পানি মহান আল্লাহর অপার নেয়ামত। পানি শুধু দৈহিক পিপাসা নিবারণের মাধ্যম নয়, বরং জমিনের শুষ্কতা ঘুচিয়ে সবুজ শ্যামলতা ফিরিয়ে আনা, পশু-পাখির জীবনধারণ নিশ্চিত করা এবং কৃষিভিত্তিক জীবিকার মূল আধার হিসেবেও পানি এক অমূল্য উপাদান। পিপাসার্ত ব্যক্তিকে পানি পান করানোর মাধ্যমে একজন বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে, এমনকি তার পাপ মোচনের পথও খুলে যেতে পারে। হাদিসে এমন ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে, যেখানে একজন পাপী বান্দা কুকুরকে পানি পান করিয়ে আল্লাহর রহমতের অধিকারী হয়েছেন। তাই কেবল মানুষ নয়, বরং যেকোনো প্রাণীকে পানি পান করানোও সওয়াবের কাজ হিসেবে গণ্য হয়েছে। এই মানবিকতা ও করুণার শিক্ষাই ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য।
পানি পান করানোর ফজিলত, এর গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে অনেক বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) জমজম কূপের কাছে এলেন। তখন লোকেরা পানি তুলে হাজিদের পান করাচ্ছিল। তখন তিনি বললেন, তোমরা এ কাজ চালিয়ে যাও। তোমরা ভালো কাজেই রত আছ। (সহিহ বুখারি)
শীত-গ্রীষ্ম সব মৌসুমেই পানি বিতরণ করা ভালো। তবে প্রচণ্ড গরম ও তাপ দাহের সময় তা অধিক উত্তম। উত্তপ্ত দিনগুলোতে পানি পান করানো, পানি বিতরণ, তৃষ্ণার্ত কলিজাকে ঠাণ্ডা করা, পিপাসার্ত হৃদয়গুলোকে পরিতৃপ্ত করা অন্যতম শ্রেষ্ঠ সদকা ও উত্তম ইবাদত। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পানি পান করানোর চেয়ে বড় সওয়াবের কোনো সদকা নেই।’ (সুনানে বায়হাকি)
এক হাদিসে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘আদম সন্তানের দেহে তিন শত ষাটটি সংযোগ অস্থি বা গ্রন্থি আছে। প্রতিদিন সেগুলোর প্রতিটির জন্য একটি সদকা ধার্য আছে। প্রতিটি উত্তম কথা একটি সদকা। কোনো ব্যক্তির তার ভাইকে সাহায্য করাও একটি সদকা। কেউ কাউকে পানি পান করালে তাও একটি সদকা এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানোও একটি সদকা।’ (আদাবুল মুফরাদ) ইরবাজ বিন সারিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে পানি পান করালেও সে সওয়াব পাবে।’ (মুসনাদে আহমাদ)
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘একজন লোক রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে তার ভীষণ পিপাসা লাগল। সে কূপে নেমে পানি পান করল। এরপর সে বের হয়ে দেখতে পেল যে, একটা কুকুর হাঁপাচ্ছে এবং পিপাসায় কাতর হয়ে মাটি চাটছে। সে ভাবল, কুকুরটারও আমার মতো পিপাসা লেগেছে। সে কূপের মধ্যে নামল এবং নিজের মোজা ভরে পানি নিয়ে মুখ দিয়ে সেটি ধরে ওপরে উঠে এসে কুকুরটিকে পানি পান করাল। আল্লাহতায়ালা তার আমল কবুল করেন এবং তার গুনাহ মাফ করে দেন। সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! চতুষ্পদ জন্তুর উপকার করলেও কি আমাদের সওয়াব হবে? তিনি বললেন, প্রত্যেক প্রাণীর উপকার করাতে পুণ্য রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি)
ইমাম আইনি (রহ.) বলেন, এ হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, পানি পান করানো একটি শ্রেষ্ঠ ইবাদত। জনৈক তাবেয়ি বলেন, যে ব্যক্তি অনেক পাপ করেছে, তার উচিত পানি পান করানো। কেননা, যেহেতু কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে জনৈক ব্যক্তির সমস্ত গুনাহ মাফ করা হয়েছে, তাহলে যে ব্যক্তি মুমিনকে পানি পান করায় তার ব্যাপারে আপনার ধারণা কী?
গরিব, মিসকিন, অভাবী ও অসহায় যাদের পানির বিল পরিশোধ করার ক্ষমতা নেই এবং পানি ছাড়া বিকল্প কোনো উপায়ও নেই, তাদের পানির বিল পরিশোধ করে দেওয়া পানি পান করানো ও তা দান করার পর্যায়ভুক্ত হবে।
উত্তম সৎ আমলের অন্তর্ভুক্ত হলো সর্ব সাধারণের পানি পানের জন্য বিশেষভাবে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করে দেওয়া। যেমন নলকূপ স্থাপন, পানির হাউজ তৈরি করা ইত্যাদি। অনুরূপভাবে এগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়া, ওয়াকফ করা, ওয়াকফকৃত স্বচ্ছ ও সুপেয় পানির ঘাট নির্মাণ, গরিব অসহায়দের বাড়িতে পানির লাইন লাগিয়ে দেওয়া, পানির বোতল বিতরণ করা এবং রাস্তা-ঘাট, বাজার ও মসজিদ প্রভৃতি স্থানে পানির সুব্যবস্থা করে দেওয়া। হজরত ওসমান (রা.) রুমার কূপ ক্রয় করে তা মুসলমানদের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। এটা তিনি ওই সময় করেছিলেন, যখন হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা দেন, ‘যে ব্যক্তি রুমার কূপটি খনন করে দেবে তার জন্য জান্নাত রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি)
হজরত আনাস বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সাতটি আমলের সওয়াব বান্দার মৃত্যুর পর কবরে থাকা অবস্থায় তার জন্য জারি থাকে। যে ব্যক্তি কাউকে বিদ্যা শিক্ষা দেবে, অথবা নদী খনন করবে, অথবা কূপ খনন করবে, অথবা খেজুর গাছ লাগিয়ে যাবে, অথবা মসজিদ তৈরি করবে, অথবা পবিত্র কোরআনের উত্তরাধিকার রেখে যাবে অথবা এমন সন্তান রেখে যাবে যে মৃত্যুর পর তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে।’ (মুসনাদে বাজজার)
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কেয়ামতের দিন তিন শ্রেণির লোকের প্রতি আল্লাহ দৃষ্টিপাত করবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। এক. যার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি আছে, অথচ সে মুসাফিরকে তা দিতে অস্বীকার করে। দুই. যে ইমামের হাতে একমাত্র দুনিয়ার স্বার্থে বাইয়াত হয়। যদি ইমাম তাকে দুনিয়াদারির কিছু দেয়, তাহলে সে খুশি হয়। আর যদি না দেয় তবে অসন্তুষ্ট হয়। তিন. যে আসরের পর অন্য লোকের কাছে দ্রব্য সামগ্রী বিক্রয় করতে গিয়ে এরূপ কসম খায় যে, আল্লাহর শপথ! এটা এত টাকা দাম হয়েছে। তাকে বিশ্বাস করে একজন দ্রব্য ক্রয় করে নিয়ে যায়। (সহিহ বুখারি)
