ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন প্রধান অগ্রাধিকার

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৫, ০৭:৩১ এএম

১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর ৪২ বছর পার করে ৪৩তম বছরের পথচলা শুরু করেছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি (ইউসিবিপিএলসি)। দীর্ঘ এ পথচলায় সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনীতির বিভিন্ন প্রেক্ষাপট মোকাবিলায় আজকের অবস্থায় এসেছে ইউসিবি। বর্তমানে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) দায়িত্বে আছেন মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ। সার্বিক বিষয়ে সম্প্রতি তিনি কথা বলেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার জুনায়েদ হোসাইন

দেশ রূপান্তর : ৪২ বছরের দীর্ঘ যাত্রায় পৌঁছে ইউসিবির এ মাইলফলকে পৌঁছানোয় আপনার অনুভূতি কী? এই পথচলায় কোন সাফল্যগুলো আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?

মামদুদুর রশীদ : ৪২ বছর একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য শুধু সময় নয়, এটি একটি উত্তরাধিকার। এ যাত্রা আমাদের জন্য গর্ব, কৃতজ্ঞতা ও প্রতিজ্ঞার একটি মিলিত অনুভূতি। এই দীর্ঘ পথচলায় ইউসিবি শুধু একটি ব্যাংক হয়ে ওঠেনি, বরং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অংশীদার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো আমরা দেশের শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তৈরি করেছি, এসএমই ও কৃষি খাতে অর্থায়ন জোরদার করেছি এবং প্রযুক্তি ব্যবস্থায় যুগান্তকারী অগ্রগতি এনেছি। এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই আমাদের চ্যালেঞ্জ ও অঙ্গীকার।

দেশ রূপান্তর : ইউসিবির এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমের বর্তমান অবস্থা কী? এ খাতে সম্প্রসারণ বা নতুন উদ্যোগ নিয়ে কী ভাবছেন?

মামদুদুর রশীদ : বর্তমানে ইউসিবির এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম দেশের প্রায় ৬৫০ পয়েন্টে ছড়িয়ে আছে, যা আমাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হয়েছে। আমাদের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বৈশিষ্ট্য হলো একজন গ্রাহক আউটলেটে এলে অনুভব করেন যে, তিনি একটি পরিপূর্ণ ব্যাংকের সঙ্গেই ব্যাংকিং করছেন। প্রতিটি আউটলেটের প্রতিটি লেনদেন রিয়াল টাইম প্রযুক্তিতে ব্যাংকের কেন্দ্রীয় সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত। এ ছাড়া অটোমেটেড এজেন্ট কমিশন প্রসেস আছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে আমরা এ খাতে আরও বিনিয়োগ করছি।

দেশ রূপান্তর : বর্তমান সুদহার কাঠামোতে আমানতকারীদের আস্থা এবং উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ উদ্যোগ দুটিই চ্যালেঞ্জের মুখে। আপনি এ পরিস্থিতি কীভাবে দেখছেন?

মামদুদুর রশীদ: সুদহার ব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষা করা এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে আমানতকারীরা চাইছেন ন্যায্য রিটার্ন, অন্যদিকে উদ্যোক্তারা অপেক্ষাকৃত কম সুদে অর্থায়ন আশা করছেন। আমরা চেষ্টা করছি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও অপারেশনাল কার্যকারিতা বাড়িয়ে ব্যয় কমাতে, যাতে দুটি পক্ষের জন্যই গ্রহণযোগ্য সমাধান সম্ভব হয়।

দেশ রূপান্তর : মন্দ ঋণের বর্তমান চিত্র কেমন? এর রিকভারি বা পুনরুদ্ধারে আপনারা কী ধরনের পরিকল্পনা ও কৌশল গ্রহণ করছেন?

মামদুদুর রশীদ : বর্তমানে আমাদের কিছু ঋণ সমস্যা রয়েছে, যা আমরা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে মোকাবিলা করছি। আমরা শক্তিশালী রিকভারি টিম গঠন করেছি, নিয়মিত মনিটরিং চালু করেছি এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনে, পাচার হওয়া অর্থ ও অমীমাংসিত ঋণ পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লিটিগেশন ফান্ডার নিয়োগের পরিকল্পনাও নিয়েছি, যারা পাচার হওয়া অর্থ ও অমীমাংসিত ঋণ অনুসন্ধান ও পুনরুদ্ধারে কাজ করবে। এর মাধ্যমে আমরা স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছি অবৈধ অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে আমরা দৃঢ় অবস্থান নেব এবং প্রয়োজনে বিদেশি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করতে পিছপা হব না।

দেশ রূপান্তর : ব্যাংক খাতে বিদ্যমান আস্থাহীনতা দূর করতে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে আপনি মনে করেন? ইউসিবি কী ভূমিকা রাখছে?

মামদুদুর রশীদ : আস্থা ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ। ইউসিবি এ তিনটি ক্ষেত্রেই সংস্কার কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ বিষয়ে ইউসিবি একটি আগাম ও সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করেছে, যার উদ্দেশ্য সম্পদের মানোন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি লাভজনকতা নিশ্চিত করা। এজন্য আমরা ঋণ পুনরুদ্ধারে জোর দিচ্ছি, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং ঋণঝুঁকি তদারকি ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া উন্নত করছি। একই সঙ্গে আমানত ভিত্তি বাড়াতে কাজ করছি, যার প্রমাণ সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার নিট আমানত বৃদ্ধি।

দেশ রূপান্তর : ভবিষ্যতে কী ধরনের নতুন পণ্য বা সেবা চালু করার পরিকল্পনা আছে?

মামদুদুর রশীদ : আমরা গ্রাহক চাহিদার বিবেচনায় বেশ কিছু নতুন পণ্য চালুর পরিকল্পনা করছি। এর মধ্যে রয়েছে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ডিজিটাল লোন সলিউশন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ প্যাকেজ এবং ছাত্র-যুবাদের জন্য ডিজিটাল সেভিংস অ্যাকাউন্ট। এ ছাড়া আমাদের অ্যাপে আরও উন্নত ফিচার যুক্ত করার মাধ্যমে সেবা সহজ ও দ্রুত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : ব্যাংকের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন এ তিনটি খাতে আপনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী?

মামদুদুর রশীদ : আমাদের লক্ষ্য হলো একটি ভবিষ্যৎমুখী, টেকসই ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংক তৈরি করা। আমরা ক্লাউডভিত্তিক ব্যাংকিং সিস্টেমে অগ্রসর হচ্ছি এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারের পরিকল্পনা করছি। মানবসম্পদের দিক থেকেও আমরা একটি ‘লিডারশিপ পাইপলাইন’ গড়ে তোলার কাজ করছি, যেখানে প্রতিটি স্তরে দক্ষতা ও নেতৃত্বের বিকাশ সম্ভব হবে।

দেশ রূপান্তর : প্রযুক্তির বিকাশ ও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসারে ইউসিবি কীভাবে নিজেদের প্রস্তুত করছে? ফিনটেক সহযোগিতায় কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

মামদুদুর রশীদ : ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন আমাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। আমরা সম্প্রতি মাইক্রোসার্ভিস-ভিত্তিক ওপেন এপিআইভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করেছি। বাংলাদেশে আমাদের ব্যাংকই প্রথম এবং বিশ্বের মধ্যে ষষ্ঠ বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ নতুন ভার্সন ব্যবহার শুরু করেছে। এর ফলে একসঙ্গে আরও বেশিসংখ্যক গ্রাহককে আধুনিক, সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।  ইতিমধ্যে একাধিক ফিনটেক স্টার্টআপের সঙ্গে পার্টনারশিপে যাচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য হলো গ্রাহকের জন্য স্বয়ংক্রিয়, ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং দ্রুতগতির ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করা। আমাদের মোবাইল অ্যাপ আরও স্মার্ট করা, চ্যাটবট ও এআই সাপোর্ট যুক্ত করা এবং রিমোট অ্যাকাউন্ট খোলা এসবই আমাদের চলমান পরিকল্পনার অংশ।

দেশ রূপান্তর : সামাজিক দায়বদ্ধতা ও টেকসই ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে ইউসিবির নীতিমালা ও অগ্রাধিকার কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে?

মামদুদুর রশীদ : আমরা বিশ্বাস করি, একটি ব্যাংকের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় তার সামাজিক প্রভাবের মাধ্যমে। ইউসিবি সবসময় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী ক্ষমতায়ন ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগ করে আসছে। ৪২ বছরের পথচলায় আমরা শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সীমায় আবদ্ধ না থেকে সমাজের প্রকৃত উন্নয়নেই বিশ্বাস রেখেছি। তারই এক উজ্জ্বল প্রমাণ ‘ভরসার নতুন জানালা’ একটি সময়োপযোগী করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা উদ্যোগ, যা দেশের কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

এই প্রকল্পের আওতায় ইউসিবি ইতিমধ্যে ৬৩টি জেলায় প্রায় ১১ হাজার কৃষি উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। দেশের ৫০টি নির্বাচিত মডেল উপজেলার তিন হাজার কৃষি উদ্যোক্তাকে কারিগরি প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিতরণ করা হয়েছে আধুনিক কৃষি উপকরণ, স্মার্ট ডিভাইস, বজ্রনিরোধক যন্ত্র ও পরিবেশবান্ধব কৃষিযন্ত্র। ‘আরও মাছ’ নামক একটি এআইভিত্তিক ডিভাইস মাছচাষিদের উৎপাদন ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া ৬৫ হাজার গাছ রোপণের মতো পরিবেশগত উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় পরিচালিত এ প্রকল্প গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর, জলবায়ু সহনশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি আর্থিক ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তুলছে। ভবিষ্যতে ‘গ্রিন ফাইন্যান্স’ ও ‘ইনক্লুসিভ ব্যাংকিং’ আমাদের মূল লক্ষ্য হবে।

দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মামদুদুর রশীদ : দেশ রূপান্তরের পাঠক ও সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত