আধুনিক সমাজে মনুষ্যত্বের অবক্ষয়

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৫, ০৮:১৪ এএম

বর্তমান পৃথিবীতে মানুষ নামধারী অনেকেই মনুষ্যত্ব হারিয়ে এক পশুত্বপূর্ণ জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। বাহ্যিকভাবে হয়তো তারা উন্নত, শিক্ষিত এবং আধুনিক জীবনব্যবস্থার অধিকারী, কিন্তু নৈতিকতা, সহমর্মিতা, মানবিকতা ও আত্মিক উৎকর্ষের জায়গায় তাদের অবস্থান শূন্য। এমন পতনের পেছনে রয়েছে গভীর বিপর্যয় ও নৈতিকতার অবক্ষয়। এ ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থায় চরিত্র গঠনের অনুপস্থিতি, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, বিভিন্ন শ্রেণির ভোগবাদী প্রভাব এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বহীনতা মিলেই এক পশুত্বময় সমাজ বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই মানুষ হিসেবে বেঁচে আছি? নাকি শুধু খাওয়া, ঘুমানো আর আরাম-আয়েশের জন্য বেঁচে থেকে ধীরে ধীরে পশু হয়ে উঠছি? আমাদের মনুষ্যত্ব আজ কোথায়? কীভাবে মানুষ তার মনুষ্যত্ব হারিয়ে পশুত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে সেই বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণী উল্লেখ করা হলো।

মানুষের গঠন-গড়ন অনেক ক্ষেত্রে পশুর সঙ্গে মিলে গেলেও তাৎপর্যের দিক থেকে সে কিন্তু এক অসাধারণ সৃষ্টি। তার আছে বিবেক, বোধশক্তি, ন্যায়-অন্যায় বাছাইয়ের ক্ষমতা এবং আছে আত্মিক উচ্চতায় ওঠার উপযোগিতা। মহান আল্লাহ তাকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা মর্যাদা দিয়েছেন। কিন্তু এই মর্যাদা তখনই টিকে থাকে, যখন মানুষ তার মনুষ্যত্ব রক্ষা করে চলে। মনুষ্যত্ব হারিয়ে গেলে গড়নে মানুষ থাকলেও বাস্তবে সে পশুর চেয়েও অধমে পরিণত হয়। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে বোঝে না। তাদের চোখ আছে, কিন্তু তা দিয়ে দেখে না। তাদের কান আছে, কিন্তু তা দিয়ে শোনে না। তারা পশুর মতো, বরং তারা আরও পথভ্রষ্ট। তারাই গাফেল।’ (সুরা আরাফ ১৭৯)

এই আয়াত নিছক আধ্যাত্মিক কোনো ব্যাখ্যার খোরাক নয়, বরং এটি এক কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যা আজকের তথাকথিত ‘সভ্য সমাজ’ প্রতিনিয়ত প্রদর্শন করে চলছে। আমরা এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে বাহ্যিক উন্নতির শীর্ষে পৌঁছেও নৈতিকতাকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছি। উন্নত প্রযুক্তি, গাড়ি-বাড়ি, কাঁড়ি কাঁড়ি রসদপত্র, শিক্ষার ডিগ্রি সবই আছে, কিন্তু অন্তরের ভেতরটা যেন গহিন এক অন্ধকার হয়ে পড়ে আছে। আমরা এখন গর্ব করি মুক্তচিন্তা, বাকস্বাধীনতা ও সভ্যতার, কিন্তু এই গর্বের পেছনে যে পশুত্ব ছায়ার মতো লেগে আছে, তা দেখতেই চাই না। এই সমাজে মানুষ নামধারীরা সভ্যতার মুখোশ পরে দিন-রাত অশ্লীলতা ছড়িয়ে যাচ্ছে। ভোগের নামে অনৈতিক বিনোদনে লিপ্ত হচ্ছে। পশুরাও তো এমন করে না। এদের ব্যাপারে কোরআনের সতর্কবাণী স্পষ্ট, ‘যারা চায় মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়াতে, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা নুর ১৯)

শুধু অশ্লীলতা নয়, সমাজের পরতে পরতে পশুত্বের রূপ দেখা যায় আরও নান কিছুতে। শিক্ষিত মানুষেরা আজ চারিত্রিক দিক থেকে যতটা নিচে নামতে পারে, অশিক্ষিত পশুরাও ততটা নামতে পারে না। প্রতারণা, মিথ্যাচার, লোভ, হিংসা এসবই আজ চালাকির চিহ্ন হয়ে উঠেছে। অথচ সবই নিকৃষ্ট চরিত্র। শিক্ষা যেন কেবল পরীক্ষার খাতায় পাস করার মেশিন তৈরি করছে। মানুষ গড়ার ভূমিকায় নেই। ছাত্রের কাছে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, ক্লাস টিচার পর্যন্ত পাপ্য সম্মানটুকু পাচ্ছেন না।

দুর্নীতি, মিথ্যাচার আর স্বার্থপরতা যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। একদিকে সমাজে কুকুর, বিড়ালের জন্য হোটেল বানানো হচ্ছে, আর অন্যদিকে মানুষ খেতে না পেয়ে আত্মহত্যা করছে। একদিকে বিলাসী শহরে খাবার পচে ডাস্টবিনে যাচ্ছে, অন্যদিকে বস্তির শিশুরা রাতে না খেয়ে ঘুমাচ্ছে! এভাবেই মানবতার বিপর্যস্ত ছবি প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।’ (সহিহ বুখারি ৬০৩৫) কিন্তু আজ এই উত্তম চরিত্র খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সমাজে এখন ভালো মানুষকে দুর্বল, সরলকে বোকা আর ইমানদারকে গোঁড়া ভাবা হয়। পর্দানশিন নারীকে বিদ্রুপ করা হয়। আর অর্ধনগ্ন, নির্লজ্জ নারীকে উৎসাহ দেওয়া হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল সমাজের অসুস্থতা নয়, এটি একটি নৈতিক মহামারী ও বিপর্যয়ও।

অবস্থা আজ এমন হয়েছে যেন আমরা বেঁচে আছি খাওয়ার জন্য, ঘুমানোর জন্য, বাচ্চা জন্ম দেওয়ার জন্য, ভোগের জন্য। একে কি জীবন বলা যায়? এ তো পশুর জীবন। গড়নে মানুষ, কিন্তু অভ্যাসে পশু। এটা কি সেই সমাজ, যে সমাজ কোরআনের আলোয় গড়ে ওঠার কথা ছিল? কোরআন বলে, ‘আমি জিন ও মানুষকে শুধু আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা জারিয়াত ৫৬) কিন্তু আমরা সেই মহান উদ্দেশ্য ভুলে গেছি। আমরা এখন নিজের প্রবৃত্তির দাসে পরিণত হয়েছি। নিজের খেয়াল-খুশিকে মাবুদ বানিয়ে ফেলেছি, যেভাবে কোরআন সতর্ক করেছে, ‘তুমি কি তাকে দেখেছ, যে তার খেয়াল-খুশিকে নিজের মাবুদ বানিয়ে নিয়েছে?’ (সুরা জাসিয়া ২৩)

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখনই কোনো জাতি পশুত্বে ডুবে গেছে, তখনই তার পতন ঘটেছে। লুত (আ.)-এর কওম ব্যভিচারের কারণে ধ্বংস হয়েছে, আদ-সামুদ অহংকার ও অবাধ্যতার কারণে নিপাত গিয়েছে। ফেরাউন ঔদ্ধত্যের কারণে জাঁকজমকসহ সাগরে ডুবে গেছে। নমরুদ মশার আঘাতে প্রাণ হারিয়েছে। আজকের পৃথিবীও সেই পথেই হাঁটছে। সুতরাং মনুষ্যত্বের অবক্ষয় রোধ করতে এখনই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত