জামায়াতের নিবন্ধন

অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় বাতিল

আপডেট : ০২ জুন ২০২৫, ০৭:১৭ এএম

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে প্রায় ১২ বছর আগে হাইকোর্টের দেওয়া রায়টি বাতিল করেছে সর্বোচ্চ আদালত। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতের আপিল মঞ্জুর করে গতকাল রবিবার সকালে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়।

আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়েছে, রুল যথাযথ ঘোষণা করে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছে, তা ন্যায়সংগত হয়নি। গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় ২০১৩ সালের ১ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে দেওয়া রায় ও আদেশ বাতিল করা হলো। রায়ে দলটির ক্ষেত্রে অনিষ্পন্ন রেজিস্ট্রেশন বা অন্য কোনো ইস্যু যদি থেকে থাকে, তা সাংবিধানিক ম্যান্ডেট পুরোপুরি প্রয়োগ করে নিষ্পত্তি করতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) নির্দেশ দেয় আপিল বিভাগ।

২০১৩ সালে হাইকোর্টের রায়ে জামায়াতে ইসলামীর রেজিস্ট্রেশন অবৈধ ঘোষণার পর থেকে নানা আলোচনা ও আইনি শুনানি চলছিল। অবশেষে ১১ বছর ৯ মাস পর সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে বিষয়টির নিষ্পত্তি হলো এবং এর মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী নিবন্ধন ফিরে পাচ্ছে। জামায়াতের আইনজীবীরা আপিল বিভাগের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ ও আশাবাদ ব্যক্ত করে বলছেন, ইসি তাদের নিবন্ধন দ্রুত ফিরিয়ে দেবে। অন্যদিকে ইসির আইনজীবী বলেছেন, আপিল বিভাগ জামায়াতের প্রতীক নিয়ে কিছু বলেননি। এর আগে গত ১৪ মে আপিলের ওপর শুনানি নিয়ে রায়ের জন্য ১ জুন (গতকাল) ধার্য করে আদালত।

জামায়াতের নিবন্ধন ও প্রতীক নিয়ে জানতে চাইলে ইসি সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ গতকাল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত জামায়াতের নিবন্ধন ও প্রতীকের ব্যাপারে আদালতের কোনো অবজারভেশন আমরা পাইনি। পাওয়ার পর এ বিষয়ে আইনগতভাবে যেটা প্রযোজ্য, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রায়ের কপি পাওয়ার পর কমিশন বসবে। আইনগতভাবে তারা (জামায়াত) যা প্রাপ্য, তা পাবেন। কোনো কাগজ (আদালতের) হাতে না পাওয়া পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য আমি দিতে পারব না।’

২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতকে নিবন্ধন দেয় ইসি। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে এ নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, জাকের পার্টি, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তানসহ ২৫ রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি। ওই বছরের ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট জামায়াতে ইসলামীকে দেওয়া নিবন্ধনের বৈধতা প্রশ্নে রুল দেয়। ২০১৩ সালের ১ আগস্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের একটি বৃহত্তর বেঞ্চ।

হাইকোর্টের এ রায় স্থগিত চেয়ে জামায়াতের আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালতে আবেদন করলে একই বছরের ৫ আগস্ট সেটি খারিজ হয়ে যায়। পরে ওই বছরের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে জামায়াত। ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর আপিল বিভাগ জামায়াতের করা আপিল খারিজ করে রায় দিলে হাইকোর্টের রায়টি বহাল থাকে। আপিলের শুনানিতে জামায়াতের পক্ষের আইনজীবী অনুপস্থিত থাকায় আদেশে সর্বোচ্চ আদালত উল্লেখ করে ‘ডিসমিসড ফর ডিফল্ট’। এরপর জামায়াতের পক্ষে মামলাটি পুনরুজ্জীবনে আপিল বিভাগের আবেদন করা হলে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত তা মঞ্জুর করে আবেদনটির গ্রহণযোগ্যতার ওপর ২১ অক্টোবর শুনানির জন্য আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। এরপর গত বছরের ২২ অক্টোবর জামায়াতের আবেদন মঞ্জুর করে আপিল বিভাগ। এরই ধারাবাহিকতায় জামায়াতের আবেদনের শুনানি ও নিষ্পত্তি হলো।

গতকাল আপিল বিভাগের রায়ের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, ‘দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময়ের আইনি লড়াইয়ের সফল অবসান হলো। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে নিবন্ধন ফিরে পেল। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা মামলার মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। হাইকোর্টের রায়কে বাতিল ঘোষণা করেছে আপিল বিভাগ।’ তিনি বলেন, ‘আদালত ইসিকে নির্দেশনা দিয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর রেজিস্ট্রেশন এবং অন্য যেসব ইস্যু ইসির সামনে আছে বা আসবে, সেগুলো যেন দ্রুতই নিষ্পত্তি করেন। এর মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী তার নিবন্ধন ফিরে পেল।’

২০১৬ সালের ১২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ফুলকোর্ট সভায় ‘দাঁড়িপাল্লা’ ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে একমাত্র সুপ্রিম কোর্টের মনোগ্রামে ব্যবহৃত হবে এবং কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীকে এই প্রতীক বরাদ্দ না দিতে ইসিকে চিঠি দেয় সুপ্রিম কোর্ট। বিষয়টি নিয়ে এর আগে জামায়াতের আইনজীবী বলেছিলেন, তারা শুনানিতে আদালতের কাছে প্রতীকের বিষয়ে নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণ চেয়েছেন।

গতকাল এ বিষয়ে শিশির মনির বলেন, ‘এ বিষয়টিও ইসির সামনে রেফার করা হলো আদার ইস্যু (অন্যসব বিষয়) হিসেবে। এজন্য আমরা রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশ চেয়েছি। আশা করছি, আগামীকালের মধ্যেই আদেশ হাতে পাব। এ আদেশ আমরা ইসির কাছে উপস্থাপন করব। ইসি অতিদ্রুত জামায়াতের নিবন্ধন ও প্রতীক ফিরিয়ে দেবেÑ এটা আমরা প্রত্যাশা করি।’

ইসির আইনজীবী তৌহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে দিয়ে হাইকোর্ট যে রায়টা দিয়েছিল, ওই রায়টাকে আজ (গতকাল) আদালত বাতিল করে দিয়েছে। ফলে হাইকোর্টের রায়ের আগে যে অবস্থাটা ছিল, সেই অবস্থাটা ফেরত এলো।’ তিনি বলেন, ‘প্রতীকের বিষয়টি এই মামলার ইস্যু ছিল না। এ বিষয়ে আদালত কোনো নির্দেশনা দেয়নি। ওনাদের (জামায়াত) অন্যভাবে এটার সমাধান করতে হবে।’ তিনি বলেন, এখন আদেশটি (আপিল বিভাগের) পাওয়ার পর ইসিকে জানাব। ইসি পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।

আমরা যেন পূর্ণ অধিকার ফিরে পাই : গতকাল রায়ের পর ফেসবুক পোস্টে প্রতিক্রিয়া দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ! বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন-সংক্রান্ত হাইকোর্টের দেওয়া ন্যায়ভ্রষ্ট রায় আজ প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে চার সদস্যের বেঞ্চ বাতিল ঘোষণা করেছে। মহান রবের দরবারে নতশিরে শুকরিয়া আদায় করি, আলহামদুলিল্লাহ, সুম্মা আলহামদুলিল্লাহ। পরবর্তী প্রক্রিয়া নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মহান রবের সাহায্য চাই, আমরা যেন দ্রুতই আমাদের পূর্ণ অধিকার ফিরে পাই। আমিন।’

পরে তিনি আরও একটি পোস্ট করেন। সেখানে লেখেন, ‘আবারও প্রিয় সহকর্মীদের প্রতি আহ্বান আসুন, উচ্ছ্বাস নয়, মিছিল নয়, স্লোগান নয়। নতশিরে রাব্বুল ইজ্জতের শুকরিয়া আদায় করি, তার পবিত্রতা ঘোষণা করি এবং তার নামে তাকবির পেশ করি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের আগাগোড়া তার করুণা-সিক্ত করে রাখুন। আমিন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত