ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার অর্থায়নে বড় জটিলতা

আপডেট : ২৮ মে ২০২৫, ০৫:১৩ এএম

এখন থেকে এক যুগ আগে যখন এ দেশে ৭২ শতাংশ তরুণ মনে করতেন, উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসা শুরু করলে তারা ব্যর্থ হবেন এবং ব্যবসায় বিনিয়োগ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, ঠিক তখনই ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) দুই হাজার উদ্যোক্তা তৈরির একটি প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু করে। বিপরীতমুখী এই পরিস্থিতিতে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে ঢাকা চেম্বার যখন সারা দেশের তরুণদের কাছ থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য নতুন ব্যবসার ধারণা আহ্বান করেছিল, তখন তিন হাজারের বেশি তরুণ-তরুণী এতে সাড়া দেন। তাদেরই একজন ছিলেন দিনাজপুরের মো. গোলাম মোস্তফা, যিনি সে সময় নভারা টেকনিক্যাল স্কুলে ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস বিষয়ে তিন বছরের পড়াশোনা শেষে ১৯৯৫ সালে ‘সাবমার্সিবল পাম্পের’ ছোট্ট একটি ওয়ার্কশপ গড়ে তোলেন।

কিন্তু তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন নিজের পড়াশোনা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে পুরো পাম্পটিই নিজে তৈরির। স্বপ্ন বাস্তবায়নে নওগাঁ বিসিকে একটি প্লট নিয়ে সাড়ে ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে কারখানা তৈরির প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করেছিলেন, যেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ রাখা হয়েছিল ৩৭৫ জনের। কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও তিনি এই প্রকল্পটি দাঁড় করানোর জন্য প্রয়োজনীয় ঋণের সংস্থান করতে পারেননি। তবে তিনি ছোট পরিসরে একটি কারখানা করেছেন এবং কিছু যন্ত্রাংশ নিজে তৈরি ও কিছু আমদানি করে স্বল্প পরিসরে এই পাম্প তৈরি করছেন, যেখানে ১২ জন মানুষ নিয়মিত কাজ করছেন। এখনো তিনি স্বপ্ন থেকে সরে যাননি। কিন্তু এর মধ্যে প্রায় এক দশক সময় পেরিয়ে গেছে। সৃষ্টির নেশার কারণে গোলাম মোস্তফা এখনো স্বপ্ন বাস্তবায়নে লেগে থাকলেও ঢাকা চেম্বারের কাছে ব্যবসায়িক ধারণা জমা দেওয়া তিন হাজারের বেশি তরুণ-তরুণী খুব বেশিদূর এগোতে পারেননি।

গোলাম মোস্তফা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০০৩ সালে বাবার সম্পত্তি বন্ধক দিয়ে ব্যাংক থেকে প্রথম ঋণ পেয়েছিলাম ১ লাখ টাকা। লেনদেন ভালো হওয়ায় এবং আড়াই কোটি টাকার সব সম্পত্তি বন্ধক দিয়ে ধাপে ধাপে নেওয়া ঋণের পরিমাণ এখন ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অথচ আমি সাড়ে ১৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও এই অর্থায়ন পাইনি, বড় হব কী করে?’

ঢাকা চেম্বার সূত্রে জানা গেছে, সে সময় সর্বোচ্চ ৭০ জনের মতো উদ্যোক্তা তাদের ব্যবসা শুরু করতে পেরেছিলেন; কিন্তু কেউই অর্থায়নের সহযোগিতা পাননি ব্যাংক থেকে। বাকিরা হারিয়ে গিয়েছেন।

দুই হাজার উদ্যোক্তা তৈরির প্রকল্পটির উদ্যোগী ছিলেন ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি সবুর খান। সে সময় ব্যাংকঋণ পাওয়ার জটিলতা নিয়ে তিনি নিজেও হতাশা ব্যক্ত করেন।

তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চাকরি না করে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য দেশব্যাপী একটি প্রচারণা তরুণদের মধ্যে আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকঋণ নেওয়াটা তখনো যেমন কঠিন ছিল, এখনো তার কোনো পরিবর্তন নেই। যদিও এখন নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল তৈরি হয়েছে। এটা সে সময়কার ধারাবাহিকতায় হয়েছে। তবে এই তহবিলের ঋণগুলো ক্ষুদ্রদের চেয়ে মাঝারি সারির ব্যবসায়ী বেশি ব্যবহার করছেন। কারণ জামানত সমস্যাসহ নানা নিয়মের কারণেই নতুনদের প্রবেশগম্য সীমিত।’

ব্যাংকে উদ্যোক্তাদের সীমিত প্রবেশগম্যের প্রমাণ মেলে ব্যাংকঋণের হিসাব থেকেও। বাংলাদেশ ব্যাংকনীতির মাধ্যমে নিয়মিত ঋণের একটা অংশ সবসময়ই সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য রাখে, যেটা ঋণ পাওয়ার সবচেয়ে বড় জায়গা। অবশ্য এখানেই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত থাকেন ছোট উদ্যোক্তারা।

গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা ব্যাংক খাত থেকে ১০ লাখ ৩ হাজার ১৪৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। এই পাঁচ বছরে ঋণ গ্রহীতা উদ্যোক্তার সংখ্যা ৫৫ লাখ ১২ হাজার ৪০৭ জন, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবের মোট উদ্যোক্তার অর্ধেকেরও কম। বিসিএসের ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী দেশে উদ্যোক্তার সংখ্যা এখন ১ কোটি ১৮ লাখের বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২০ সালে প্রায় ৮ লাখ, ২০২১ সালে ৯ লাখ ৩৯ হাজার, ২০২২ সালে ১১ লাখ ২৪ হাজার, ২০২৩ সালে ১৩ লাখ ১৯ হাজার এবং ২০২৪ সালে ১৩ লাখ ৪৪ হাজার উদ্যোক্তা ঋণ নিতে পেরেছেন। ঋণ গ্রহীতার এই পরিসংখ্যান বলছে, বিপুল পরিমাণ উদ্যোক্তা এখনো ব্যাংকঋণের ধারে-কাছেও নেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, তারা মূলত জামানত ও কঠিন শর্তের বেড়াজালে পরে ঋণ গ্রহণ করতে পারেন না।

এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সালে ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল তৈরি করে। তিন বছর মেয়াদি এই তহবিলটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এ বছরের জুলাইয়ে। তহবিলটি থেকে ২৭ মে পর্যন্ত মোট ২২৬১৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে ৪৯টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। অর্থাৎ তিন বছরেও তহবিলের পুরো টাকা ব্যবহার করা হয়নি অথচ গোলাম মোস্তফার মতো উদ্যোক্তারা স্বপ্ন বাস্তবায়নে ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও টাকা পাচ্ছেন না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দেশ রূপারন্তকে বলেন, ‘এই প্রণোদনা প্যাকেজের মেয়াদ বৃদ্ধির কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। অর্থাৎ অর্থায়ন আরও সীমিত হচ্ছে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসএমই বা এমএসএমইতে ব্যাংকের অর্থায়ন পাওয়ার বিষয়টি নানা শর্তের বেড়াজালে এ দেশে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে বড় বড় প্রতিষ্ঠান তৈরি হয় না। অনেকেই এখন চাকরি না করে নিজ উদ্যোগে ছোট ছোট ব্যবসায় আসছেন, যথাযথ নীতি সহায়তা না দেওয়ার কারণে তারা ছোটই থেকে যাচ্ছেন। আবার এসএমই বা সিএমএসএমই যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, এর মধ্যেও রয়েছে জটিলতা।

নীতি ও সংজ্ঞায়িত করার কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এমএসএমই অর্থাৎ কটেজ, মাইক্রো, ছোট এবং মাঝারি এন্টারপ্রাইজগুলো এক কাতারে রাখা হয়েছে। কিন্তু মাঝারি আকারের উদ্যোক্তারা বেশ কিছু নিয়মের মধ্যে থাকেন, তাদের ভালো একটা মূলধন থাকে, আর্থিক লেনদেনগুলো একটা দৃশ্যমান পরিচ্ছন্ন কাঠামোর মধ্যে থাকে বলে তারা ব্যাংকের কাছে বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকেন। যে কারণে সংজ্ঞায় ছোটদের সঙ্গে থাকায় ছোটদের সুবিধাগুলো সবটাই সহজে পেয়ে যান এই মাঝারি উদ্যোক্তারা।

এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দেশে ছোট ও মাঝারি খাতের জন্য যে নীতি, সেখানে পরিবর্তন আনা উচিত। কারণ ক্ষুদ্র, ছোট, মাঝারিদের জন্য সামগ্রিক যে সুবিধাগুলো আসে, তা মাঝারি এন্টারপ্রাইজগুলো যারা, তারাই বেশি পায়। সরকার যখন এসএমই খাতে প্রণোদনার ব্যবস্থা করে, তখন ঋণ বিতরণকারী ওই সংজ্ঞার কারণে মিডিয়ামকে দিতেই স্বস্তি বোধ করে। ছোট যারা তারা মাঝারিদের মতো অত জামানত দিতে পারে না, আবার তাদের যোগাযোগটাও ওই পর্যায়ে থাকে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন আমাদের সংজ্ঞা পরিবর্তন করা দরকার। এসএমই বা সিএমএসএমই যেটা আছে, সেখান থেকে মাঝারিকে আলাদা করা দরকার। এর সঙ্গে এসএমই ফাউন্ডেশনকে আধুনিকায়ন করে আরও বেশি শক্তিশালী করা দরকার, কারণ তারা সরাসরি ছোটদের নিয়ে কাজ করেন।’

এদিকে এসএমই বা সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের নিয়েই সবসময় কাজ করে এসএমই ফাউন্ডেশন। উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রশিক্ষণ, গবেষণা, নীতি সহযোগিতা প্রদান, ঋণ বিতরণ, ব্যাংকের সঙ্গে উদ্যোক্তার যোগাযোগসহ নানা কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। বিবিএসে ২০১৩ সালে প্রকাশিত অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী এসএমই বা এমএসএমই খাতের উদ্যোক্তা ছিল ৭৮ লাখ ১৩ হাজার। সে সময় বড় উদ্যোক্তার সংখ্যাটি ছিল ৫ হাজারে। সবশেষ ২০২৪ সালে অর্থনৈতিক সমীক্ষার প্রাথমিক যে তথ্য প্রকাশ করেছে বিবিএস, সেখানে বলা হয়েছে, উদ্যোক্তার সংখ্যা ১ কোটি ১৮ লাখ, এখানেও এই ১০ বছরে ছোট উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়লেও বড় উদ্যোক্তার সংখ্যাটা আগের মতোই। অর্থাৎ এক দশকের ব্যবধানে এ দেশে ছোট থেকে বড় উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার সংখ্যাটায় পরিবর্তন নেই।

সিএমএসএমই খাতে যে উদ্যোক্তারা আছেন, তাদের সবার ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব এসএমই ফাউন্ডেশনের থাকলেও তাদের একটি গ-ির মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯ সাল থেকে মডেল কর্মসূচি হিসেবে ‘ক্রেডিস হোলসেলিং’ কার্যক্রম চালু করে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় ক্লাস্টার বেইজ স্বল্পসুদ এবং জামানতবিহীন ঋণ প্রদান করে। ২০০৯-২০ সাল পর্যন্ত এই মডেল ব্যবহার করে মাত্র ১২২ কোটি টাকা ২ হাজার ১৮৬ জন সিএমএসএমই উদ্যোক্তাকে দেওয়া হয়। এর বাইরে ২০১৯ সালে করোনা মহামারীর আগ্রাসনে উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে সরকার ৩০০ কোটি টাকার একটি তহবিল প্রণোদনা হিসেবে দেয় ফাউন্ডেশনকে। এই টাকা ২০টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৪ শতাংশ সুদে বিতরণ করছে প্রতিষ্ঠানটি। চার দফায় এখন পর্যন্ত ১১ হাজার উদ্যোক্তার মধ্যে ১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি। অথচ সরকারি হিসাবেই সারা দেশে উদ্যোক্তার সংখ্যাটা ১ কোটি ১৮ লাখ।

এর কারণ হিসেবে এসএমই ফাউন্ডেশন পাঁচটি বড় সমস্যার কথা তুলে ধরেছে। এর মধ্যে উচ্চ সুদের হার, জামানত প্রদানের বাধ্যবাধকতা, প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাব, ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি এড়ানোর মনোভাব এবং ব্যাংকবহির্ভূত বিকল্প অর্থায়ন সুবিধা না থাকার কারণে অর্থায়ন সমস্যা আরও প্রকট হয়। যে কারণে চাইলেও এ দেশে কটেজ, ক্ষুদ্র, ছোট আকারের উদ্যোক্তারা বড় হতে পারছেন না।

এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, উদ্যোক্তারা যে ছোট থেকে মাঝারি পর্যায়ে যাচ্ছেন না, বিষয়টা তা নয়। কিন্তু যে হারে ঊর্ধ্বতন স্তরে যাওয়ার কথা, সেটা হচ্ছে না। ছোটদের ওপরে ওঠানোর জন্য সরকারি-বেসরকারি যে নীতি-সহযোগিতা দরকার, তার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। বড় কারখানাগুলোর ভূমিকা থাকা উচিত ছোটদের টেনে তোলায়, সেখানে ঘাটতি। ছোটদের পুঁজি দরকার, জামানত ও শর্তের বেড়াজালে সেটা পাচ্ছে না। কারণ ব্যাংকগুলোর প্রবণতাই হচ্ছে বড়দের ঋণ দেওয়া।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত