১৬ জুন কী ঘটেছিল ইরানে?

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৫, ১০:১৮ এএম

তেহরানে অনুষ্ঠিত ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (এসএনএসসি) এক বৈঠকে ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। তবে ইরান ইন্টারন্যাশনালের অনুসন্ধানে ওই ঘটনার বিবরণ নিয়ে একাধিক অসামঞ্জস্য ও প্রশ্ন উঠে এসেছে।

ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি)-ঘনিষ্ঠ বার্তা সংস্থা ‘ফারস’ গতকাল রবিবার জানায়, ১৬ জুন (সোমবার) সকালে পশ্চিম তেহরানের একটি ভবনের ভূগর্ভস্থ কক্ষে এসএনএসসির এক বৈঠকে ছয়টি বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বৈঠকে ইরানের নির্বাহী, বিচার বিভাগ ও আইনসভার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন এবং প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানসহ কয়েকজন নেতা পালানোর সময় সামান্য আহত হন।

এ প্রসঙ্গে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানালেও, ফারসের প্রকাশিত প্রতিবেদনের বেশ কয়েকটি অংশ যাচাই করে দ্ব্যর্থ তৈরি করেছে ইরান ইন্টারন্যাশনাল।

বিস্ফোরণের সময় ও স্থান নিয়ে বিতর্ক

ইরান ইন্টারন্যাশনাল ১৬ জুন তেহরানে বিস্ফোরণের যেসব ভিডিও বা প্রতিবেদন মিলেছে, সেগুলোতে সকালে একাধিক বিস্ফোরণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং বিকেল ও সন্ধ্যায় শহরের পশ্চিমাংশে বিস্ফোরণের একাধিক দৃশ্য পাওয়া গেছে।

২৪ জুন ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার উপপ্রধান বাহিদ জলিলি বলেন, ১৬ জুন আইআরআইবিতে হামলার এক ঘণ্টা আগে তিন শাখার প্রধানদের বৈঠকে হামলা চালানো হয়েছিল। অলৌকিকভাবে তাঁরা বেঁচে যান।

উল্লেখ্য, ওইদিন সন্ধ্যা ৬টা ৩৪ মিনিটে তেহরানের আইআরআইবির কাচের ভবনে হামলা হয়।

ইরান ইন্টারন্যাশনাল ধারণা করে, ফারস নিউজ হয়তো হামলার সময় ভুলভাবে উল্লেখ করেছে। পরে ওইদিন বিকেলে শহরের পশ্চিমাংশে আরও কয়েকটি বিস্ফোরণের ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শাহিদ বাঘেরি টাউনের আশপাশে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিস্ফোরণ ঘটে। ১৬ জুনের বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে বাঘেরি টাউনের পাশের পাহাড়ে অন্তত সাতটি বোমা পড়েছে বলে সামাজিক মাধ্যমে একজন ব্যবহারকারী ছবি ও পোস্ট দেন।

স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও স্যাটেলাইট চিত্রের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ইরান ইন্টারন্যাশনালের বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্য ছিল চিতগার এলাকায় অবস্থিত আইআরজিসির একটি ঘাঁটি ‘দোকুহে হল’।

লক্ষ্যবস্তু কারা?

ইরানের তিন শাখার প্রধান—রাষ্ট্রপতি, সংসদ স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির বৈঠক সাধারণত রুটিন কার্যক্রম হিসেবেই অনুষ্ঠিত হয়। তবে ১৬ জুনের বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গোয়েন্দামন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান, বাজেট প্রধান, সেনাপ্রধান, আইআরজিসি কমান্ডার এবং সুপ্রিম লিডার আলি খামেনেইয়ের দুই প্রতিনিধি সাঈদ জলিলি ও আলি আকবর আহমাদিয়ান। অর্থাৎ, বৈঠকটি ছিল সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক।

২৮ জুন সুপ্রিম লিডারের উপদেষ্টা আলি লারিজানি প্রথম জানান, তারা তিন শাখার প্রধানদের বৈঠকের তথ্য পেয়ে বোমা হামলা চালিয়ে সবাইকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল গোটা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব শেষ করে এরপর সুপ্রিম লিডারকে হত্যা ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ভেঙে দেওয়া।

৯ জুলাই সাবেক আইআরজিসি প্রধান মহসেন রেজায়িও বলেন, তারা সুপ্রিম লিডারকে টার্গেট করতে পারেনি। তবে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে হামলা চালায়। ছয়টি স্থানে আঘাত হানে, কিন্তু কাউকে আহত করা সম্ভব হয়নি।

পেজেশকিয়ান কি ছিল মূল লক্ষ্য?

এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য না থাকলেও, ইসরায়েলের নিউজ আউটলেট ‘ওয়াইনেট’-এর বরাতে গোয়েন্দা বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ জানান, পেজেশকিয়ান সংস্কারপন্থী হওয়ায় তাঁকে মূল লক্ষ্য হিসেবে ধরার সম্ভাবনা কম। তবে তিনি যেহেতু বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি, তাই তাঁর নেতৃত্বাধীন বৈঠককে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে।

হামলার পরদিন ইরান ইন্টারন্যাশনাল এক অপ্রকাশিত তথ্যসূত্রে জানতে পারে, সুপ্রিম লিডার আলি খামেনেই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তে তাঁর একটি বড় ক্ষমতা ‘সুপ্রিম গার্ড কাউন্সিল’-এর হাতে হস্তান্তর করেন।

নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প কী বলেছিলেন?

১৬ জুন সন্ধ্যা ৭টায় এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেন, “খামেনেইকে লক্ষ্য করাও সম্ভাবনার বাইরে নয়।” তিনি বলেন, “এই ধরনের একটি আঘাত সংঘাত বাড়াবে না, বরং শেষ করে দেবে।”

এদিকে কানাডায় জি-৭ সম্মেলনে অংশ নিতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই দিন হঠাৎ সম্মেলন শেষ না করেই দেশে ফিরে যান। ‘পলিটিকো’ জানায়, ইরান-ইসরায়েল সংঘাত ঘনীভূত হওয়ায় ট্রাম্প দ্রুত ফিরে গেছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বলেছিলেন, ট্রাম্প ফিরে গেছেন যুদ্ধবিরতির চেষ্টায়। তবে পরদিন ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশাল’-এ বলেন, “ভুল! তার কোনো ধারণা নেই আমি কেন ফিরেছি। যুদ্ধবিরতির জন্য নয়, এর চেয়ে অনেক বড় কিছু।”

ইরানে অভ্যন্তরীণ চরের সন্ধানে তদন্ত

১৩ জুলাই আল জাজিরার খবরে জানানো হয়, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানকে হত্যাচেষ্টা নিয়ে ইরান একটি বৃহৎ তদন্ত শুরু করেছে। এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেন, “রাষ্ট্রপতির ওপর হামলার জবাব ইসরায়েলকে দিতেই হবে—তাদের খেসারত দিতে হবে।”

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “যুদ্ধকালীন সময়ে ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে রাষ্ট্রপতি ও তিন বিভাগের প্রধানদের হত্যা করতে চেয়েছিল। এটা ছিল ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উল্টে দেওয়ার ইসরায়েলি পরিকল্পনার অংশ।”

১৬ জুন ইরানে ঘটে যাওয়া এই হামলা দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের নিরাপত্তা ঘিরে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। ঘটনার সময় ও লক্ষ্য নিয়ে সরকারি ভাষ্য ও স্বতন্ত্র তদন্তে পার্থক্য থাকায় অনেকেই সন্দেহ করছেন—ঘটনাটি শুধুই বাহ্যিক হামলা নয়, বরং এর পেছনে থাকতে পারে ভেতরের কেউ। হামলার উদ্দেশ্য, কৌশল এবং তাৎপর্য নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো ব্যাখ্যা না মিললেও এটুকু নিশ্চিত—ইরান পরিস্থিতিকে চরমভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং সম্ভাব্য জবাবের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত