নিজে পুড়ে ছাত্রদের বাঁচালেন শিক্ষিকা 

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৫, ০৭:০৮ এএম

মাইলস্টোন স্কুলের প্রাইমারি সেকশনের বাংলা ভার্সনের শিক্ষক সুমাইয়া ইসলাম নওরিন। দুপুরের ক্লাস প্রায় শেষ করছিলেন তিনি। এমন সময় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবনে বিমানবাহিনীর উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়। বিকট শব্দ ও আগুনে পুড়ে যায় সব। নওরিন যে রুমে ক্লাস নিচ্ছিলেন, তার সামনে সাত-আটজন শিক্ষার্থী ছিল। তাদের জড়িয়ে ধরলেন তিনি। নিজে পুড়ে ছাত্রদের বাঁচালেন এই শিক্ষিকা। ৩০ বছর বয়সী এই শিক্ষিকার শরীরের পেছনের অংশ, হাত ও পা পুড়ে যায়। নিজের জীবনের পরোয়া না করে তিনি শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচিয়েছেন।

শিক্ষিকা নওরিনকে চিকিৎসার জন্য জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসেন স্বজনরা। প্রথমে উত্তরার স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বার্ন ইউনিটে নেওয়া হয়। তার শরীরের অর্ধ শতাংশ পুড়ে গেছে এবং ওই শিক্ষিকা আশঙ্কাজনক বলেও জানান কর্তব্যরত চিকিৎসকরা।

দগ্ধ শিক্ষিকার ভাই মাহমুদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা খবর পেয়ে হাসপাতালে এসেছি। তার অবস্থা ভালো না। তিনি কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে পুড়ে গেছেন। শুনেছি সাত-আটজন শিক্ষার্থীকে জড়িয়ে ধরে তাদের বাঁচান তিনি। তবে তাৎক্ষণিক বিস্তারিত কিছু জানাতে পারেননি শিক্ষকের স্বজনরা।’

বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর ভয়াবহ আগুন থেকে বেঁচে ফেরা আরেক আহত শিক্ষক বলেন, ‘আমার হাত পুড়ে গেছে, মুখ ও কানও ঝলসে গেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। ঘটনা এতটাই আকস্মিক ছিল যে কারোরই কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ ছিল না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি ঠিক স্কুল ছুটির সময় ছিল। শিক্ষার্থীরা গেটে অপেক্ষা করছিল। কী ঘটছে, তা বোঝার আগেই চারপাশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই দৃষ্টিসীমা কমে আসে। আমি শুধু আগুন দেখতে পাচ্ছিলাম, তারপর ধোঁয়া...। পরে ওই শিক্ষক দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে একটি ভেজা কাপড় নিয়ে এসে নিজের নাক ঢাকেন। কাছে থাকা বাচ্চাদেরও একই কাজ করতে বললাম। তাদের অনেকের শার্টে ততক্ষণে আগুন ধরে গিয়েছিল। আমি তাদের নিচু হয়ে থাকতে এবং মুখ ঢাকতে বললাম।’

এই শিক্ষকের সঙ্গে তিনজন শিক্ষার্থী সেখান থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হন। তাদের মধ্যে গুরুতর দগ্ধ একজনকে সিএমএইচের বার্ন ইউনিটে রেফার করা হয়।

এদিকে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় যখন চারদিকে আতঙ্ক আর বিভীষিকা, তখন সাহস করে হতাহতদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন কলেজ শাখার একজন শিক্ষার্থী। চোখের সামনে বিমান বিধ্বস্তের ভয়াবহ মুহূর্ত দেখেও ভয় না পেয়ে তিনি আহত শিশুদের উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়েন। হাসপাতালে আহতদের নিয়ে এসে তিনি নিজেই বর্ণনা করেন সেই বিভীষিকাময় সময়ের কথা।

সেই ভয়ংকর মুহূর্তের কথা স্মরণ করে কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের ছুটি হয়ে গিয়েছিল। ছুটির পর স্বাভাবিকভাবেই আমরা চলে আসছিলাম। কিন্তু হঠাৎ ভয়ংকর একটি শব্দ হয়। পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তাও আমাদের প্রাইমারি স্কুল সেকশনে। কী ঘটনা হয়েছে, তা জানতে যাই ওখানে। পরে দেখি অনেক বাচ্চা খুব বাজেভাবে আহত হয়েছে। দু-তিনটি বাচ্চা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলছিল “আপু-ভাইয়া আমাদের বাঁচাও”। এ অবস্থায় আমরা কীভাবে তাদের ছেড়ে আসি! শিশুদের এমন আকুতি শুনে নিজেদের স্থির রাখতে পারিনি।’

তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে যান শিক্ষার্থীরা। দগ্ধদের সঙ্গে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটেও আসেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত