ঋতুস্রাব সম্পর্কে জানে ৬২ শতাংশ কিশোরী ক্রীড়াবিদ

আপডেট : ০২ জুন ২০২৫, ০৭:২৩ এএম

দেশের ৬২ শতাংশ কিশোরী আগেই ঋতুস্রাব সম্পর্কে জানে। তবে এ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পায়নি ৮৬ শতাংশ কিশোরী। ৮৮ শতাংশ কিশোরী বিষয়টি পরিবার ও ৬১ শতাংশ বন্ধুদের থেকে জানতে পেরেছে। অথচ এ বিষয়ে বই থেকে জানতে পেরেছে মাত্র ১১ শতাংশ ও শিক্ষক বা কোচের থেকে ৫ শতাংশ কিশোরী।

বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) ১২-১৯ বছর বয়সী ১০০ জন নারী ক্রীড়াবিদদের ওপর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

গতকাল রবিবার এই গবেষণাসহ অনাথ, ক্রীড়াবিদ, পোশাক শ্রমিকসহ কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা ও সমাধানে উদ্ভাবন নিয়ে চারটি গবেষণার ফল প্রকাশ করে আইসিডিডিআর,বি। প্রতিষ্ঠানের সাসাকাওয়া মিলনায়তনে এই ফল প্রকাশ করা হয়। গবেষণায় আর্থিক সহযোগিতা করে গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা (জিএসি)। আইসিডিডিআর,বির চারটি গবেষক দল আলাদাভাবে এসব গবেষণা করে।

ঋতুস্রাবের শিক্ষা নেই স্কুলে : বিকেএসপিতে পরিচালিত কিশোরীদের ঋতুকালের অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণার ফল উপস্থাপন করেন গবেষণা দলের প্রধান ও আইসিডিডিআর,বি-র পুষ্টি গবেষণা বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ডা. মেহজাবিন তিশান মাহফুজ। গবেষণায় আরও বলা হয়, ৫৭ কিশোরী জানিয়েছে তাদের ঋতুস্রাবের সময় কম খাদ্য গ্রহণের কথা বলা হয়েছে এবং ৬৫ শতাংশ কিশোরীকে শারীরিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তারা কেউই স্কুলে ঋতুস্রাব সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পায়নি। এমনকি মাত্র ৮ শতাংশ কিশোরী মনে করছে তাদের টয়লেট সুবিধা পর্যাপ্ত।

এ সময় ডা. মেহজাবিন তিশান মাহফুজ বলেন, নারী প্রজনন ব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া ঋতুস্রাব। তবে নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য ঋতুচক্র ব্যবস্থাপনা অনেক সময় শারীরিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, যা তাদের পারফরম্যান্স ও সামগ্রিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

গবেষণায় বলা হয়, কিশোরী ক্রীড়াবিদদের জন্য বয়স উপযোগী, সমন্বিত ঋতুস্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। তাদের পুষ্টি, ঋতুচক্র পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপদ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ঋতুস্বাস্থ্য নিয়ে ট্যাবু ভেঙে খোলামেলা আলোচনা, সচেতনতা কার্যক্রম, নারী চিকিৎসক নিয়োগ এবং কোচদের (পুরুষসহ) প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। ঋতুস্রাব কোনো বাধা নয়, বরং সেটি বুঝে খেলোয়াড়দের সহায়তা করলে পারফরম্যান্স আরও উন্নত হবে।

এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া উন্নয়ন পরামর্শক অধ্যাপক অনুপম হোসেন বলেন, ক্রীড়াক্ষেত্রে বাংলাদেশের মেয়েদের সফলতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। আমরা যদি সম্মিলিতভাবে তাদের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে পারি তাহলে তাদের এগিয়ে যাওয়াটা আরও সহজ ও সুগম হবে।

৪-১১ শতাংশ অনাথ কিশোরী আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে জানে : ঢাকা, চুয়াডাঙ্গা ও ফরিদপুরে পৃথক তিনটি সরকারি শিশুপল্লীতে বাস করা কিশোরীদের ওপর ‘হোপবক্স’ শীর্ষক গবেষণা করে আইসিডিডিআর,বি। হোপবক্স মূলত অনাথ কিশোরীদের জন্য তৈরি একটি বয়স ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী টুলকিট। এই টুলকিটে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে পাঁচটি ছবি ও গ্রাফিক্স সমৃদ্ধ বই, প্ল্যাকার্ড ও পাজল রয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়, সরকারের তিনটি সরকারি শিশুপল্লীতে বাস করা অনাথ কিশোরীদের মাত্র ৪-১১ শতাংশ আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে জানে। আইসিডিডিআর,বির উদ্ভাবিত যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্পর্কিত হোপবক্স নামক টুলকিট ব্যবহারের পর জানার মাত্রা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১-৫৯ শতাংশ।

গবেষণায় এ উদ্যোগটি দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি মেয়েদের অনাথ আশ্রমে বিস্তৃত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এই গবেষণা দলের প্রধান আইসিডিডিআর,বি-র মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের রিসার্চ ইনভেস্টিগেটর ফারিয়া রহমান জানান, সারা বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ১৫ কোটি ৩০ লাখ অনাথ শিশু রয়েছে। বাংলাদেশে এই সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। দেশের বিভিন্ন জেলায় পরিচালিত ৮৫টি সরকারি অনাথ আশ্রমের সম্মিলিত ধারণক্ষমতা ১৭ হাজার ৫শ জনের। বর্তমানে এসব শিশু পরিবারগুলোতে নিবন্ধিত রয়েছে ৮ হাজার ৭০০ কন্যাশিশু। এই অনাথ কিশোরীরা সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ। তাদের প্রায়শই যৌন নির্যাতন, শোষণ ও নিপীড়নের শিকার হতে হয়। নিরাপদ পরিবেশের অভাব ও সচেতনতার ঘাটতির কারণে তাদের অনেকেই অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণে জড়িয়ে পড়ে, যা তাদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ, দুটির জন্যই হুমকিস্বরূপ।

এ ব্যাপারে আইপাস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সৈয়দ রুবায়েত বলেন, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা দেশে এখনো প্রয়োজন অনুযায়ী গুরুত্ব পায় না। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের জন্য এই সেবা নিয়ে কাজের সুযোগ খুবই সীমিত। অনাথ কিশোরীরা আরও পিছিয়ে থাকা একটি জনগোষ্ঠী।

আগে জানত ৬ শতাংশ, এখন ৭.৫ শতাংশ : ‘মুখরিত’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, মুখরিত অ্যাপ ব্যবহারের ফলে কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার সম্পর্কে গড় জ্ঞানের স্কোর ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সচেতনতার স্কোর ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত হয়েছে।

এই গবেষণা দলের প্রধান আইসিডিডিআর,বি-র মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের রিসার্চ ইনভেস্টিগেটর ডা. হাসান রাশেক মাহমুদ জানান, ‘মুখরিত‘ হলো কিশোর-কিশোরীদের জন্য একটি ডিজিটাল যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক শিক্ষামূলক অ্যাপ। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ৩ কোটি ৬০ লাখ কিশোর-কিশোরী। তারা যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার (এসআরএইচআর) বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা থেকে বঞ্চিত। ২০২৩ সালে ফেনী জেলার তিনটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (মেয়ে, ছেলে ও সহশিক্ষা) নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই অ্যাপের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। এই অ্যাপ ব্যবহার করে কিশোর-কিশোরীরা নিজে নিজেই প্রজনন স্বাস্থ্য, মাদকাসক্তি, শারীরিক পরিবর্তন প্রভৃতি সম্পর্কে জানতে পারে এবং সহ-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রোগ্রাম ম্যানেজার (অ্যাডোলেসেন্ট হেলথ) ডা. মো. শামসুল হক বলেন, কিশোর-কিশোরীদের বয়স ও বাস্তবতা অনুযায়ী সঠিক তথ্য দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে এবং বিভিন্ন খাতকে একত্র করে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

গার্মেন্টসে অবহেলিত ঋতুকালের স্বাস্থ্যবিধি : তৈরি পোশাক খাতে কর্মরত নারীদের মধ্যে মেনস্ট্রুয়াল কাপের সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন শীর্ষক গবেষণা দলের প্রধান আইসিডিডিআর,বির পুষ্টি গবেষণা বিভাগের রিসার্চ ইনভেস্টিগেটর নাবিলা মাহমুদ জানান, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে ঋতুকালের স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। মেন্সট্রুয়াল কাপ হলো স্যানিটারি প্যাডের মতো নারীদের মাসিকের সময় ব্যবহারের একটি পদ্ধতি। রাবার বা সিলিকনের মতো নরম এবং নমনীয় উপাদান দিয়ে এটি তৈরি করা হয়।

গবেষণায় ঢাকা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৫টি পোশাক কারখানার ৮৫ জন নারী শ্রমিক স্বেচ্ছায় অংশ নেন। তাদের মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা ৬টি মাসিক চক্রজুড়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পুনঃব্যবহারযোগ্য মেডিকেল গ্রেড সিলিকনের তৈরি এই কাপটি ব্যবহারে নারীরা অর্থ সাশ্রয় করতে পেরেছেন। এছাড়া এটি তাদের কর্মস্থল ও আবাসনের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খেয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত ও পরিষ্কার টয়লেটের অভাব রয়েছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েবা আখতার বলেন, আমরা যদি কিশোরীদের স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে না পারি, তাহলে আমরা সুস্থ মা পাব না। আর সুস্থ মা না পেলে সুস্থ প্রজন্ম গড়ে উঠবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত