বছরের ৫৮% ডেঙ্গু রোগী জুনে

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৫, ০৭:২০ এএম

শেষ হলো বছরের সর্বোচ্চ ডেঙ্গু সংক্রমণের মাস জুন। বছরের রোগীর ৫৮ শতাংশ ভর্তি হয়েছে গত মাসে ও মারা গেছে মৃত্যুর ৪৫ শতাংশ। জুনের এই রোগীর সংখ্যা মে মাসের তিন গুণ বেশি ও মৃত্যু ছয় গুণ।

এমনকি মাসের শেষ দিনেও গতকাল সোমবার বছরের সর্বোচ্চ ৪২৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তির রেকর্ড হয়েছে ও রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। এর আগে বছরের সর্বোচ্চ ৩৯৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছিল ২৪ জুন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫ হাজার ৯৫১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয় ও মারা যায় ১৯ জন। রোগী ও মৃত্যুর এ সংখ্যা বছরের সর্বোচ্চ। এর আগে সর্বোচ্চ রোগী ছিল মে মাসে ১ হাজার ৭৭৩ জন। কিন্তু জুনে তার চেয়ে তিন গুণ বেশি রোগী ভর্তি হয়।

এর আগে বছরের সর্বোচ্চ মৃত্যু ছিল জানুয়ারিতে ১০ জন। গত মাসে বেড়ে ১৯ জনে পৌঁছায়। মে মাসে মৃত্যু ছিল তিনজনের। সে তুলনায় জুনে ছয় গুণের বেশি মানুষ মারা গেছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৪২৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছে, যা বছরের দৈনিক সর্বোচ্চ রোগী। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ বা ১৪৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছে বরিশাল বিভাগে। এরপর ঢাকা বিভাগে ৬১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৫৭, রাজশাহী বিভাগে ৫৪, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৪৫, ঢাকা উত্তর সিটিতে ৪২ ও খুলনা বিভাগে ২১ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি রোগীর ৩৯ শতাংশই ছিল দুই জেলা বরগুনা ও ঢাকায়। এর মধ্যে রাজধানীসহ ঢাকা জেলায় ৯২ জন বা ২১ শতাংশ ও বরগুনায় ৭৭ জন বা ১৮ শতাংশ রোগী ভর্তি হয়। এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভর্তি হয় ৪৩ জন বা ১০ শতাংশ ও বরিশাল জেলায় ৩৭ জন বা ৯ শতাংশ। অর্থাৎ গতকাল দেশের ৩৩ জেলায় রোগী পাওয়া গেছে।

বছরের রোগী ৫ জেলায় : জুনের শেষ দিনে গতকাল পর্যন্ত এ বছর ডেঙ্গু রোগীর অর্ধেক ছিল পাঁচ জেলায়। এসব জেলায় রোগী পাওয়া গেছে ৫ হাজার ৪৭ জন, যা মোট রোগীর ৪৯ শতাংশ। এর মধ্যে বরগুনায় ২৭ শতাংশ বা ২ হাজার ৭৪৬ জন, ঢাকায় ২৩ শতাংশ বা ২ হাজার ৩১৮, বরিশালে ৯ শতাংশ বা ৯৪৮, পটুয়াখালীতে ৬ শতাংশ বা ৫৮৫ ও চট্টগ্রাম জেলায় ৪ শতাংশ বা ৪৫০ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুও হয় ওই বছর। ২০২২ সালে সারা দেশে ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়, যা বাংলাদেশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

পাঁচ সিদ্ধান্ত অধিদপ্তরের : দেশে ডেঙ্গু পরীক্ষার ফি নির্ধারণ এবং বরগুনায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা কার্যক্রম ও ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় চিকিৎসক এবং অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকাল অধিদপ্তরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত, হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত পৃথক পৃথক চিঠিতে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পরীক্ষার মূল্য নির্ধারণ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ডেঙ্গু পরীক্ষার মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। সে হিসেবে ডেঙ্গুর এনএসআই পরীক্ষা এবং আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষা ৩০০ টাকা করে এবং সিবিসি ৪০০ টাকা। অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা যাবে না। এর ব্যত্যয় হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে অধিদপ্তর।

একইভাবে সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার নির্ধারিত মূল্যের সময় আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সে পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে এনএসআই, আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষা ৫০ টাকা করে করা যাবে।

বরগুনায় চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্স : বরগুনায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ও ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় বরগুনা সদর হাসপাতালে চালকসহ দুটি অ্যাম্বুলেন্স দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

একইভাবে বরগুনা জেলা হাসপাতালে চারজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাঠানোরও উদ্যোগ নিয়েছে অধিদপ্তর। বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এই চিকিৎসক পাঠানো হবে। তারা বরগুনা জেলা হাসপাতালের ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ও চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেবেন।

অধিদপ্তর জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বরগুনায় ডেঙ্গু বেড়েছে। বরগুনা জেলা হাসপাতালে শয্যা সংখ্যার দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকছে।

জেলায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে অধিদপ্তর। গতকাল এ-সংক্রান্ত এক চিঠিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে বরগুনায় ডেঙ্গু সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যু বেড়ে গেছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের তথ্য পর্যালোচনা করে প্রতীয়মান হয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আক্রান্ত রোগী বিলম্বে হাসপাতালে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে।

এমতাবস্থায় এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ, ডেঙ্গু রোগীদের দ্রুত সময়ে হাসপাতালে যাওয়া ও চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের ব্যাপারে সচেতনতা তৈরির জন্য চিঠিতে ব্যাপক প্রচারণা চালানোর লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত