স্মরণকালের সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়ন

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৫, ০৭:১৫ এএম

২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের তথ্য প্রকাশ করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ। এতে দেখা যায়, বিগত অর্থবছরে স্মরণকালের মধ্যে সর্বনিম্ন পরিমাণ এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে। অর্থবছরটিতে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আইএমইডির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিভিন্ন সংস্থার স্ব-অর্থায়িত প্রকল্প ব্যতীত গত অর্থবছর মূল এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে এটি নামিয়ে আনা হয় ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকায়। এর বাইরে বিভিন্ন সংস্থার নিজস্ব এডিপির পরিমাণ ১০ হাজার ১২৬ কোটি টাকা। সর্বমোট ১ লাখ ২৬ হাজার ১২৬ কোটি টাকা। এ বরাদ্দের বিপরীতে বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ। স্মরণকালের ইতিহাসে এত কম হারে এডিপি বাস্তবায়ন হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, গত বছরের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ হয়নি বললেই চলে। এ ছাড়া আন্দোলনের সময় বেশ কয়েকদিন কারফিউ ছিল। বছর জুড়ে একধরনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতাও ছিল। তারা আরও বলেন, গত বছর ক্ষমতার পটপরিবর্তনের কয়েক প্রকল্প পরিচালককে খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেক ঠিকাদার পালিয়ে গেছেন। এসব কারণে প্রকল্প বরাদ্দের টাকার পুরোটা খরচ হয়নি।

বিদায়ী অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে ৫২ হাজার কোটি টাকা কম খরচ হয়েছে। এমন ঘটনা খুব একটা ঘটেনি। কভিডের শুরুর বছরে আগের বছরের চেয়ে কম খরচ হয়েছিল। তবে এত ব্যবধান হয়নি। গত অর্থবছরে এডিপির ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা খরচ হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এডিপির ২ লাখ ৫ হাজার ১১৮ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল। ২০০৪-০৫ অর্থবছরের পর থেকে গত অর্ধবছর পর্যন্ত সংশোধিত এডিপির ৮০ শতাংশ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তারা। কিন্তু গত অর্থবছরের মতো এত কম বাস্তবায়ন হয়নি।

সাম্প্রতিক অর্থবছরগুলোয় এডিপি বাস্তবায়নের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বাস্তবায়ন হয়েছিল ২ লাখ ১ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের হার ছিল ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ। এর আগের অর্থবছর সংশোধিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ১৯ হাজার ৬০১ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বাস্তবায়নের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৩ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের হার ৯২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৯ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বাস্তবায়ন হয়েছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন হার ৮২ দশমিক ১১ শতাংশ। ওই অর্থবছরটিতে দেশে কভিড মহামারী দেখা দিয়েছিল। এ কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি কম হয়েছিল বলে জানা  গেছে।

গত অর্থবছরের এডিপি বা প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে খারাপ করেছে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ। এ বিভাগের ১৫টি প্রকল্পের অনুকূলে ২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বছর শেষে এসব প্রকল্পের কর্মকর্তারা মাত্র ৩৫০ কোটি টাকা খরচ করেছেন। এ বিভাগের এডিপি বাস্তবায়ন হার মাত্র ১৫ শতাংশ। সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স করা শীর্ষ পাঁচের মধ্যে থাকা অন্য চারটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ হলো স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ (বাস্তবায়ন ২১ শতাংশ); নির্বাচন কমিশন সচিবালয় (৩২ শতাংশ); বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (৩৭ শতাংশ); ভূমি মন্ত্রণালয় (৩৭ শতাংশ)। অন্যদিকে সবচেয়ে ভালো করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এ বিভাগ তাদের বরাদ্দের ৯৮ শতাংশ টাকা খরচ করেছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এডিপি বাস্তবায়িত হয়নি বললেই চলে। এর ধারাবাহিকতা দ্বিতীয় প্রান্তিকেও কিছুটা ছিল। এ কারণে বাস্তবায়ন কম হয়েছে। তাছাড়া সরকার দুর্নীতি রোধকল্পে কিছু প্রকল্প স্থগিত করেছে। ফলে তারও একটি প্রভাব বাস্তবায়নে আছে। তবে বাস্তবায়ন কম হলেও অর্থনীতিতে তেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। কারণ যেসব প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোতে অপচয়ের সুনির্দিষ্ট নিদর্শন ছিল। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাস্তবায়ন খুবই কম। এ দুটি খাতে বাস্তবায়ন খারাপ হলে সাধারণ মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত