মানুষ খুন করা তার নেশায় পরিণত হয়েছে। ঠান্ডা মাথায় গুলি করে কেড়ে নিচ্ছেন একের পর এক তরতাজা প্রাণ। খুন করে দলবল নিয়ে উল্লাস করে পালিয়ে যান পাহাড়ি আস্তানায়। তার নাম শুনলেই আতঙ্ক জাগে মানুষের মনে। কথায় কথায় ছোড়েন গুলি। নাম তার মো. রায়হান (৩৫)। গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজানে। হয়ে উঠেছেন ভয়ংকর খুনি। তার বিরুদ্ধে ব্রাশ ফায়ার করে জোড়া খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৪টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে সাতটিই হত্যা মামলা। তবে তাকে এখনো গ্রেপ্তার না করতে পারায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন একাধিক ভুক্তভোগী পরিবার।
পুলিশের ভাষ্য, চট্টগ্রামে ‘সিরিয়াল কিলার’ হয়ে ওঠা এই রায়হান একসময় ছিলেন চোলাই মদ বিক্রেতা। হত্যাচেষ্টার মামলায় কারাগারে গিয়ে তার সঙ্গে পরিচয় হয় আরেক দুর্ধর্ষ ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে। গত বছরের আগস্টে দুজনই চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে বের হন। জামিনে বেরিয়ে নগর ও জেলার রাউজানে ঘটাতে থাকেন একের পর এক হত্যাকা-। রায়হান খুন করতে ব্যবহার করেন অত্যাধুনিক শটগান ও বিদেশি পিস্তল।
গত ৬ জুলাই রাউজানের কদলপুর ইউনিয়নের ইশান ভট্টের হাটে বোরকা পরে এসে যুবদল নেতা মোহাম্মদ সেলিমকে গুলি করে পালিয়ে যাওয়ার ভিডিও ভাইরাল হলে আলোচনায় উঠে আসে রায়হানের নাম। পুলিশ জানায়, রাউজানের পাহাড়ি এলাকায় রায়হানের আস্তানা। দলবল নিয়ে এসে মানুষ খুন করে দ্রুত চলে যান আস্তানায়। গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, গত ১৬ মার্চ শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ ফের কারাবন্দি হলে তার অস্ত্রভা-ার হেফাজতে নেন রায়হান।
সাজ্জাদের আছে পাঁচ সহযোগী। তারা হলেন রায়হান, মোবারক হোসেন ওরফে ইমন, বোরহান, খোরশেদ ও হাছান। খোরশেদ ও হাছান ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হলেও অধরা রয়ে গেছে ‘সিরিয়াল কিলার’ হয়ে ওঠা রায়হান। এ ছাড়া আত্মগোপনে আছেন সন্ত্রাসী ইমন ও বোরহান। ভুক্তভোগীদের অভিমত, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানকে গ্রেপ্তার করা গেলে চট্টগ্রামে বিশেষ করে রাউজানে কমবে খুনোখুনি। গুলি করে একের পর এক মানুষের দেহ ঝাঁঝরা করে গেলেও রায়হানকে গ্রেপ্তার করতে পারছে না পুলিশ। রায়হান গ্রেপ্তার না হওয়ায় বাড়ছে খুনোখুনি।
চলতি বছরের ২৩ মে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে গুলি করে হত্যা করা হয় আরেক সন্ত্রাসী আলী আকবর ওরফে ঢাকাইয়া আকবরকে। এ ঘটনার তদন্তে উঠে এসেছে রায়হানের নাম। নগরের চান্দগাঁও থানার ওসি আফতাব উদ্দিনের ভাষ্য, রায়হান এখন মোস্ট ওয়ান্টেড আসামি। রায়হান কারাবন্দি ছোট সাজ্জাদের ডানহাত। তিনি রাউজানের কদলপুর গ্রামের মৃত বদিউল আলমের ছেলে। তাকে গ্রেপ্তারের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, গত ১০ মাসে চট্টগ্রাম শহর ও রাউজানে সংঘটিত ১৪টি খুনের ঘটনার অধিকাংশতেই উঠে এসেছে রায়হানের নাম। তিনি এখন অপরাধ জগতের ‘নিউ সেনসেশন’। চলতি বছরের ৩০ মার্চ নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে একটি প্রাইভেট কারে ব্রাশফায়ার করে দুজনকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় হওয়া মামলার আসামি রায়হান।
নগরের বাকলিয়া থানার ওসি (তদন্ত) মোজাম্মেল হক জানান, ২৯ এপ্রিল রাতে ওই প্রাইভেট কারে সন্ত্রাসী সারোয়ার হোসেন আছে এমন সন্দেহে গুলি চালিয়ে ছিল ছোট সাজ্জাদ বাহিনীর সদস্যরা। কিন্তু সেদিন সারোয়ার ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। সারোয়ারই ছোট সাজ্জাদকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন বলে ধারণা রায়হানসহ সাজ্জাদ বাহিনীর অন্য সদস্যদের। এ ছাড়া সিসিটিভির ফুটেজে জোড়া খুনের ঘটনার রায়হানকে অস্ত্র হাতে দেখা গেছে।
গত ২২ এপ্রিল দুপুরে রাউজান সদর ইউনিয়নের গাজীপাড়ায় সিএনজি ট্যাক্সি স্টেশন এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে খুন করা হয় ইব্রাহিম নামে যুবদলের এক কর্মীকে। এই মামলার অন্যতম আসামি রায়হান। নাম প্রকাশ না করে যুবদল নেতা ইব্রাহিমের এক স্বজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১০-১১ মাস ধরে একের পর এক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছেন রায়হান। অথচ তাকে গ্রেপ্তার করতে পারছে না পুলিশ। পুলিশের আন্তরিকতা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে।’ জানা গেছে, গত বছরের ২৯ আগস্ট নগরের অক্সিজেন-হাটহাজারীর পশ্চিম কুয়াইশে গুলি করে হত্যা করা হয় দুই বন্ধু মো. মাসুদ ও মো. আনিছকে।
এ ছাড়া গত ২৩ মে পতেঙ্গা সি-বিচে নগর পুলিশের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী আলী আকবর ওরফে ঢাকাইয়া আকবরকে গুলি করে হত্যার ঘটনার মামলার ২ নম্বর আসামি রায়হান। এর আগে গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর চান্দগাঁও আদূরপাড়া জাগরণী ক্লাবসংলগ্ন একটি চায়ের দোকানে গুলি করে হত্যা করা ব্যবসায়ী মো. তাহসীনকে। প্রতিটি খুনের ঘটনায় সাজ্জাদের সঙ্গে রায়হান জড়িত বলে জানিয়েছে পুলিশ। জেলা পুলিশ বলছে, প্রতিটি হত্যাকা-ে রায়হান অত্যাধুনিক শটগান, বিদেশি পিস্তল ব্যবহার করছেন। মূলত ইট-বালুর ব্যবসা ও আধিপত্য নিয়ে খুনের এসব ঘটনা ঘটছে।