বীরের রক্তস্রোত, মায়ের অশ্রু যেন বৃথা না যায়

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৫, ০৭:২০ এএম

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘আমাদের সামনে যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, নতুন করে গণতন্ত্রের ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, তা আমাদের দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করতে হবে। যেকোনো মূল্যে বীরের এই রক্তস্রোত, মায়ের এই অশ্রুধারা যেন বৃথা না যায়। তা নিশ্চিত করতে হবে। ঐক্য বজায় রাখতে হবে।’

চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তিতে ৩৬ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন শুরু করেছে বিএনপি। গতকাল মঙ্গলবার সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে ‘গণঅভ্যুত্থান ২০২৪ : জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ শীর্ষক আলোচনা সভা এবং শহীদ পরিবারের সম্মানে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিএনপি। সেখানে খালেদা জিয়া ভিডিও বার্তায় এসব কথা বলেন।

খালেদা জিয়া বলেন, ‘রক্তস্নাত জুলাই এক বছর পর আমাদের মধ্যে ফিরে এসেছে। ১৬ বছর ফ্যাসিস্টদের নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতন, গ্রেপ্তার, হত্যা, খুনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে এবং একদলীয় শাসনব্যবস্থা চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিল আওয়ামী লীগ শাসকগোষ্ঠী। ছাত্র-জনতার সম্মিলিত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে। সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে নতুনভাবে বাংলাদেশ গড়ার। এই আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের জানাচ্ছি শ্রদ্ধা ও আহতদের সমবেদনা।’

বিএনপির প্রধান বলেন, ‘তাদের এই আত্মত্যাগ জাতি চিরকাল মনে রাখবে। গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা যারা হয়েছেন, তাদের তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি পরিবারের সম্মানজনক পুনর্বাসন ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে।’

অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবার, আহত নেতাকর্মী ও সমর্থকদের পাশাপাশি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ৬৩টি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, বুদ্ধিজীবী, সিনিয়র সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। শহীদ পরিবারকে অনুষ্ঠানে ক্রেস্ট ও সম্মাননা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে অভ্যুত্থানের ওপর একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের বিদ্যমান অবস্থায় ও ভৌগোলিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থা কতটা উপযোগী কিংবা উপযোগী কি না তা ভেবে দেখার অনুরোধ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থা ঐক্যের পরিবর্তে বিভক্তিমূলক সমাজ এবং অস্থিতিশীল সরকার সৃষ্টির কারণ হয়ে উঠতে পারে কি না তা সব রাজনৈতিক নেতাকে ভেবে দেখার অনুরোধ করব।’

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও ‘জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান, শোক এবং বিজয়ের বর্ষপূর্তি পালন কমিটির আহ্বায়ক রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এই কমিটির সদস্য সচিব ও বিএনপির গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান। বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, সালাহউদ্দিন আহমেদ, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান ও ১২-দলীয় জোটের প্রধান মোস্তফা জামাল হায়দার, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকী প্রমুখ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, পেশাজীবী ও বিশিষ্টজনের মধ্যে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, যুগান্তর সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার, সংগ্রাম সম্পাদক আযম মীর শাহীদুল আহসানসহ কয়েক হাজার নেতাকর্মী।

গুমের শিকার পারভেজের মেয়ের বক্তব্য শুনে কাঁদলেন তারেক রহমান : গুমের শিকার ছাত্রদল নেতা পারভেজের মেয়ে নিধি। কিশোরী মেয়েটি বাবাকে দেখে না অনেক বছর। অনুষ্ঠানে তার বক্তব্য শুনে কেঁদেছেন তারেক রহমান। জায়ান্ট স্ক্রিনে তাকে দেখা গেছে চশমার ফাঁক দিয়ে বারবার চোখ মুছতে। নিধির রয়েছে ছোট্ট একটি ভাই। বাবাকে অনেক দিন দেখে না সে-ও। অনুষ্ঠানে নিধি তাই এই প্রশ্ন ছুড়ে দেয় ‘আমি আর আমার ভাই বাবাকে কি কোনো দিন জড়িয়ে ধরতে পারব না?’ এমন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাধ্য কার? অশ্রুসিক্ত হন তারেক রহমান। কষ্ট ভাগাভাগি করে নেন সেই কিশোরীর সঙ্গে।

সভায় সারা দেশ থেকে আসা নির্যাতিত ব্যক্তি ও তাদের স্বজনরা যন্ত্রণা এবং ভোগান্তির করুণ কাহিনি তুলে ধরেন। স্বজন হারানোর বেদনার সঙ্গে আর্থিক টানাপড়েন দিগবিদিক চিন্তা তাড়িয়ে বেড়ানোর কথাও জানান তারা।

গুম ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, ‘শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যারা গুমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের সবার বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’

আওয়ামী লীগের আমলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের হাতে নিহত বিশ্বজিৎ দাসের বাবা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার ছেলেকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে, এর বিচার এখনো হয়নি।’

বক্তব্য রাখতে গিয়ে বুয়েট ছাত্রলীগের হাতে নিহত শহীদ আবরার ফাহাদের বাবা বলেন, ‘আমার ছেলের হত্যার বিচার আমি এখনো পাইনি। কী অপরাধ ছিল আবরার ফাহাদের? সে দেশের পক্ষে কথা বলায় তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের হত্যাকাণ্ড আর না ঘটে।’

আন্দোলনের ঢাকায় প্রথম শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বোন বলেন, ‘আমার ভাই ২৮ জুলাই শহীদ হয়। সে ছিল ঢাকার প্রথম শহীদ। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আমরা যে বিজয় এনেছি, তা আমরা ধরে রাখতে পারছি কি না তা প্রশ্ন থেকে যায়। জুলাইয়ে দল-মত নির্বিশেষে প্রতিবাদ করেছিল, কিন্তু এক বছর পর আমার মনে হয়, সেই ঐক্য ধরে রাখতে পারছি না। এই বিপ্লবের ফলে আমাদের আশা ছিল নতুন কিছু দেখতে পাব। শহীদরা যে বৈষম্যবিরোধী দেশ চেয়েছিল, সেটা যেন আমরা দেখতে পাই।’

গণঅভ্যুত্থানে বুক পেতে পুলিশের গুলিতে শহীদ হওয়া আবু সাঈদের বড় ভাই বলেন, ‘আবু সাঈদ বুক পেতে দেশের সবার সাহস জুগিয়েছিল, তাই ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে শহীদ পরিবারের পাশে থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।’

শহীদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদের পরিবারের খোঁজ কেউ নেয়নি বলে অভিযোগ করে তার মা ফাতেমা তুজ জোহরা বলেন, ‘এনসিপি নেতা সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহকে বারবার ফোন করা হলেও তারা রিসিভ করেননি।’

এ ছাড়া গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া অনেক পরিবারের সদস্যরা এবং আহতরা অভিযোগ করে বলেন, তাদের আন্দোলনে নতুন বাংলাদেশ পেলেও পরিবারের পাশে অথবা তাদের চিকিৎসায় তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার এবং জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া সমন্বয়কদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে এ সময় শহীদদের পরিবারের সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলগীর বলেন, ‘আজ সংস্কারের যে কথাগুলো আসছে, সেসব কথা ২০১৬ সালে খালেদা জিয়া ভিশন ২০২৬-এ বলেছিলেন। আমরা তখন যেসব রাজনৈতিক দল একসঙ্গে আন্দোলন করেছিলাম, তারা সবাই মিলে ২০২২ সালে ২৭ দফা দিয়েছিলাম, যা পরে ৩১ দফায় রূপান্তর হয়। সুতরাং সংস্কারের কথা তো সবার আগে আমরাই বলেছিলাম।’

মির্জা আব্বাস বলেন, ‘বিএনপি আগামীতে ক্ষমতায় আসবে, এটি শুধু বিএনপি নয়, অনেকেই ভাবেন। সেজন্যই আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও আওয়ামী লীগের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কিন্তু ঐকমত্য কমিশনে একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করছে, যাতে বিএনপি ক্ষমতায় না আসে। আমরাও বলিনি যে ক্ষমতায় যাব। তবে আমরা ১৭ বছর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। বিএনপিকে প্রতিপক্ষ ভাবার কোনো কারণ নেই। নির্বাচন করতে দেওয়া যাবে না বলে যা বলা হচ্ছে, সেটি তো অনৈক্যের জন্য। জাতিকে বিভক্ত রেখে দেশের উন্নয়ন ও মঙ্গল করা যায় না।’

সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জাতীয় ঐক্য একটি হবে। সেটি ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য। সেটি ধরে রাখতে হবে এবং সেটিই আমাদের শক্তি। পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক তৈরি হবে। স্বর্গ থেকেও প্রিয় মাতৃভূমি। গুম-খুনের শিকার ব্যক্তিদের অবদান ও রক্তের সম্মান আমাদের দিতে হবে। মতভেদ থাকবে কিন্তু সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমরা এগিয়ে যাব সেটিই প্রত্যাশা।’

জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে বিএনপি, জামায়াতসহ সবারই অবদান রয়েছে। এই দু-দলের নেতাকর্মীরা সবচেয়ে বেশি গুমের শিকার। আজকে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হলেও ফ্যাসিবাদ রয়ে গেছে। আমরা অতীতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব ২০ বছর আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। আগামীতেও থাকব, ইনশাআল্লাহ!’

মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘কোনো সংস্কার চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। গণতন্ত্র চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, আরও যাব।’

এর আগে বেলা ৩টায় বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিএনপির উদ্যোগে ‘গণঅভ্যুত্থান ২০২৪ : জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ শীর্ষক আলোচনা সভা এবং শহীদদের সম্মানে এই বিশেষ অনুষ্ঠান হয়। এ সময় ভার্চুয়ালি এই অনুষ্ঠানে যুক্ত হন তারেক রহমান। অনুষ্ঠানের শুরুতে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের ওপর নির্মিত ‘জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ শীর্ষক প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করে বিএনপি চেয়ারপারসনের আগে বক্তব্য দেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত