শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। তারাই দেশের ভবিষ্যৎ দিক-নির্দেশক, নীতি-নির্ধারক এমন নানা কথা টকশোর আলোচকরা, মঞ্চের বক্তারা বলেন বটে কিন্তু এই শিশুদের যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে আগামীর বিশ্বের উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য কারোরই উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখা যায় না। শিশুদের খেলাধুলার স্থান ক্রমশ দখল করে নিচ্ছে সুউচ্চ অট্টালিকা। ফলে তাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হচ্ছে না। বিদ্যাচর্চার নামে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বইয়ের বোঝা। পরীক্ষা পাসের জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে মুখস্থবিদ্যার ওপর। ফলে তাদের মন ও মননের বিকাশ হচ্ছে না। যে প্রগাঢ় অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের আগামীর ভবিষ্যৎ সেখান থেকে টেনে আলোতে আনার জন্য যে গুটিকয়েক মানুষ দীর্ঘদিন কাজ করে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে লেখক, শিক্ষাবিদ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সবিশেষ। তিনি করণীয় বলেই ক্ষান্ত হননি, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া প্রতিটি অঞ্চলের বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে গিয়ে বইপড়ার গুরুত্ব সম্পর্কে কথা বলেছেন। সেসব বক্তৃতারই কয়েকটি অনিন্দ্য সুন্দর, প্রজ্ঞামাধুর্য্যে অনন্য ভাষণের সংকলন ‘ব্রাহ্মণের বাড়ির কাকাতুয়া’ বইটি।
বাংলাদেশের সাহিত্য আন্দোলনের ইতিহাসেও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একটি অধ্যায়ের নাম। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে যে একঝাঁক তরুণ লেখক-কবি-সাহিত্যিক সাড়ম্বরে বাংলাসাহিত্যে তাদের আগমনধ্বনি ঘোষণা করেছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের ঋত্বিক। তার সম্পাদিত কণ্ঠস্বর পত্রিকা বদলে দিয়েছিল বাংলা সাহিত্যের খোলনলচে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে তিনি যখন পেশাজীবনে শিক্ষকতাকে বেছে নিলেন, সেখানেও নতুনের জয়ধ্বনিকেই স্বাগত জানিয়েছেন, তরুণ প্রাণের মাঝে ভাষা ও সাহিতের প্রতি ভালোবাসাই উসকে দিতে চেয়েছেন। একই প্রচেষ্টা দেখি তার উপস্থাপক জীবনেও। টেলিভিশনের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব এই মানুষটি অনুষ্ঠান তৈরি করেছেন সবচেয়ে অজনপ্রিয় বিষয়-জ্ঞানচর্চা নিয়ে। কিন্তু অসাধারণ উপস্থাপনা শৈলী, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব এবং তার জাদুকরী সজ্জন হাসি সেই অজনপ্রিয় বিষয়কেও করে তুলেছিল জনপ্রিয়, হয়েছিল প্রশংসিত। কিন্তু রুপালি পর্দার সোনালি হাতছানি উপেক্ষা করে তিনি যখন দেশের আনাচেকানাচে বিদ্যালয়গুলোতে উপস্থিত হয়েছেন তার পেছনেও রয়েছে একই অনুপ্রেরণা-দেশের আপামর জনসাধারণের মাঝে জ্ঞানের আকাক্সক্ষা, জ্ঞানচর্চার প্রতি ভালোবাসা ও মমত্ববোধ তৈরি করা। আমাদের সমাজকে জ্ঞানভিত্তিক একটি সমাজ হিসেবে গড়ে তোলা। এর জন্য দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন ‘আগামীর ভবিষ্যৎ’ তরুণ প্রজন্মের প্রতি। বিদ্যালয়গুলোতে ছড়িয়ে দিয়েছেন বইপড়া কর্মসূচির মতো অনিন্দ্য ও সুদূরপ্রসারী একটি কার্যক্রম। পাহাড়ের ঢালের ওপরের কোনো জগদ্দল পাথরকে ঠেলে দিতে দরকার হয় একটি ধাক্কার। এরপর আপন শক্তিতে সে পথ অতিক্রম করে। কিন্তু বিপুল ভারের সে পাথরকে ধাক্কা দিয়ে সচল করা সহজ নয়। সে ধাক্কার মাঝে নিহিত থাকতে হয় স্ফুলিঙ্গ। তেমনি পাঠের আস্বাদবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের বইপড়া সম্পর্কে আগ্রহী করতে প্রয়োজন এমন স্ফুলিংপূর্ণ সাহিত্যরসপূর্ণ সহমর্মী বাণী যা তাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি, ভাষা তথা দেশ ও পৃথিবীকে জানতে বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করবে। তার সেই বক্তৃতামালার একটি ছোট্ট সংকলন ব্রাহ্মণের বাড়ির কাকাতুয়া বইটি, যে বইটি পড়ে একটি উচ্চতর জীবনের অভিপ্রায়ী হয়ে ওঠে ছোট-বড় নির্বিশেষে। এক আলোকশিখা হয়ে আলো জ্বেলে চলেছে প্রাণে প্রাণে।
বইটি তোমাদের ভালো না লেগে যায় না!
সুলতানা রাজিয়া
