অযৌক্তিক ব্যয় কমিয়ে সাশ্রয় ৪৬ হাজার কোটি

আপডেট : ০৫ জুন ২০২৫, ০৭:৩৩ এএম

তিন মন্ত্রণালয়ের পাঁচ বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অযৌক্তিক ব্যয় কমিয়ে ৪৬ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই টাকা লুটপাটের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেসসচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার।

গতকাল বুধবার তিনি তার ফেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লেখেন, ‘সরকার কী করছে? প্রায়ই শুনি। আমরা বলি, তবু অনেকেই মানতে চান না। আজ মনে হলো একটা উদাহরণ সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ সবাইকে জানানো দরকার। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করে দেখা গেছে, প্রায় সব প্রকল্পেই অযৌক্তিকভাবে এস্টিমেটেড ব্যয় বা প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে। সরকার এই খরচ কমিয়ে এনেছে।

তিনি আরও জানান, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে ব্যয়সংকোচন হয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৮৫৪ দশমিক ৩২ কোটি টাকা, সেতু বিভাগে ৭ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা, রেলপথ মন্ত্রণালয় ব্যয়ে ৮ হাজার ৩৬ দশমিক ৯০ কোটি টাকা ব্যয়সংকোচন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিভাগে ৭ হাজার ৪৫৪ দশমিক ৩১ কোটি টাকা এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে ব্যয়সংকোচন ১২ হাজার ৪২৫ দশমিক ৫১ কোটি টাকা। এই টাকাটা লুটপাটের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। সরকার জনগণের এই টাকাটা বাঁচিয়ে দিয়েছে। এই টাকা দিয়ে জ্বালানি খাতে সব বকেয়া মিটিয়ে দিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে।

এদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয়সংকোচনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ভূঞাপুর-তারাকান্দি জেলা মহাসড়কের যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ প্রকল্পে ৫৪ দশমিক ১৪ কোটি টাকা, বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পে ১৫৭৬ দশমিক ৫ কোটি টাকা, আশুগঞ্জ নদীবন্দর-সরাইল-ধরখার-আখাউড়া স্থলবন্দর মহাসড়ককে চার লেন জাতীয় মহাসড়কে উন্নীতকরণ প্রকল্পে ৬৫৪ কোটি টাকা, ওয়েস্টার্ন ব্রিজ ইম্প্রুভমেন্টের জন্য ৬১৫ দশমিক ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়সংকোচন করা হয়েছে।

এ ছাড়া ময়মনসিংহ জেলা মহাসড়ক যথাযথ মানে উন্নীতকরণ প্রকল্পে ৪৫ দশমিক ৫৩ কোটি টাকা; ডোমার-চিলাহাটী-ভাউলাগঞ্জ, ডোমার-(বোড়াগাড়ী)-জলঢাকা এবং জলঢাকা-ভাদুরদরগাহ-ডিমলা জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণে ২৪০ দশমিক ৪৫ কোটি টাকা; সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে পণ্য পরিবহনের উৎসমুখে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন করতে সাশ্রয় হয়েছে ২১ কোটি টাকা। অন্যদিকে ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ সড়ক বিভাগাধীন বিভিন্ন সড়ক, সেতু ও কালভার্টগুলোর জরুরি পুনর্বাসন ও পুনর্নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের হবিগঞ্জ অংশের চারটি প্যাকেজ অপ্রয়োজনীয় হওয়ায় বাদ দেওয়া হয়েছে ৪৪২ দশমিক ৭৭ কোটি টাকা।

পাশাপাশি ঢাকা মাস র‌্যাপিড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট সাউদার্ন রুটে ৬৮৭২ দশমিক ৪৬ কোটি টাকা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মিরপুর-১০ ও কাজীপাড়া মেট্রোরেল স্টেশন মেরামত বাবদ ৩৩২ কোটি টাকা ব্যয় কমেছে।

আরও যেসব প্রকল্পে ব্যয় কমেছে : পদ্মা সেতু নির্মাণে ১৮৩৫ কোটি টাকা, মিঠামইন উড়ালসড়ক উপজেলায় উড়ালসড়ক নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় কমানো হয়েছে ৫৫০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া কর্ণফুলী টানেল পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি পর্যালোচনা করে ১২৭ কোটি টাকা এবং পদ্মা সেতু পরিচালন এবং রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি পর্যালোচনা করে ৭৫ কোটি টাকা ব্যয় কমানো হয়েছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্যে পদ্মা সেতু রেলসংযোগ (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্পে ৬২১ দশমিক ৮৯ কোটি টাকা, দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের কাছে গুনদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ (দ্বিতীয় সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পে ৬৬৯৮ দশমিক ৫০ কোটি টাকা ব্যয় কমানো হয়েছে। আর আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত ডুয়েলগেজ ডাবল রেললাইন নির্মাণ এবং বিদ্যমান রেললাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর (দ্বিতীয় সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পে ৫১৮ দশমিক শূন্য ৯ কোটি, বাংলাদেশ রেলওয়ের রোলিং স্টক অপারেশন উন্নয়ন (রোলিং স্টক সংগ্রহ) (প্রথম সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পে ৩৯ দশমিক ১২ কোটি এবং আখাউড়া-আগরতলা ডুয়েলগেজ রেল সংযোগ নির্মাণ (বাংলাদেশ অংশ) শীর্ষক প্রকল্পে সাশ্রয় হয়েছে ১৫৯ দশমিক ২৮ কোটি টাকা

বিদ্যুৎ বিভাগের অধীনে ১০ শতাংশ ব্যয় হ্রাসের পরিকল্পনার আওতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গত বছরের আগস্ট থেকে মে পর্যন্ত ব্যয়সাশ্রয় হয়েছে ১৫০০ কোটি টাকা। জ্বালানিভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি আমদানির সার্ভিস চার্জ ৯ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার মাধ্যমে ৪৭০ কোটি টাকা ব্যয়সাশ্রয় হয়েছে। তরল জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি শিপমেন্টে ১৫ হাজার টনের পরিবর্তে ২০ হাজার টন নির্ধারণের ফলে ব্যয়সাশ্রয় হয়েছে ৩৫৪ কোটি টাকা। মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যারিফ ৮ দশমিক ৪৪৭৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বিদ্যুতের বর্তমান গড় বিক্রয়মূল্যের (৮ দশমিক ৯৫ টাকা) চেয়ে কম। এ উদ্যোগের ফলে বছরে সাশ্রয় ২৫০০ কোটি টাকা ও সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর ট্যারিফ হ্রাসকরণের মাধ্যমে সাশ্রয় হয়েছে ২৬৩০ দশমিক ৩১ কোটি টাকা।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ রহিত করে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০০৮’ অনুসরণ করে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অবাধ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে স্পট মার্কেট থেকে ১৭ কার্গো এলএনজি কেনায় ১২৬ দশমিক ৭৬ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৫০টি অনুসন্ধান/উন্নয়ন কূপ খনন করাসহ নতুন তিনটি রিগ ক্রয় করে বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ১৮টি অনুসন্ধান/উন্নয়ন কূপ খনন করে দৈনিক ৯৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস (গড়মূল্য ৬ কোটি টাকা) জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে ২১৯০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক দরপত্রের শর্ত শিথিল করাসহ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর নেগোসিয়েশনের ফলে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৯ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে ৯৮১৪ কোটি টাকা।

রংপুর, নীলফামারী, পীরগঞ্জ এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় গ্যাস বিতরণ পাইপলাইন নেটওয়ার্ক নির্মাণ প্রকল্পে ৫৬ দশমিক ২৫ কোটি টাকা। কেজিডিসিএলের আবাসিক গ্রাহকদের জন্য প্রি-পেইড গ্যাস মিটার স্থাপন প্রকল্প-৩৩ দশমিক ৫৩ কোটি টাকা। চট্টগ্রামে আগ্রাবাদ এলাকায় তিনটি বেইজমেন্ট ফ্লোরসহ ১৯-তলা মেঘনা ভবন নির্মাণ (দ্বিতীয় সংশোধন প্রকল্প)-৫৮ দশমিক ৬৮ কোটি টাকা। বগুড়া-রংপুর- সৈয়দপুর গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নেটওয়ার্ক নির্মাণ প্রকল্প-১১৭ দশমিক ৭২ কোটি টাকা। ফৌজদারহাট-সীতাকুন্ডু-মিরসরাই পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প-১৮ দশমিক ৮৩ কোটি টাকা। ডিজাইন, সাপ্লাই, ইনস্টলেশন, টেস্টিং অ্যান্ড কমিশনিং অব কাস্টডি ট্রান্সফার ফো মিটার উইথ সুপারভাইসরি কন্ট্রোল এট ইআরএল ট্যাংক ফার্ম- ৯ দশমিক ৭৪৭৭ কোটি টাকা সাশ্রয়ের কথা জানানো হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত