নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৫, ০৭:২৭ এএম

নবায়নযোগ্য জ্বালানির সদ্য অনুমোদিত লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশে বড় মাপের বেসরকারি বিনিয়োগ অপরিহার্য। এর জন্য নীতিমালার মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)-এর সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। 

গতকাল বুধবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, নীতিগত অনিশ্চয়তা, ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা, মুদ্রা ঝুঁকি এবং দেশের অবনতিশীল সার্বভৌম ঋণমান এই খাতে বিনিয়োগের প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে। 

প্রতিবেদনে উল্লেখ, ছোট আকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে (যেমন ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, সৌর সেচ) বিনিয়োগ বাড়াতে ঝুঁকি প্রশমনের স্কিম, বিশেষায়িত সবুজ অর্থায়ন তহবিল এবং আমদানি শুল্ক ছাড়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন। বৃহৎ ইউটিলিটি-স্কেল প্রকল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণে স্থিতিশীল নীতিমালা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ অত্যন্ত জরুরি। 

নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫ অনুসারে, ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারিত। আইইইএফএ জানায়, এই লক্ষ্য পূরণে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বছরে ৯৩৩ থেকে ৯৮০ মিলিয়ন ডলার এবং ২০৩১-৪০ সালে বছরে ১.৩৭ থেকে ১.৪৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। 

গবেষণা প্রতিবেদনের সহ-লেখক ও আইইইএফএর বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, এই বিপুল অর্থের চাহিদা শুধু সরকারি অর্থায়ন দিয়ে পূরণ সম্ভব নয়, ব্যাপক বেসরকারি বিনিয়োগ অপরিহার্য। 

তবে হঠাৎ নীতিমালা পরিবর্তন, পাইপলাইনে প্রকল্পের অভাব, জটিল ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া, ভূমির উচ্চ মূল্য, মুদ্রার অস্থিরতা এবং দেশের দুর্বল ক্রেডিট রেটিং বেসরকারি বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে বলে মন্তব্য করেন শফিকুল। 

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বহুজাতিক উন্নয়ন ব্যাংক, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন সংস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে মিলে মুদ্রা ঝুঁকি কমাতে বিশেষ তহবিল গঠনের পরামর্শ দিয়েছে আইইইএফএ। 

সম্প্রতি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে প্রতিযোগিতা বিহীনভাবে অনুমোদিত ৩১টি বড় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাতিল করেছে। এটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ। নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগকারীদের জন্য গ্যারান্টি পুনর্বহাল, প্রকল্পের জন্য নির্দিষ্ট ভূমি বরাদ্দ এবং ব্যাংকিং ও সেবা খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। 

শফিকুল আলম আরও বলেন, পেমেন্টের অনিশ্চয়তা দূর করতে সরকার ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন ধারা’ পুনর্বহাল বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনকারীদের জন্য পেমেন্ট সিকিউরিটি কাঠামো গঠন করতে পারে।

তার পরামর্শ, ভূমি অধিগ্রহণ সহজ করতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেল কার্যকর হতে পারে। এই মডেলের মাধ্যমে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে নবায়নযোগ্য প্রকল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি সম্ভব। 

ক্ষুদ্র নবায়নযোগ্য প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে উচ্চ আমদানি শুল্ক, পারফরম্যান্স সংক্রান্ত সমস্যা এবং ঝুঁকির ভয় দূর করা প্রয়োজন বলে মনে করেন আইইইএফএর টেকসই অর্থায়ন কনসালটেন্ট লাবণ্য প্রকাশ জেনা। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সবুজ তহবিলের আওতায় ঋণ বিতরণ সহজ করলে ক্ষুদ্র নবায়নযোগ্য প্রকল্পের প্রসার সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ। সম্প্রতি সরকার সৌরবিদ্যুৎ ইনভার্টারের আমদানি শুল্ক কমিয়েছে। একইভাবে, ছোট আকারের সৌর প্রকল্পে ব্যবহৃত প্যানেল, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ওয়াকওয়ে, মাউন্টিং স্ট্রাকচার ও ডিসি কেবলের শুল্ক কমালে এই খাতে সাফল্যের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবুজ তহবিল থেকে পুনঃঅর্থায়নের পরিবর্তে আগাম অর্থায়ন চালু করলে বিলম্ব কমবে এবং অর্থ বিতরণ প্রক্রিয়া সহজ হবে। তবে আন্তর্জাতিক ঋণ বাজারে বাংলাদেশের নিম্ন ক্রেডিট রেটিং বিদেশি বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে। 

২০২৪ সালের নভেম্বরে মুডিস বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং ‘বি-১’ থেকে কমিয়ে ‘বি-২’ করেছে। এতে আন্তর্জাতিক অর্থবাজারে বাংলাদেশের ঋণ গ্রহণ আরও ব্যয়বহুল হয়েছে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করেন লাবণ্য প্রকাশ জেনা। 

শফিকুল আলম বলেন, সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি কোম্পানিগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি সম্ভব, যা জ্বালানি খাতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করবে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত