তা পরবর্তী সময়ে তার সাহিত্য ও সংগীতে বিস্তৃত হয়ে ওঠে।
বাংলা ইসলামি সংগীতের ইতিহাসে নজরুল একটি যুগান্তকারী নাম। তার কলমে ইসলাম যেমন উঠে এসেছে বিশুদ্ধ বিশ্বাসে, তেমনি তার কণ্ঠে ও সুরে সেই ইসলাম হয়ে উঠেছে হৃদয়গ্রাহী, আবেগতাড়িত এক অনুভব। তিনি প্রায় ২৮০টির মতো ইসলামি গান রচনা করেছেন, যার প্রতিটি গান একেকটি আধ্যাত্মিক ও সৃজনশীল শিল্পকর্ম। ইসলাম ধর্মের মৌলিক অনুষঙ্গগুলোর প্রায় সব বিষয়েই নজরুল ইসলামি গান লিখেছেন। তাওহিদ, রিসালাত, হামদ-নাত, আজান, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, শবেমেরাজ, শবেবরাত, শবেকদর, রমজান, ঈদ, মহররম, ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, জাগরণী গান, ইসলামের সাম্যের শিক্ষা, অমর ব্যক্তিত্ব, মুসলিম নারীর মর্যাদাসহ এমন কোনো বিষয় নেই, যা নিয়ে তিনি গান রচনা করেননি। তিনি বাংলা গানকে আরবি, ফারসি ও উর্দু শব্দের মেলবন্ধনে এক নতুন রূপ দিয়েছেন, যা ইসলামি আবহে হয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ নিজস্ব ও অভিনব।
নজরুল ইসলামি গান রচনা শুরু করেন ১৯৩১ সালে। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ ছিল তার রচিত প্রথম ইসলামি গান। এটি বাঙালি মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় ও আনন্দের উৎসব ঈদুল ফিতর নিয়ে কালজয়ী একটি গান। ঈদের আনন্দ, সৌন্দর্য এবং আধ্যাত্মিক দিক তুলে ধরা হয়েছে এই গানে। গানটি বাঙালি মুসলিম সমাজে ‘ঈদের আবহ গান’ হিসেবে পরিচিত, যা বাঙালির ঈদ আনন্দের এক আবশ্যকীয় অংশ হয়ে উঠেছে। শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের অনুরোধে কবি নজরুল এই গান রচনা ও সুরারোপ করেন।
এক রাতে রেকর্ডিং শেষে নজরুল বাড়ি ফিরছিলেন। পথে তাকে থামান শিল্পী আব্বাসউদ্দীন। কবির কাছে একটা আবদার ছিল তার। না শোনা পর্যন্ত তাকে যেতে দেবেন না। নজরুল বললেন, বলে ফেলো তোমার আবদার। আব্বাসউদ্দীন বললেন, কাজী দা, একটা কথা আপনাকে অনেক দিন ধরেই বলব বলব ভাবছি। দেখুন, পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়ালরা কী সুন্দর উর্দু কাওয়ালি গায়। শুনেছি তাদের গান প্রচুর বিক্রি হয়। বাংলায় ইসলামি গান তো তেমন নেই। বাংলায় ইসলামি গান গাইলে কেমন হয়? আপনি যদি ইসলামি গান লেখেন, তাহলে মুসলমানদের ঘরে ঘরে আপনার জয়গান বাজবে।
বাজারে তখন শ্যামাসংগীতের জয়জয়কার। নজরুল নিজেও তখন শ্যামাসংগীত লিখতেন, সুর করতেন। আব্বাসউদ্দীনের এমন আবদারে নজরুল কী জবাব দেবেন, বুঝে উঠতে পারেন না। তিনি বলেন, গান রেকর্ড করতে হলে তো বিনিয়োগ করতে হবে। এর জন্য গ্রামোফোন কোম্পানির ভগবতী বাবুর কাছে যেতে হবে। আগে দেখো ভগবতী বাবুকে রাজি করাতে পার কি না? আব্বাসউদ্দীন ভগবতী বাবুকে অনেক অনুরোধ করে, অনেকবার বলে-কয়ে রাজি করান। অতঃপর নজরুলের কাছে এসে বলেন, ভগবতী বাবু রাজি হয়েছে, আপনি গান লিখুন। নজরুল বলেন, ঠিক আছে। এক ডোঙ্গা পান দিয়ে যাও। নজরুল পান মুখে দিয়ে রুমের দরজা লাগিয়ে লিখতে বসে যান। আব্বাসউদ্দীন বাইরে পায়চারি করতে থাকেন। অল্প কিছুক্ষণ পরই নজরুল দরজা খুলে মুখ থেকে পানের পিক ফেলে আব্বাসউদ্দীনকে বলেন, এই নাও তোমার গান। ব্যস, এইটুকু সময়েই একটি কালজয়ী গানের জন্ম হয়ে গেল! অতঃপর এই গান বাজারে এলে খুব হিট হলো। নজরুল আরও ইসলামি গান রচনার তাগাদা পেলেন। একটা সময় পরিস্থিতি এ রকম হলো যে, নজরুল ইসলামি গান লিখলেই বাজারে তা হিট! ফলে অনেক হিন্দু শিল্পীও মুসলিম নামধারণ করে ইসলামি গান গাওয়া শুরু করেন।
