একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থেকে জামায়াতে ইসলামীর মৃতু্যুদন্ডপ্রাপ্ত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে খালাস দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। গতকাল মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত সদস্যের বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
১০ বছর ৫ মাস আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আজহারের মৃত্যুদন্ডের রায় হয়। সাড়ে পাঁচ বছরের বেশি সময় আগে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে তার সর্বোচ্চ সাজার রায় বহাল থাকে। গতকাল সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে বেকসুর খালাস পেলেন তিনি। তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা না থাকলে তাকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে বলা হয় রায়ে। এর মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো মামলায় এই প্রথম কেউ আপিল বিভাগ থেকে খালাস পেলেন। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, শেখ হাসিনার স্বৈরশাসন আমলে জামায়াতের শীর্ষ ছয় নেতাকে মিথ্যা মামলার মাধ্যমে জুডিশিয়াল কিলিং করা হয়েছে। অন্যদিকে খালাসের রায়ের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও বিবৃতি দিয়েছে বামপন্থি সংগঠনগুলো।
গতকাল আপিল বিভাগ সর্বসম্মতিক্রমে আজহারের আপিল মঞ্জুর করে রায় দেয়। বিকেলে খালাস ও মুক্তির রায়ের অনুলিপি যায় বিচারিক আদালত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। গাজীপুরের কাশিমপুর হাই-সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এটিএম আজহার সেখানে ছিলেন। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তাকে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারা কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে পাঠানো হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল সন্ধ্যায় পৌঁছায়। এদিকে গতকাল বিকেলে আজহারের অন্যতম আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের ফেসবুক পোস্ট থেকে জানা গেছে, আজ সকালে (৯টা-১০টা) এটিএম আজহারুল ইসলাম বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির (বিএমইউ) প্রিজন সেল থেকে মুক্তি পাবেন।
গত ৮ মে আপিল বিভাগে শুনানি শেষে ২৭ মে (গতকাল) রায়ের জন্য দিন ধার্য করেছিল আদালত। এর ধারাবাহিকতায় আজহারের আপিলটি রায় ঘোষণার জন্য আপিল বিভাগের গতকালের কার্যতালিকায় শীর্ষে ছিল। সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটের দিকে আদালত রায় ঘোষণা শুরু করে। রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মাসুম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান প্রমুখ।
পর্যবেক্ষণে যা বললেন আদালত : রায়ে দেওয়া কিছু পর্যবেক্ষণ সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন তার আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তিনি বলেন, আদালত বলেছেন, অতীতের রায়ে বাংলাদেশসহ এ ভারতীয় সাবকন্টিনেন্টের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার পদ্ধতি পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছিল। এটা ছিল সবচেয়ে বড় ভুল। আদালত আরও বলেছেন, আদালতের সামনে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ অ্যাসেসমেন্ট করা ছাড়াই এটিএম আজহারুল ইসলামকে ফাঁসির রায় দেওয়া হয়েছিল। আরেকটি বলেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এটি বিচারের নামে অবিচার এবং যে সব তথ্য-প্রমাণ আদালতে হাজির করা হয়েছিল, অতীতের আপিল বিভাগ তা সঠিকভাবে বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ন্যায়বিচার সৃষ্টির কৃতিত্ব জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বের : এটিএম আজহারের খালাসের রায়ে ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। তিনি বলেছেন, ‘এই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টির কৃতিত্ব জুলাই গণআন্দোলনের অকুতোভয় নেতৃত্বের।’ আপিল বিভাগের রায় উল্লেখ করে তিনি লেখেন ‘নির্দোষ প্রমাণ হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধকালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদন্ডাদেশ থেকে খালাস পেয়েছেন জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম। তিনি আরও লেখেন, ‘এ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টির কৃতিত্ব জুলাই গণআন্দোলনের অকুতোভয় নেতৃত্বের। এ সুযোগ রক্ষা করার দায়িত্ব এখন আমাদের সবার।’
জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের জুডিশিয়াল কিলিং করা হয়েছে: শেখ হাসিনার স্বৈরশাসন আমলে জামায়াতের শীর্ষ ছয় নেতাকে মিথ্যা মামলার মাধ্যমে জুডিশিয়াল কিলিং করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল রাজধানীর কাকরাইলের আইডিইবি ভবনের মুক্তিযোদ্ধা হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রায়ের প্রতিক্রিয়ায় এ কথা বলেন তিনি। জামায়াত আমির বলেন, ‘ইচ্ছাকৃতভাবে জামায়াত নেতৃত্বের গণহত্যা করেছিল স্বৈরাচার সরকার। সাজানো-পাতানো রায়ে জামায়াতের শীর্ষ ৬ নেতাসহ ১১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এভাবে ন্যায়বিচারকে গণহত্যা করা হয়েছিল। জাতির এ সংকট মুহূর্তে যদি তারা বেঁচে থাকতেন তাহলে তাদের প্রজ্ঞা দিয়ে জাতিকে পথ দেখাতে পারতেন।’ আওয়ামী লীগ এ মামলাগুলো পরিচালনা করতে গিয়ে সীমাহীন জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘স্বচ্ছ বিচারের জন্য তাদের বিভিন্ন মহল থেকে অনেক পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তারা তা শোনেনি। কারণ আমাদের নেতৃবৃন্দকে খুন করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। কীভাবে আমাদের নেতৃবৃন্দকে খুন করা হবে তার ছক করেছিল বিচার বিভাগ।’ তিনি বলেন, ‘এসব রায়ে আন্তর্জাতিক কোনো আইন অনুসরণ করা হয়নি। বিচারের নামে প্রহসন চালানো হয়েছে। এটা ছিল জেনোসাইড জাস্টিস।’ শফিকুর রহমান বলেন, ‘এটিএম আজহারুল ইসলামের মুক্তির জন্য দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি রায়ের জন্য আমরা অপেক্ষা করছিলাম। এ রায়ের মাধ্যমে আজ প্রমাণ হয়েছে, সত্যকে চাপিয়ে রাখা যায় না।’
সিন্ডিকেটেড ইনজাস্টিসের অবসান : রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আজহারের আইনজীবী শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এটিএম আজহারুল ইসলামকে সব অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস প্রদান করেছেন। এখন থেকে এটিএম আজহারুল ইসলাম ইন এন ইনোসেন্ট ম্যান। এ রায়ের মাধ্যমে আমরা মনে করি, সত্য জয়ী হয়েছে, মিথ্যা পরাজিত হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জামায়াত এবং বিএনপির ছয়জন শীর্ষস্থানীয় নেতার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছে। অন্তত পাঁচজন জেলেই মৃত্যুবরণ করেছেন। দুনিয়ার ইতিহাসে এটি নজিরবিহীন নির্যাতনের শামিল। এটিএম আজহারুল ইসলাম সৌভাগ্যবান। তিনি ন্যায়বিচার পেয়েছেন। আল্লাহ তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আমরা মনে করি, এ রায়ের মাধ্যমে সিন্ডিকেটেড ইনজাস্টিজের অবসান হয়েছে।’
ফিরে দেখা আজহারের বিচার প্রক্রিয়া : ২০১২ সালের ২২ আগস্ট রাজধানীর মগবাজার থেকে আজহারুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় তিনি জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় রংপুর অঞ্চলে গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতের তৎকালীন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারের বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগ আনা হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কের শুনানি নিয়ে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর গণহত্যা ও হত্যার তিনটি অভিযোগে তাকে ফাঁসির দন্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া অপহরণ, নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগে ২৫ বছর এবং নির্যাতনের আরেকটি অভিযোগে পাঁচ বছর কারাদ-াদেশ দেওয়া হয় তাকে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেন আজহার। শুনানি শেষে ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর তার মৃত্যুদ- বহাল রেখে রায় দেয় আপিল বিভাগ। এ ছাড়া সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে ২৫ বছর সাজা থেকে খালাস এবং পাঁচ বছর কারাদন্ড বহাল রেখে রায় দেয় আপিল বিভাগ। ২০২০ সালের ১৫ মার্চ রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর রায় রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) চেয়ে ২০২০ সালের ১৯ জুলাই আপিল বিভাগে আবেদন করেন তিনি। এ আবেদনে খালাসের পক্ষে তার আইনজীবীরা ১৪টি যুক্তি উপস্থাপন করেন। চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি আজহারের আইনজীবীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ আজহারকে আপিলের অনুমতি দেয়। এর মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো মামলায় সাজাপ্রাপ্ত কারও রিভিউ আবেদন আবারও আপিলের পর্যায়ে যায়।
রংপুর প্রতিনিধি জানান, এটিএম আজহারুল খালাস পাওয়ায় গতকাল তার গ্রামের বাড়ি বদরগঞ্জে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা। তারা আনন্দ মিছিল করেন এবং বাদ আসর মসজিদে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল সন্ধ্যার আগে মিছিলটি বদরগঞ্জ পৌর শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
ঢাবি প্রতিনিধি জানান, এটিএম আজহারের খালাসের প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ছাত্র ইউনিয়ন (একাংশ), বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীসহ বেশ কয়েকটি বাম সংগঠনের নেতাকর্মীরা। গতকাল বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে তারা। পরে সন্ধ্যা ৭টায় ছাত্র ইউনিয়নের অন্য অংশের নেতাকর্মীরা রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বিক্ষোভ করেন।
বামজোটের উদ্বেগ : এটিএম আজহারুল ইসলামের বেকসুর খালাস এবং দেশের সামগ্রিক অরাজক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে জোটের নেতারা বলেন, এ খালাস দেশবাসীর মধ্যে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
