যুক্তরাষ্ট্র থেকে রপ্তানি হওয়া বিভিন্ন পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশে কী হারে ট্যারিফ বসবে তার একটি প্রস্তাবনা তৈরি করেছে ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ (ইউএসটিআর) দপ্তর। এই প্রস্তাবনাটি এখনো বাংলাদেশ পায়নি, যে কারণে বাংলাদেশ ৯ তারিখের সভার জন্য পুরো প্রস্তুতি নিতে পারেনি। ফলে বাণিজ্য সচিব মো. মাহবুবুর রহমানের গতকাল যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে গেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, যুক্তরাষ্ট্র কোথায় কতটুকু ছাড় চাচ্ছে তা এখনো অজানা। এটা ইউএসটিআরের ট্যারিফ শিডিউল থেকে জানা যাবে। যা বাংলাদেশকে দেওয়ার কথা থাকলেও এখনো দেওয়া হয়নি। এটা পেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশের বিভিন্ন পক্ষগুলোকে নিয়ে দ্রুত বৈঠক করে একটা সিদ্ধান্ত নেবে। সে অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৯ তারিখের আলোচনার টেবিলে দেন দরবার করতে চায়।
এদিকে আগামী ৯ জুলাই থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক কার্যকরের কথা থাকলেও তা পয়লা আগস্ট থেকে কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগির কয়েকটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে। আগামী ৯ জুলাইয়ে এ নিয়ে আলোচনায় বসবে বাংলাদেশও। এর মধ্যে কয়েকটি দেশকে নতুন শুল্কহার জানিয়ে দেওয়া হবে। এই আলোচনার জন্য বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন যুক্তরাষ্ট্রে থাকলেও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া পিছিয়ে গেছে।
গতকাল সোমবার বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজ (গতকাল সোমবার) আমার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল। তবে গত ৩ তারিখের মিটিংয়ে তাদের সিদ্ধান্তের এনেক্সার (যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ট্যারিফ শিডিউল) এখনো দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ এখন তারা পাল্টা কী সুবিধা চায় তার কোনো ব্যাখ্যা নেই আমাদের কাছে। ‘তিনি বলেন, চুক্তির ওয়ার্কিং ডকুমেন্ট হলো এনেক্সার। তারা কী চাচ্ছে সেটা জেনে আমরা দ্রুত একটা সিদ্ধান্ত নেব। এনেক্সার পাঠালে তখন আমরা একদিন-দুদিনের মধ্যে পজিশন ঠিক করে ওদের সঙ্গে আবারও বৈঠকের চেষ্টা করব। তারা ওই সময় বলেছিল, ৮-৯ তারিখের আগে এনেক্সার পাঠাবে। ৯ তারিখ পূর্ব নির্ধারিত বৈঠক প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব বলেন, আগামী ৯ তারিখের মিটিংয়ে উপদেষ্টা থাকছেন। আমরা অনলাইনে যুক্ত থাকব।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে শূন্য শুল্ক দিয়ে ভিয়েতনাম এক ধাক্কায় পারস্পরিক শুল্ক (পাল্টা শুল্ক) ৪৬ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। বাংলাদেশের ওয়াশিংটনের চাহিদা অনুযায়ী মার্কিন পণ্য আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার কথা ভাবছে। ইতিমধ্যেই ১০০ পণ্যে শুল্ক মুক্ত সুবিধা দেওয়ার একটা আলোচনা চলমান। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা পূরণে মার্কিন পণ্যে শূন্য-শুল্ক সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে ঢাকা।
তবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে শুল্ক চুক্তি করতে চায় সেটা যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী না করে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধি-বিধানের আওতায় করতে চায়। এই আগ্রহের কথা ইতিমধ্যেই ইউএসটিআরকে জানিয়েছে ঢাকা।
এর আগে বাণিজ্য সচিব বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে ট্যারিফ ছাড় দেওয়ার বিষয়ে আমাদের তেমন কোনো আপত্তি নেই। সরকারিভাবে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ, এলএনজি, গমসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের এমন অবস্থান সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির এনেক্সার ডকুমেন্ট পাঠায়নি। দ্রুত ইউএসটিআরের পক্ষ থেকে এ নথি পাওয়ার প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ।
গত ২ এপ্রিল বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ পারস্পরিক শুল্কসহ বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যূনতম ৯ শতাংশ বাড়তি শুল্ক বাস্তবায়ন করে অবশিষ্ট শুল্ক তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন, যার মেয়াদ ৯ জুলাই শেষ হওয়ার কথা ছিল। এই কার্যকরের সময় আবারও আগমী ১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
এই সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করে নিজেদের ওপর আরোপিত শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশও এই ধারাবাহিকায় কাজ করছে। বাণিজ্য উপদেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে এই চুক্তির বিষয়ে ইউএসটিআরসহ যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে জানা গেছে।
এরমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের ওপর আরোপিত পারস্পরিক শুল্ক ৪৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক তুলে নেওয়ার পর ভিয়েতনামের শুল্ক কমাচ্ছে ওয়াশিংটন। যে কারণে পোশাক শিল্পের বাংলাদেশি এ প্রতিদ্বন্দ্বীর সুবিধা আরও চাপ তৈরি করেছে।
তবে গত ৩ জুলাই রাতে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। আগামী ৯ জুলাই ওয়াশিংটনে পরবর্তী বৈঠক হবে। ইউএসটিআরের ওই বৈঠকে সশরীরে অংশ নিতে চেয়েছিলেন বাণিজ্য সচিবও। কিন্তু সোমবার বিকেল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে চুক্তির এনেক্সার ডকুমেন্ট পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, এনেক্সার পাওয়ার পর টেকনিক্যাল কমিটির সঙ্গে মিটিং করে বাংলাদেশের অবস্থান চূড়ান্ত করার পর আমিও যুক্তরাষ্ট্রে যাব।
