‘হরমুজ’ শঙ্কায় দেশের জ্বালানি খাত

এলপিজিবাহী কোনো জাহাজ প্রণালি পার হয়নি

আপডেট : ১৮ জুন ২০২৫, ০৭:৩৯ এএম

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে কোনো পক্ষ না নিয়েও ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তিন দিনে এলপিজিবাহী কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে দেশের পথে আসতে পারেনি বলে দাবি করেছে এলপিজি অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ। এলপিজি লোড করা অবস্থায় থাকলেও এসব জাহাজ আসতে পারছে না। ফলে পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগর ও আরব সাগরকে সংযোগকারী ‘হরমুজ’ প্রণালি নিয়ে শঙ্কায় দেশের জ্বালানি খাত। শুধু এলপিজি নয়, দেশে আমদানি করা ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) ও তরলি করা প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে জ্বালানি খাতের পাশাপাশি ইরান ও ইসরায়েল যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আরব সাগর ব্যবহার করে চলাচলকারী সমুদ্রগামী জাহাজে পণ্য পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৭ লাখ ৬১ হাজার ৩২০ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেল ১৫ লাখ টন এবং বাকিগুলো পরিশোধিত জ্বালানি তেল। অপরিশোধিত তেলের শতভাগ আসে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে, যা হরমুজ প্রণালি হয়ে ওমান সাগর ও আরব সাগর দিয়ে দেশে আসে।

অন্যদিকে পরিশোধিত তেল সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে আসে। তাই জ্বালানি তেল সরবরাহে হরমুজ প্রণালি নিয়ে শঙ্কার কথা স্বীকার করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান আমিন উল আহসান গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইরান ও ইসরায়েলের যুদ্ধে যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে সংকট দেখা দেবে। বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩০ শতাংশ পরিবাহিত হয় এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে। আমাদের দেশের তেলও এই পথ দিয়ে আসে। তাই হরমুজ প্রণালি নিয়ে শঙ্কা থাকা স্বাভাবিক।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই শঙ্কা শুধু আমাদের একার নয়। বিশ্বের জ্বালানি তেল পরিবহনেই শঙ্কা দেখা দেবে। তবে আমাদের পরিশোধিত তেল আসে সিঙ্গাপুর ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে। তাই পরিশোধিত তেলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে দাম বাড়তে পারে। আর তা আমাদের মেনেও নিতে হতে পারে।’

এদিকে দেশে প্রতিবছর ১৭ লাখ টন এলপিজি আমদানি হয়ে থাকে বেসরকারি খাতে। দেশের প্রায় ১২টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করে দেশের জ্বালানি খাতে সরবরাহ করে আসছে। কিন্তু তিন দিন ধরে কোনো এলপিজিবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি বলে জানান বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আমিরুল হক।

তিনি আরও বলেন, ‘ইরাক, আরব আমিরাত, কাতার ও ওমানে আমাদের এলপিজিবাহী জাহাজ লোড অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাতের কারণে কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়ে আসতে পারছে না। এতে দেশে এলপিজি সংকট হতে পারে। যুদ্ধে আমরা কোনো পক্ষের না হয়েও হয়তো আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাচ্ছি।’

জ্বালানি তেল ও এলপিজি শুধু নয়, শতভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এলএনজি সেক্টরেও। এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হারুন ভূঁইয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এলএনজি নিয়ে অবশ্যই শঙ্কা রয়েছে। ওমান ও কাতার থেকে আসা এলএনজির একমাত্র পথ হরমুজ প্রণালি। এলএনজির বিকল্প উৎস নিয়ে আমরা এখনো ভাবিনি। তবে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত নিয়ে আমাদেরও ভাবতে হবে।’

কাতার ও ওমান থেকে আসা এলএনজি মহেশখালীর মাধ্যমে দেশের পাইপলাইনে প্রবেশ করে সারা দেশে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির উপাত্ত অনুযায়ী দেশে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫১ লাখ ৩৭ হাজার টন এলএনজি আমদানি করা হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি করা হয় ৪০ লাখ ৮৪ হাজার টন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৪৭ লাখ ৬৩ হাজার এলএনজি আমদানি করা হয়।

সমুদ্রপথ নিয়ে কথা হয় নৌবাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার (রুটিন চার্জ) ক্যাপ্টেন এস এম জালাল ইউ গাজীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের জ্বালানি তেল পরিবহনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই পথ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশে^র জ্বালানি খাতে বিপর্যয় হবে এবং এর প্রভাব আমাদের দেশেও পড়বে। আমাদের অপরিশোধিত তেল, এলএনজি ও এলপিজি এই পথ দিয়েই আসে।’

তিনি আরও বলেন, শুধু জ্বালানি তেল নয়, নৌবাণিজ্যে পণ্য পরিবহনেও সমস্যা হবে। তখন ইউরোপ ও আমেরিকায় পণ্য নিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলো ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করবে এবং জাহাজের ভাড়া বেড়ে যেতে পারে।

একই মন্তব্য করেন বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ ইকবাল আলী শিমুল। তিনি বলেন, ‘ইরান ও ইসরায়েল যুদ্ধে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে কিংবা যুদ্ধ লাগলে অবশ্যই বিশ্বে নৌপরিবহনে বিপর্যয় ঘটবে। জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাবে এবং দিনশেষে এই বর্ধিত ভাড়া ভোক্তার ওপরে পড়বে।’

সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে সমস্যা হলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের করণীয় কী হতে পারে, জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) ক্যাপ্টেন আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ বলেন, ‘এ বিষয়টি পুরোপুরি বৈশি^ক। তারপরও পণ্য পরিবহনে অন্যান্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীদের প্রতি সাপোর্ট অব্যাহত রাখবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত