ইরানের ঐতিহ্যবাহী নাসিরুল মুলক মসজিদ

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৫, ১২:৪৬ এএম

ইরানের ঐতিহ্যবাহী শহর শিরাজে অবস্থিত নাসিরুল মুলক মসজিদ। নানা নামে পরিচিত এই মসজিদটি ‘গোলাপি মসজিদ’ নামেই বেশি খ্যাত, যার প্রতিটি ইঞ্চিতে ইরানি স্থাপত্যকলার সৌন্দর্য ধরা পড়ে। প্রতিটি জানালায় স্থাপিত বর্ণিল কাচ, কারুকার্যমণ্ডিত দরজা ও মোজাইক টাইলস, সব মিলিয়ে এই মসজিদ যেন শিল্প ও ধর্মীয় ভাবনার এক দুর্লভ সম্মিলন। কাজার যুগের শেষভাগে নির্মিত এই স্থাপনাটি প্রাচীন ইরানি নকশা, সূক্ষ্ম অলংকরণ এবং ধর্মীয় পরিমণ্ডলের এক অপূর্ব প্রতিফলন। সূর্যের আলো যখন রঙিন কাচ ভেদ করে মেঝেতে মেলে ধরে রঙধনুর রেখা, তখন মসজিদের অভ্যন্তর যেন এক কল্পনার জগতে রূপ নেয়। নাসিরুল মুলক মসজিদ শুধু স্থাপত্যপ্রেমীদের নয়, বরং আলোকচিত্রশিল্পী, ইতিহাসপ্রেমী, এমনকি সাধারণ দর্শনার্থীদেরও গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। এটি যেন ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্ম ও নান্দনিকতার এক অনবদ্য রূপায়ণ। যুগ যুগ ধরে ইরানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক এই মসজিদ। আলো ও রঙের মায়াজালে মোড়ানো এই স্থাপনাটি শুধু ইরানের গর্ব নয়, বরং মানব সভ্যতার এক অনন্য স্থাপত্যিক কীর্তি।

ধারণা করা হয়, ১৮৭৬ থেকে ১৮৮৮ সালের মধ্যে মির্জা হাসান আলি (নাসিরুল মুলক)-এর আদেশে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। তিনি কাজার শাসকদের মধ্যে অন্যতম। ইরানি স্থপতি মোহাম্মদ হাসান-ই-মেমার এবং মোহাম্মদ রেজা কাশিসাজ শিরাজ এই মসজিদের নকশা তৈরি করেন। চমৎকার এই মসজিদটির নির্মাণকাজ শেষ হতে সময় লেগেছিল প্রায় ১২ বছর।

২৮৯০ বর্গমিটারের এই মসজিদটি নির্মাণকাজের দিক দিয়ে এটি ইরানের সবচেয়ে মূল্যবান মসজিদ। এর দুটি শাবিস্তান (ভূগর্ভস্থ একটি স্থান যা সচরাচর ইরানের প্রাচীন মসজিদ, বাড়ি এবং বিদ্যালয়গুলোতে দেখা যায়। সাধারণত গ্রীষ্মকালে এটি ব্যবহৃত হতো) রয়েছে। একটি পূর্বদিকে এবং অন্যটি পশ্চিমে।

পূর্বদিকের শাবিস্তানে জায়গার মাঝ বরাবর সারিবদ্ধভাবে সাতটি স্তম্ভ রয়েছে। মসজিদের সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর অংশ হলো পশ্চিম শাবিস্তান। সেখানে দুই সারিতে ছয়টি করে মোট বারটি স্তম্ভ বিদ্যমান। সপ্তম স্তম্ভটি দুটি খুঁটির মধ্যে অবস্থিত। একদম শেষ প্রান্তে চমৎকার টালি দিয়ে সাজানো একটি মঞ্চ রয়েছে। মঞ্চের মেঝেটি মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি এবং এর ওপরের অংশ শাবিস্তানের চেয়ে নিচুতে অবস্থিত। পশ্চিম শাবিস্তানে বর্ণিল কাচে সজ্জিত সাতটি কাঠের দরজা রয়েছে। দরজাগুলোর মাধ্যমে বাইরের আঙিনায় বেরিয়ে আসা যায়।

উজ্জ্বল নকশার কাচ, ছাদের দেয়ালে হাজারো রঙিন টালি এবং মেঝেতে পারস্যের ঐতিহ্যবাহী কার্পেট যেন প্রতিটি কোণা থেকে এই প্রার্থনার স্থানে সৃষ্টি করেছে এক অনুপম রঙধনু। এই রঙের মেলায় পুরো মসজিদকে যেন একটি ক্যালিডাইস্কোপের (যার মাঝে অসংখ্য রঙের খেলা দেখা যায়) মতো মনে হয়। মসজিদের ঠিক কেন্দ্রে একটি খোলা চত্বর বিদ্যমান। অসংখ্য ফুলে পরিবেষ্টিত এই চত্বরে একটি আয়তাকার জলাশয়ও রয়েছে।

বিল্ডিংয়ের সামনের অংশে (বহির্ভাগে) ডজনখানেক খিলান যেন এই কাচময় আলোক রাজ্যের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। অন্যান্য মসজিদের মতো নাসিরুল মুলক মসজিদে কোনো গম্বুজ নেই। এটি নির্দেশ করে যে এই ধর্মীয় স্থাপনাটি ব্যক্তিবিশেষের জন্য নির্দিষ্ট ছিল, জনসাধারণের জন্য নয়। ভিন্ন রকমের টাইলসের ব্যবহার মসজিদটিকে দান করেছে অনন্যতা। সেই সঙ্গে এখানে ব্যবহৃত গোলাপি রঙও বেশ দৃষ্টি কাড়ে, যা গোটা ইরানে বিরল।

শরৎ ও শীতকালে যখন কাচের গায়ে সূর্যের আলো পড়ে নীল মোজাইকে প্রতিফলিত হয়, তখন যে দৃশ্যের উদ্ভব ঘটে তা বর্ণনা করার ভাষা নেই। মসজিদের এই নান্দনিক সৌন্দর্যই এটিকে ইরানের অন্যান্য মসজিদ থেকে করেছে আলাদা।

সম্প্রতি নাসিরুল মুলক মসজিদকে রাতেও আলোকিত করা হয়েছে, যাতে বর্ণিল কাচের মধ্য দিয়ে আলো অতিক্রমের মাধ্যমে পুরো মসজিদ এক অনুপম সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত হতে পারে। এখনো এই মসজিদটি প্রার্থনাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৯৫৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মসজিদটি ইরানের জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে নথিভুক্ত হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত