বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন হতে হবে, ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’ সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য দলীয় নেতাকর্মী ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
গতকাল বুধবার বিকেলে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল আয়োজিত ‘তারুণ্যের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সমাবেশ’-এ তারেক রহমান এ কথা বলেন। বিকেল ৪টায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হলে তারেক রহমানকে তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে অভিনন্দন জানান নেতাকর্মীরা।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশের জনগণের সরাসরি ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক, জনগণের কাছে দায়বদ্ধ একটি সরকার দ্রুত দেখতে চাই। সরকারের প্রতি আহ্বান, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে; ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নতুন প্রজন্মের প্রিয় ভাইবোনেরা, প্রিয় দেশবাসী, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন যাতে অনুষ্ঠিত হয়, সে লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করুন।’
দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘আপনারা জনগণের কাছে যান। তাদের প্রত্যাশা জানার চেষ্টা করুন, তাদের প্রত্যাশা বোঝার চেষ্টা করুন, জনগণের মন জয় করুন। কারণ জনগণ বিএনপির রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।’
সমাবেশের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে স্লোগান ধরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘প্রিয় সমাবেশ, দেশবাসী, বলুন, দিল্লি নয় পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’
তারেক বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা শুরু হয়েছে। অল্প সংস্কার আর বেশি সংস্কারের অভিনব শর্তের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে আগামী জাতীয় নির্বাচনের ভবিষ্যৎ। জনগণ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, সংস্কার নিয়ে সময়ক্ষেপণের আড়ালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘পলাতক স্বৈরাচারের সময় আমরা দেখেছি, তারা কীভাবে আদালতকে অবজ্ঞা করেছে, আদালতের রায়কে অবজ্ঞা করেছে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, পলাতক স্বৈরাচারের পর যে সরকার এসেছে তাদের কাছে দেশের মানুষ আশা করেছিল আইনের প্রতি সম্মান থাকবে। আমরা দেখেছি আদালতের রায়ের প্রতি সম্মান না দেখিয়ে ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণের মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণে বাধা দেওয়া হচ্ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, পতিত স্বৈরাচারের আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।’
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘যারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখায় না, যারা আদালতের নির্দেশকে অবজ্ঞা করে, তাদের কাছ থেকে আমরা কতটুকু সংস্কার আশা করতে পারি। আমি প্রায়ই একটি কথা বলি পুঁথিগত সংস্কারের চেয়ে ব্যক্তি মানসিকতার সংস্কার অনেক বেশি জরুরি। ইশরাকের শপথ গ্রহণে বাধা সৃষ্টিতে আমরা আবারও স্বৈরাচারী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাচ্ছি।’
তারেক রহমান বলেন, ‘নিরপেক্ষতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতাই কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান পুঁজি। তাদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, পরামর্শ থাকবে, জনগণের বিশ্বাস, ভালোবাসা নষ্ট হয় এমন কিছু করা ঠিক হবে না। গণতন্ত্রকামী জনগণ এবং গণতন্ত্রের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোকে দয়া করে প্রতিপক্ষ বানাবেন না। যদি রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকতে চান, তাহলে সরকার থেকে পদত্যাগ করে জনগণের কাতারে আসুন, নির্বাচন করুন। জনগণের রায় পেলে আবার সরকারের দায়িত্ব নিন।’
নতুন প্রজন্মের প্রায় সাড়ে তিন কোটি ভোটার সংযুক্ত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন ভোটাররা আজ পর্যন্ত একটি জাতীয় নির্বাচনেও ভোট দিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করার সুযোগ পায়নি। পলাতক স্বৈরাচারের কাছে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা কিংবা নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল না। সংস্কার ইস্যুর পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের দৃশ্যমান প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।’
অতীতের তত্ত্বাবধায়ক সরকার তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করলেও এবার অন্তর্বর্তী সরকার ১০ মাসেও নির্বাচন করতে পাচ্ছে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখছি ১০ মাস পার হয়ে গেলেও অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করছে না। আমরা ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের সরাসরি ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক জনগণের কাছে দায়বদ্ধ একটি সরকার দ্রুত দেখতে চাই।’
তারেক রহমান বলেন, ‘গ্লোবালাইজেশনের এ সময়ে মানুষের আকাক্সক্ষা এখন আর স্বপ্ন দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখন সবার সামনে সম্ভাবনার সব দার উন্মুক্ত। এ সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধি এবং সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে আমাদেরই। আর কথামালার রাজনীতি নয়।’ আগামীতে ক্ষমতায় গেলে জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা, ক্ষুদ্র-কুঠির শিল্পের বিকাশসহ বিভিন্ন বিষয়ে পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। আর এসবের জন্য দরকার জবাবদিহিমূলক সরকার।
সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘সরকার গণহত্যার বিচার ও সংস্কারের নামে নির্বাচন বিলম্বিত করতে চায়। অথচ আমরা আশা করেছিলাম, অন্তর্বর্র্তী সরকার দ্রুত জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেবে।’
স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ‘স্বৈরাচারের পতনের পর আমাদের দ্বিতীয় সংগ্রাম সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আদায়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা সরকারকে সহযোগিতা করছি। আমরা চাই, সরকার সফল হোক। সুষ্ঠু ভোটের পর শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করুক।’
স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘এ সরকারের মাথা থেকে নিচ পর্যন্ত পচন ধরেছে। এরা আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি ক্ষতি করছে। এ সরকার গণমানুষের আকাক্সক্ষা ও আস্থার সরকার ছিল। কিন্তু ৯ মাসে আমরা কিছুই পাইনি। শুধু পেয়েছি অবজ্ঞা।’ মিয়ানমারের রাখাইনে মানবিক করিডর দেওয়া নিয়ে কথা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে লাভ লোকসান দেখার দরকার নেই। আমরা যেমন ছিলাম, তেমন থাকতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘সরকারে যারা আছেন, তাদের বেশিরভাগই দেশের নাগরিক নন। দেশে ব্যাপক চাঁদাবাজি হচ্ছে। এর দোষ বিএনপির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ এসব চাঁদাবাজকে কেন ধরছে না? সরকার বলছে সংস্কার করে নির্বাচন দেবে। কিন্তু গত ৯ মাসে সরকার কিছুই করতে পারেনি। তারা আগামী ৯ বছরেও কিছু করতে পারবে না।’
নির্বাচন নিয়ে হেলাফেলা করা চলবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘সংস্কারের কথা বলে নির্বাচনের রোডম্যাপ পেছানোর কোনো সুযোগ নেই। বিচারের কথা বলে নির্বাচনের রোডম্যাপ পেছানোর কোনো সুযোগ নেই।’ তিনি বলেন, ‘এখন বলা হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে নাকি ঐকমত্য হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে ঐকমত্য না হয়ে থাকলে সেটা করবে জনগণ। ভোট ও ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার সেই সংস্কার করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘৫ আগস্ট না হলে রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা আছেন, তাদের অনেকেই বিদেশে থাকতেন। আর আমাদের হয় জেলে না হয় ফাঁসির কাষ্ঠে থাকতে হতো।’
স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা ডিসেম্বরে নির্বাচনের জন্য রোডম্যাপ চেয়েছিলাম। কারও পদত্যাগ চাইনি। পদত্যাগের নাটক দেখেছে বাংলাদেশের মানুষ। গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য কথা বলা যদি অপরাধ হয়, সেই অপরাধ আমরা বারবার করতে পারব।’ তিনি বলেন, ‘সরকার ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে শপথ পাঠের ব্যবস্থা করুক এবং দ্রুত নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করুক। তা না হলে গণতন্ত্রের দাবিতে, নির্বাচনের দাবিতে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন দুর্ভাগ্যজনক হবে। ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।’
যুবদলের সভাপতি এম মোনায়েম মুন্নার সভাপতিত্বে এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান ও ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছিরের যৌথ সঞ্চালনায় তারুণ্যের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী, যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব প্রমুখ।
নয়া পল্টনে নেতাকর্মীর ঢল : বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের বিপরীতে সমাবেশ মঞ্চ তৈরি করা হয়। সেখানে স্থাপন করা বড় একটি ইলেকট্রনিক পর্দায় তারেক রহমানের বক্তব্য সরাসরি দেখানো হয়। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সমাবেশ শুরু হয়। সকাল থেকেই ছোট ছোট মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা নয়া পল্টনে জড়ো হতে থাকেন। দুপুরের পর নেতাকর্মীদের উপস্থিতি কাকরাইল থেকে শুরু করে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত সড়ক ছাড়িয়ে যায়। সমাবেশ শুরু হলে ভিড় মতিঝিল, পল্টন, কাকরাইল মোড় পেরিয়ে আশপাশের এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। রঙ-বেরঙের ক্যাপ পরা নেতাকর্মীদের হাতে দেখা যায় লাল-সবুজ জাতীয় পতাকা এবং দলীয় পতাকা। ‘তারুণরা বিএনপির ভ্যানগার্ড’সহ নানান স্লোগান দিতে দেখা যায় আগতদের। সমাবেশ শুরুর আগে জাসাস শিল্পীরা গান পরিবেশন করেন।
বিএনপির তিন সংগঠনের উদ্যোগে মে মাস জুড়ে সারা দেশের ১০টি সাংগঠনিক বিভাগকে ৪টি বৃহত্তর বিভাগে ভাগ করে চারটি বড় বিভাগ ও শহরে ‘সেমিনার’ এবং ‘তারুণ্যের সমাবেশ’ হয়। নয়া পল্টনের সমাবেশের মধ্য দিয়ে এ কর্মসূচির সমাপ্তি হয়।
রাজধানী জুড়ে তীব্র যানজট : গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরো শহর জুড়েই তীব্র যানজট দেখা গেছে। সমাবেশে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, কুমিল্লাসহ আশপাশের জেলা থেকে বাসে করে নেতাকর্মীরা রাজধানীতে আসেন। এ ছাড়া নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে লোকজন সমাবেশে আসায় যান চলাচল সীমিত হয়ে যায়। মিরপুর ও উত্তরার কিছু অংশ বাদে পুরো নগরেই যানজট ছিল।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. সরওয়ার সাংবাদিকদের জানান, বিএনপির তিন সংগঠনের সমাবেশের পাশাপাশি সকালে (গতকাল) জামায়াতের নেতা আজহারুল ইসলামের মুক্তির পর শাহবাগে বিপুলসংখ্যক লোক জড়ো হন। সেখানে যানজট সৃষ্টি হয়। আজহারুল ইসলামকে শাহবাগ মোড়ে রাস্তার পাশে মঞ্চ বানিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
