গল টেস্টে মুশফিক-শান্তর সেঞ্চুরি

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস : ২৯২/৩ (নাজমুল শান্ত ১৩৬*, মুশফিকুর রহিম ১০৫*)

আপডেট : ১৮ জুন ২০২৫, ০৭:৩২ এএম

দেয়ালে যখন পিঠ ঠেকে যায়, তখন ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। বেশ কিছুদিন ধরেই বাংলাদেশের ক্রিকেট পার করছে ক্রান্তিকাল। মাঠের খেলায় সাফল্য নেই, ক্রিকেট প্রশাসনে অস্থিরতা। মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন পৃষ্ঠপোষকরা, সমর্থকরাও অভিমানী। এমন সময়ে গলে আরেকটা আত্মাহুতির সকাল যখন চোখ রাঙাচ্ছে, তখনই প্রতিরোধের শুরু নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুশফিকুর রহিমের ব্যাটে। তাই তো ৪৫ রানে ৩ উইকেট চলে যাওয়ার পরও গল টেস্টের প্রথম দিনটা বাংলাদেশের। শান্ত ও মুশফিকের সেঞ্চুরিতে ভর করে প্রথম দিন শেষে  বাংলাদেশের সংগ্রহ ৯০ ওভারে ৩ উইকেটে ২৯২ রান;  শান্ত অপরাজিত ১৩৬ রানে আর মুশফিকের সংগ্রহ ১০৫* রান। গল টেস্ট দিয়ে শুরু হলো আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৫-২৭ চক্র। এই ম্যাচটা খেলেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলবেন অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজ। মাঠের সাইটস্ক্রিনে তার ছবি, মাঠে নামার আগে সতীর্থদের কাছ থেকে পেয়েছেন গার্ড অব অনার। তাকে জয়ের আনন্দে সসম্মানে বিদায় দিতে মরিয়া সতীর্থরা! এমন একটা আবহে যে টেস্ট ম্যাচের শুরু, সেখানে বাংলাদেশ তো শুরু থেকেই ব্যাকফুটে। কারণ মেহেদী হাসান মিরাজ একাদশে নেই। টসটা জিতলেন শান্ত, ইনিংসের গোড়াপত্তনে পাঠালেন এনামুল হক বিজয় আর সাদমান ইসলামকে। তার নিজেরই সূচনায় আসার একটা আভাস ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন। তাতে দিনশেষে ভালোই হয়েছে।

এনামুল হক বিজয় বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক বিস্ময় মেশানো আক্ষেপের নাম। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৩ বছর কাটিয়েও পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পেলেন না। ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্বল প্রতিপক্ষদের পেয়ে চড়াও হয়ে রান করে আলোচনায় আসেন, নির্বাচকদের একটা চাপে ফেলে দেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সুযোগ পাওয়ার পর রান করতে ভুলে যান। মাত্র ৭ টেস্টের ক্যারিয়ারে এমনটাই হয়েছে বারবার, তার ক্যারিয়ারের চতুর্থ ও পঞ্চম টেস্টের মাঝে ৬ বছরের ব্যবধান। পঞ্চম ও ষষ্ঠের মাঝে ব্যবধান ৩ বছরের। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আগের টেস্টে ৩৯ রান করেছিলেন, যা তার সংক্ষিপ্ত টেস্ট ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সুযোগ পেয়ে ১০ বলে করেছেন ০ রান। অফস্টাম্পের বাইরের বলে হালকা ঝুঁকে আলতো করে ব্যাট ছুঁইয়ে ক্যাচ দিয়েছেন উইকেটরক্ষকের হাতে।

প্রশ্ন আছে সাদমানের ব্যাটিং কৌশল নিয়েও। রান করে নয়, বল ছেড়ে ছেড়ে উইকেটে সময় কাটিয়ে থিতু হতে চাওয়াটাই সাদমানের খেলার ধরন। তবে আধুনিক যুগে টেস্ট ক্রিকেটেও এই ধারণা অতীত হতে চলেছে, যার প্রমাণ বেন ডাকেট, স্যাম কনস্টাস কিংবা রোহিত শর্মার মতো ক্রিকেটারদের টেস্ট ম্যাচেও শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং। সাদমান ৫৩ বল খেলে ১৪ রান করে আউট হয়েছেন স্পিনারের বলে ফ্রন্টফুটে ডিফেন্স করতে গিয়ে সিøপে ক্যাচ তুলে দিয়ে, যা অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক মানসিকতারই খেসারত। কানপুরে জাকির হাসানের ২৪ বলে ০, গলে এনামুলের ১০ বলে ০ বা সাদমানের ৫৪ বলে ১৩ রানের ইনিংসগুলোই প্রমাণ করে, উইকেটে সেট হওয়ার জন্য রান করা দরকার স্রেফ সময় কাটানোই যথেষ্ট নয়। 

মমিনুল হক বাংলাদেশের স্বীকৃত টেস্ট ব্যাটসম্যানদের একজন। সবশেষ বছর আটেক ধরে এই একটা সংস্করণেই তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেন। তার নিবেদন নিয়ে প্রশ্ন নেই তবে মানহীন ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে খেলে তিনিও ধার হারাচ্ছেন। বড় ইনিংস খেলার যে সুখ্যাতি ছিল মমিনুলের, তার ইনিংসগুলো সেই স্থায়িত্ব পাচ্ছে না। সম্ভাবনা জাগিয়েও থেমে যাচ্ছে অল্পেই। ওয়ান ডাউনে নেমেছিলেন, উইকেটেও এমন কোনো জুজু নেই; স্পিনাররা বল করছেন। মমিনুল ৩৩ বলে ২৯ রান করে ফেলেছেন, খেলছেন স্বাচ্ছন্দ্যে। থারিন্দু রতœায়েকে আগের ওভারের শেষ বলে নিয়েছেন সাদমানের উইকেট, তাকেই ওভারের প্রথম বলে ব্যাকফুটে গিয়ে কাট করার প্রচেষ্টায় সেই একই জায়গায় ধনঞ্জয়া ডি সিলভার হাতে ক্যাচ দিলেন মমিনুল।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ৪৫ রানে ৩ উইকেটের পতনের পরের অংশটুকু অনুমান করা কঠিন নয়। এরপর আরও জনা দুই ব্যাটসম্যানের আত্মাহুতি, তারপর শেষের দিকে বোলারদের নিয়ে জাকের আলী অনিকের মান বাঁচানোর লড়াই। এমনটাই হয়ে আসছে। তবে সেই চিত্রনাট্যে বদল আনলেন শান্ত ও মুশফিক। চতুর্থ উইকেট জুটিতে তাদের অবিচ্ছিন্ন ২৪৭ রানের জুটি, স্থায়িত্ব ৪৪৩ বল। দিনের প্রথম ঘণ্টা দেড়েকের ভেতর ৩ উইকেট তুলে নেওয়া শ্রীলঙ্কান বোলাররা দিনের বাকি সময়টায় আর সাফল্যের দেখা পাননি। দিনের শেষ ওভারে প্রভাত জয়াসুরিয়ার বল শান্তর ব্যাটকে ফাঁকি দিয়ে গেলেও স্টাম্পে লাগেনি, কট বিহাইন্ডের জোরালো আবেদন ছিল তবে রিভিউ নেননি লঙ্কান অধিনায়ক। রিপ্লেতে দেখা গেছে নিলেও লাভ হতো না। গলের মহাসড়ক সদৃশ উইকেটে বোলারদের জন্য তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই। এখানে আগে ব্যাট করা দলের জয়ের জন্য গড় ইনিংস ৪৫৭ রানের আর প্রথম ইনিংসের গড় রান ৩৭৩।

শান্ত-মুশফিকের ব্যাটে জয়ের রাস্তায় কিছুটা পথ পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ, তবে ফিল্মি সংলাপের মতোই ‘পিকচার আভি বাকি হ্যায়’। দুজনকেই দ্বিতীয় দিনে ব্যাট করতে আরও খানিকটা সময়, কারণ মিরাজ না থাকায় এরপর ব্যাটসম্যান এমনিতেই একজন কম, পরের দুই ব্যাটসম্যান জাকের আলী এবং লিটন দাস। তারপরই বোলারদের পালা শুরু। সাড়ে ৪০০-এর গন্তব্যে পৌঁছাতে এখনো অনেকটা পথই বাকি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত