নুরনবী। বয়স আনুমানিক ২০ বছর। থাকে চট্টগ্রামের পাহাড়তলি এলাকায়। পাঁচ বছর ধরে ছিনতাইসহ সব ধরনের অপরাধ কর্মকান্ড চালিয়ে আসছে। তার নেতৃত্বে অন্তত ২০ জন সদস্য দাবড়ে বেড়াচ্ছে। লুট হওয়া পুলিশের একটি পিস্তল ব্যবহার করে এসব অপকর্ম চালিয়ে আসছিল নুরনবী। ৫০ হাজার টাকা দিয়ে পিস্তল ও গুলি কেনে সে। চার দিন আগে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করলে থানা থেকে লুটের অস্ত্রের বিষয়ে তথ্য পান কর্মকর্তারা।
গত বছর ৩০ নভেম্বর মুন্সীগঞ্জে শাহিদা আক্তার নামে এক তরুণীকে গুলি করে হত্যা করে তৌহিদ শেখ ওরফে তন্ময় নামে এক যুবক। ওই যুবকের বিষয়ে তদন্ত করে অস্ত্রের ধরন দেখে পুলিশ নিশ্চিত হয়; থানা থেকে লুট করা অস্ত্র দিয়েই তরুণীকে হত্যা করা হয়। ডিএমপির ওয়ারী থানা থেকে লুট করা পিস্তল ব্যবহার করেন তৌহিদ। তিনি এক সময় ডাকাতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। এ দুটি ঘটনার মতোই থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালিয়ে লুট করা আগ্নেয়াস্ত্র অপরাধ কর্মকা-ে ব্যবহৃত হচ্ছে। ছিনতাইকারী-ডাকাতসহ অন্য অপরাধীদের হাতে চলে গেছে ওইসব আগ্নেয়াস্ত্র। এসব অস্ত্র উদ্ধার করতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিশেষ বার্তা পাঠানো হলেও কাজে আসছে না। এতে আইনশৃঙ্খলা অবনতি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তারপরও পুলিশ সতর্ক আছে। জোরালো করা হয়েছে অভিযান।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (অপারেশনস) রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রের বেশিরভাগ উদ্ধার করা হয়েছে। অস্ত্রের খোঁজে বিভিন্নভাবে অভিযান চালানো হচ্ছে। অভিযানের মুখে দুর্বৃত্তরা অস্ত্র ফেলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের বিষয়ে পুলিশের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধ করতে সতর্ক রয়েছে পুলিশের সবকটি ইউনিট।
যেসব আগেয়াস্ত্র লুটপাট : পুলিশ-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৪ পুলিশ সদস্য। ওই সময় দুর্বৃত্তরা থানাসহ পুলিশের স্থাপনাগুলোয় হামলা চালিয়ে পুলিশ সদস্যদের হত্যা করে আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করে। এ সময় ঢাকাসহ সারা দেশ থেকে ৫ হাজার ৭৪৯টি অস্ত্র ও ৬ লাখ ৫১ হাজার ৬০৯ রাউন্ড গুলি খোয়া গেছে। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত অন্যান্য উপকরণ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্যাস ক্যানিস্টার, কালার স্মোক গ্রেনেড ও ওয়াকিটকি লুট হয়।
পুলিশের তথ্য বলছে, ঢাকা মহানগর এলাকায় ১ হাজার ৮৯৮টি অস্ত্র লুট করা হয়। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটারের চায়না রাইফেল ৩৪৮টি, ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটারের চায়না এসএমজি ৩০টি, ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটারের চায়না এলএমজি ১৩টি, ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটারের চায়না পিস্তল ১৯৪টি, ৯ দশমিক ১৯ মিলিমিটারের ৫৫৯টি পিস্তল, ১২ বোরের ৫৯৮টি, ৩৮ মিলিমিটারের গ্যাসগান ১৫২টি ও ৩৮ মিলিমিটারের টিয়ার গ্যাস লঞ্চার ৪টি রয়েছে। এসবের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ১ হাজার ২১৭টি। ঢাকার বাইরে অস্ত্র লুট হয়েছে ৫ হাজার ৭৪৯টি। বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র লুট হয়েছে ৮১৫টি, উদ্ধার হয়েছে ৬১৭টি। তাছাড়া গোলাবারুদ লুট হওয়ার মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের ২ লাখ ৮৭ হাজার ৫৫৭ রাউন্ড গুলি রয়েছে। টিয়ার শেল, গ্যাস গ্রেনেড, সাউন্ড গ্রেনেড, কালার স্মোক গ্রেনেড, মাল্টিপল ব্যাং স্টান গ্রেনেড, ফ্ল্যাশ ব্যাং গ্রেনেড, গ্যাস ক্যানিস্টারসহ অন্যান্য গোলাবারুদ লুট হয়েছে ৬ লাখ ৫১ হাজার ৬০৯টি। এর মধ্যে টিয়ার শেল লুট হয়েছে ৩৩ হাজার ৮৩৬টি, উদ্ধার হয়েছে ১৯ হাজার ৬১৩টি, টিয়ার গ্যাস গ্রেনেড লুট হয়েছে ১ হাজার ৪৭৫টি, উদ্ধার হয়েছে ১ হাজার ১৮২টি। সাউন্ড গ্রেনেড লুট হয়েছে ৪ হাজার ৭৩৩টি।
৪৩৮৪টি অস্ত্র উদ্ধার, হয়নি এখনো ১৩৬৯টি : সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে চেষ্টা চালাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৩৮৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে উদ্ধার হয়নি ৭ দশমিক ৩৯ বোরের চায়না রাইফেল ১১৫টি, ৭ দশমিক ৩৯ বোরের বিডি রাইফেল ১টি, এসএমজি (চায়না) ৩০টি, এলএমজি (চায়না) ৩টি, পিস্তল (চায়না) ২১৪টি, ৯ দশমিক ১৯ বোরের পিস্তল ৪৬২টি, ১২ বোরের শটগান ৪০৪টি, ৩৮ বোরের গ্যাসগান (সিঙ্গেল শট) ১৩১টি, ৩৮ বোরের টিয়ার গ্যাস লঞ্চার (সিক্স শট) ৭টি, ২৬ বোরের সিগন্যাল পিস্তল ২টি। তাছাড়া গুলি, সাউন্ড গ্রেনেডসহ আরও কিছু আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
অস্ত্র কেনাবেচায় পুলিশ সদস্য সম্পৃক্ত : পুলিশ সূত্র জানায়, গত ৫ ডিসেম্বর দুপুরে কুষ্টিয়া শহরের শিশু পার্কের পেছনের নালা পরিষ্কার করার সময় এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী একটি শটগান, ছয়টি গুলি ও একটি গুলির খোসা উদ্ধার করে। পুলিশ জানিয়েছে, শটগান-গুলি কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের। এগুলো আন্দোলনের সময় লুট হয়েছিল। গণভবনের দায়িত্বে থাকা এসএসএফ সদস্যদের বিভিন্ন ধরনের ট্যাকটিকাল গিয়ার, অস্ত্র, গোলাবারুদ, সাজ-সরঞ্জাম, বেতার যোগাযোগ ও অপারেশনাল সরঞ্জামাদির মজুদ ছিল। জাতীয় সংসদ ভবনেও এসএসএফের অস্ত্র-গোলাবারুদ মজুদ ছিল। ৫ আগস্ট জনতা গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশ করার পর সব অস্ত্র লুট হয়ে যায়। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে অত্যাধুনিক অ্যাসল্ট রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, ফ্ল্যাশ ব্যাং গ্রেনেড, অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম, বেতার যোগাযোগের ডিভাইস ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদসহ ৩২টি ভারী অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। গত ২০ মার্চ চট্টগ্রামের পতেঙ্গা কাঠগড় ও বাকলিয়া এলাকা থেকে থানা থেকে লুট হওয়া বিদেশি পিস্তল বিক্রির ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে মো. রিয়াদ নামের এক পুলিশ কনস্টেবলসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কনস্টেবল রিয়াদ চাঁদপুর জেলায় কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি সাতকানিয়ায়। গ্রেপ্তারের পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে রিয়াদ জানিয়েছেন, আরও কয়েকটি পিস্তল ছিনতাইকারী ও ডাকাত গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তারা এগুলো ব্যবহার করে অপকর্ম চালাচ্ছে।
ছিনতাই-ডাকাতদের কাছে লুটের অস্ত্র : নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত ডিআইজি পদমর্যাদার দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালানো ৭০০ আসামি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে আছে। পুলিশের লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র-গোলাবারুদ অপরাধীদের হাতে চলে গেছে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। ছিনতাইকারী ও ডাকাত সদস্যরাও এসব অস্ত্র ব্যবহার করছে। এতে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আগ্নেয়াস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার ও জেলপলাতক আসামিদের ধরতে না পারলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার শঙ্কা আছে। অস্ত্র উদ্ধার করতে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। তবে বার্তায়ও কাজে আসছে না। দুদিন আগে আরও কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে দেশের সবকটি থানায়।
তারা আরও বলেন, সারা দেশে ৬৬৪টি থানা আছে। ৫ আগস্ট ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি, বক্সসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট-স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পুড়িয়ে দেওয়া হয় থানা-পুলিশের কাজে ব্যবহৃত গাড়ি। এসব জায়গা থেকে পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র-গোলাবারুদ লুট হয়। ৫ আগস্ট দুপুরের পর সারা দেশে পুলিশি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ সদস্যরা থানায় যেতে সাহস পাননি। একপর্যায়ে পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা পাহারা দেওয়ার জন্য আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়। গত বছর ১৩ আগস্ট ঢাকাসহ সব থানার কার্যক্রম আবার শুরু হয়।
জানা গেছে, গত বছর ৫ আগস্ট গণআন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। সেদিন ঢাকাসহ সারা দেশে পুলিশের স্থাপনাগুলো ব্যাপক হামলার শিকার হয়। এর আগে ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচির দিন থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত থানা, ফাঁড়িসহ পুলিশের স্থাপনায় হামলা, কারাগারের অভ্যন্তরে বন্দিদের বিদ্রোহ, পালিয়ে যাওয়া ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও গোলাবারুদ লুটপাটের তুলনায় কম উদ্ধার হয়েছে। এসব আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও গোলাবারুদ চিহ্নিত অপরাধীদের কাছে বিক্রি হচ্ছে। দুর্বৃত্তরা কমমূল্যে অস্ত্র হাতবদল করছে। আমাদের ভয়ের শঙ্কা ‘কিছু আগ্নেয়াস্ত্র ছিনতাইকারী ও ডাকাতদের’ কাছে চলে গেছে। লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রে পুলিশ বাহিনীর সাংকেতিক চিহ্ন রয়েছে। এতে অস্ত্রগুলো সহজেই চিহ্নিত করা যায়।
