ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৫ সালের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে প্রার্থীদের বয়সসীমা বাতিল করা হয়েছে। তবে শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, প্রার্থীদের অবশ্যই স্নাতক, মাস্টার্স বা এমফিল পর্যায়ে অধ্যয়নরত হতে হবে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ‘অছাত্র’ (মাস্টার্স শেষ) এমন শিক্ষার্থীরা ডাকসুর ভোটার কিংবা প্রার্থী হতে পারবেন না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুসারে, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের অনেকে ইতিমধ্যে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। আবার কিছু বিভাগে এখনো মাস্টার্স চলমান রয়েছে। তাই এই ব্যাচের অধিকাংশ শিক্ষার্থী ভোটার হতে পারবেন না। কিন্তু এই ব্যাচ থেকেই উঠে এসেছে ছাত্র রাজনীতির একাংশের শক্তিশালী নেতৃত্ব। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ছাড়াও ক্যাম্পাসের অনেক প্রভাবশালী নেতৃত্ব রয়েছে এই ব্যাচ থেকেই। ফলে তারা ভোটার কিংবা প্রার্থী হতে চাইলে তাদের এমফিলে ভর্তি হতে হবে। ব্যাচটিতে ৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাদের ভোটাধিকার ও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ রাখা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনও তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছিল।
তবে সে আশায় জল ঢেলে দিয়েছেন ডাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন। তিনি জানিয়েছেন, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের অছাত্র কোনো শিক্ষার্থী ডাকসুর ভোটার বা প্রার্থী হতে পারবে না। সে হিসেবে ডাকসু নির্বাচনে প্রার্থী বা ভোটার হতে পারবে না প্রায় ৭ হাজার শিক্ষার্থী। তবে যাদের এখনো স্নাতকোত্তরের ফল প্রকাশিত হয়নি বা স্নাতকোত্তর শেষ করে এমফিল-এ যারা ভর্তি হবে তারা ভোটার বলে গণ্য হবে এবং প্রার্থীও হতে পারবে।
২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব জাহিদ আহসান, ঢাবি আহ্বায়ক আব্দুল কাদের, মুখ্য সংগঠক তাহমিদ আল মুদ্দাসিসর চৌধুরী, কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক মিতু আক্তার, ছাত্রশিবিরের ঢাবি সেক্রেটারি মহিউদ্দিন খান, সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী আশিক, অফিস সম্পাদক মো. ইমদান হোসাইনসহ অন্তত ১০ নেতা। এ ছাড়া ছাত্রদলের কবি জসীমউদ্দীন হলের প্রচার সম্পাদক তানভীর বারী হামিম, সূর্যসেন হলের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক আবিদুর রহমান মিশু, বিজয় একাত্তর হলের প্রচার সম্পাদক তানভীর আল হাদী মায়েদসহ অনেক নেতা এবং স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্রসংসদের আহ্বায়ক জামালুদ্দীন মুহাম্মাদ খালিদসহ আরও বেশ কয়েকজন। তারা সবাই ডাকসুর গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য লড়বেন বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ছাত্রসংগঠনগুলো। ফলে তাদের ছাত্রত্ব অতি সম্প্রতি শেষ হওয়ায় তাদের এমফিলে ভর্তি হতে হবে। অন্যথায় তারা ডাকসু নির্বাচন করতে পারবেন না।
প্রশাসন সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন পর ডাকসু নির্বাচন হতে যাচ্ছে। কোনো বিতর্ক বা মামলার জটে যেন পড়তে না হয় সেজন্য সতর্ক রয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের ভাষ্যমতে, বর্তমানে কার্যকর ভোটার সংজ্ঞা অনুযায়ী মাস্টার্স শেষ করা শিক্ষার্থীরা ভোটার হিসেবে বিবেচিত হবেন না। তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন সংশোধন করতে হবে যা একটি জটিল প্রক্রিয়া।
তা ছাড়া, আইন শিথিল করে ২০১৮-১৯ ব্যাচকে ভোটার রাখতে চাইলে নির্বাচনের পরে আইনগত বিপত্তি ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ব্যাচের ভোটাধিকারের আইনগত ভিত্তি নেই মর্মে কেউ হাইকোর্টে রিট করলে বাতিল হয়ে যেতে পারে ডাকসু নির্বাচন। ফলে আইন সংশোধন ছাড়া তাদের ভোটার হিসেবে রাখার কোনো সুযোগ থাকছে না।
এদিকে হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের তথ্য হালনাগাদের মাধ্যমে ভোটার তালিকা প্রস্তুত করছে নির্বাচন কমিশন। অন্যদিকে, এমফিলে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে কমপক্ষে ১-৩ মাস লেগে যায়। কিন্তু ভোটার তালিকা হালনাগাদের শেষ সময় চলতি মাসের ১৫ তারিখ হওয়ায় তাদের নির্বাচনে পদপ্রার্থী হওয়ার পথে বেশ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে তাদের এমফিলে ভর্তির আবেদন পত্র দিয়েই ডাকসুর ভোটার তালিকায় নাম উঠাতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা জানান, তারা ডাকসু নির্বাচন করতে চান। কিন্তু হুট করে এতদিন পর এসে জানানো হলো তারা ভোটার হতে পারবেন না, ডাকসুতে প্রার্থী হতে পারবেন না। এমফিলে ভর্তি প্রক্রিয়া বেশ দীর্ঘস্থায়ী। তাই অনেকে ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলেও ভর্তি কার্যক্রম শেষ না করায় বাদ পড়তে পারেন। এমফিলে আবেদনপত্রের মাধ্যমে ১৮-১৯ থেকে ওপরের শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের ডাকসুর ভোটার হতে প্রদত্ত আবেদন গ্রহণ করতে দেওয়া উচিত বলে মত দেন কয়েকজন ছাত্রনেতা।
গঠনতন্ত্র মতে, ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ভোটার এবং প্রার্থী হতে হলে শিক্ষার্থীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণকালীন শিক্ষার্থী হতে হবে, যিনি ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে স্নাতক প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে বর্তমানে স্নাতক, মাস্টার্স বা এমফিল প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত এবং কোনো আবাসিক হলে অবস্থানরত বা সংযুক্ত আছেন। অন্যদিকে, সান্ধ্যকালীন কোর্স, পেশাদার বা এক্সিকিউটিভ মাস্টার্স, ডিপ্লোমা, সার্টিফিকেট ও ভাষা কোর্সে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ও সংযুক্ত কলেজ/ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা ভোটার বা প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাবেন না।
সার্বিক বিষয়ে ডাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা আইনজ্ঞদের সঙ্গে বসেছি। তারা জানিয়েছে, গঠনতন্ত্রের বাইরে এসে বিশেষ বিবেচনায় কাউকে সুযোগ দিলে পরবর্তীতে কেউ রিট করলে নির্বাচনই বাতিল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই, আমরা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি যাদের ছাত্রত্ব আছে শুধু তারাই নির্বাচন করতে পারবে।
