উচ্চমাধ্যমিক স্তরের কিছু বাস্তবতা

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৫, ০৩:৩৬ এএম

এসএসসি পাস করে একজন শিক্ষার্থী যখন এইচএসসিতে ভর্তি হয় তখন অনেকেই মনে করে, স্কুল পর্যায়ে যেহেতু আমরা অনেক ভালো ফল করে এসেছি সুতরাং আস্তে-ধীরে পড়াশোনা শুরু করলেই হবে। কেউ কেউ এটাও ভাবে যে, পরে একটানা পড়ে শেষ পর্যন্ত আমরা সব আয়ত্ত করে ফেলতে পারব। উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনার পরিধি তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বুঝতে পারে না।

উচ্চমাধ্যমিক স্তরে একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনার জন্য মূলত সময় পায় ১৮-২০ মাস। প্রথমেই যদি শিক্ষার্থীরা এ বিষয়টি অনুধাবনে ব্যর্থ হয় তাহলে পড়াশোনার সঙ্গে তাদের যে দূরত্ব তৈরি হয় পরবর্তী সময়ে অনেক পরিশ্রম করেও সেই দূরত্ব তারা আর পূরণ করতে পারে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী হতাশায় ভোগে। এসএসসি পাসের পর শিক্ষার্থীরা এইচএসসিতে ভর্তির আবেদনের সময় কিছু বিষয় সতর্কতার সঙ্গে খেয়াল রাখলে ভবিষ্যতে কষ্ট কম হবে।

 ভর্তির জন্য ভালো প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করলেই হবে না, সতর্কতার সঙ্গে চিন্তা করতে হবে বিভাগ ও বিষয় নির্বাচন, দূরত্ব (যাতায়াত), অর্থ নির্বাহ প্রভৃতি। বন্ধুবান্ধবের দেখাদেখি কোনো বিভাগ বা বিষয় নির্বাচন করা যাবে না। নিজের পড়া নিজেকেই পড়তে হবে। তাই কলেজে ভর্তির প্রতিটি সিদ্ধান্ত জেনে-বুঝে নিতে হবে। এই বিষয়গুলোতে ভুল করলে স্বপ্ন অধরাই রয়ে যাবে।

 একজন শিক্ষার্থীর ভালো ফলাফলে প্রধান ভূমিকা রাখে প্রথমে বাবা-মা, এরপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থী দিনে ৫-৬ ঘণ্টার জন্য আসে এবং এর মধ্যে ৬-৭টি বিষয়কে স্বল্প সময়ের জন্য আত্মস্থ করার চেষ্টা করে। শিক্ষার্থী যখন বাসায় অবস্থান করে তখন অভিভাবক খেয়ালে রাখবেন প্রতিষ্ঠানে যা পড়ানো হয়েছে তা ঠিকমতো শিক্ষার্থী তুলে আনে কিনা এবং প্র্যাকটিস করে কিনা। শিক্ষার্থী ল্যাবগুলোতে ঠিকমতো অংশগ্রহণ না করলে তাত্ত্বিক বিষয়ের শিখন পরিপূর্ণ হয় না।

 যেসব শিক্ষার্থী অভিভাবক থেকে দূরে থাকে বিশেষত হোস্টেলে/মেসে তাদের নানান প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়, যেমন নিজ দায়িত্বেই ঘুম থেকে উঠতে হয়, কলেজে সময়মতো আসতে হয় এবং নিজ দায়িত্বে পড়াশোনার কাজগুলোকে সম্পন্ন করতে হয় প্রভৃতি। এ ক্ষেত্রে হোস্টেল/মেসের শিক্ষার্থীদের যেসব প্রতিবন্ধকতা আরও দেখা যায়, তা হলো, হোস্টেলের খাবার মানে অসন্তুষ্টি, অসুস্থতায় যতেœর অভাব, পরিবার থেকে দূরে থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রে মন খারাপ, মেসের বাজার করা, নানান বয়সের বা পেশার লোকের উপস্থিতি, বয়সের পরিপক্বতার অভাবজনিত কারণে অনেক ক্ষেত্রে অন্যের দ্বারা প্রতারিত হওয়া প্রভৃতি। ‘সহপাঠী মানেই বন্ধু’ এই ধারণা থেকে বের হতে হবে।

 সন্তানের বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রটি অভিভাবককে যতদূর সম্ভব মনিটরিং করতে হবে। এ কথা অনস্বীকার্য, বর্তমানে আমরা সোশ্যাল মিডিয়া দ্বারা প্রত্যেকেই নানাভাবে কমবেশি প্রভাবিত। সে ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থী অপ্রয়োজনীয় সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত না রাখাই সংগত। এতে শিক্ষার্থীর পক্ষে ফোকাস ঠিক রাখা সম্ভব হয়।  শিক্ষকের/শ্রেণিশিক্ষকের সঙ্গে যদি অভিভাবকের নিয়মিত যোগাযোগ তৈরি না হয় তাহলে যেকোনো সংকটকালীন বিষয়ের সমাধান সহজে হয় না, এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থী। তাই শিক্ষকের/শ্রেণিশিক্ষকের সঙ্গে যদি অভিভাবকের নিয়মিত যোগাযোগ জরুরী।

 প্রতিদিন একজন শিক্ষার্থীকে নিজের মতো করে কমপক্ষে ৫-৬ ঘণ্টা পড়তে হবে এবং কিছু না কিছু লিখতে হবে। লেখার অভ্যাসের অভাবজনিত কারণে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আসতে পারে না।

 প্রত্যেকটি বিষয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট একটি খাতা ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো বিষয়কে চতুর্থ বিষয় মনে করা যাবে না। এসএসসির তুলনায় এইচএসসিতে প্রত্যেকটি বিষয় অনেক বিস্তৃত তাই অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি বিষয়ে আলাদা আলাদাভাবে অ+ উঠানো কঠিন। সেই ক্ষেত্রে কোন বিষয় সহজ বা কোন বিষয় কঠিন এই ধারণা না রেখে সমান গুরুত্ব দিয়ে সব বিষয়ে অ+ পাওয়ার লক্ষ্যে পড়তে হবে। যাতে করে শেষ পর্যন্ত টোটাল ফলাফলে অ+ প্রাপ্তিতে তেমন কোনো দুর্ভাবনায় পড়তে না হয়।

 খুঁটিনাটি বিষয়কে আত্মস্থ করার জন্য একটি ছোট ঘড়ঃবনড়ড়শ ব্যবহার করা উচিত। যেখানে প্রত্যেকটি চ্যাপ্টারের কবুড়িৎফং থাকবে সংক্ষেপে বর্ণনাসহ। এই অভ্যাস গড়ে তুললে শিক্ষার্থীর যেকোনো বিষয় আত্মস্থ করতে কষ্ট কম হবে।

 শিক্ষার্থী যেকোনো পরীক্ষায় টাইম ম্যানেজমেন্ট এমনভাবে করবে, যাতে করে অন্ততপক্ষে একবার পুরো খাতা রিভিশন দিতে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য ঠিকভাবে লেখা হয়েছে কি না সেটি নিশ্চিত হতে পারে।

 লেটেস্ট এডিশনের ১/২ জন ভালো লেখকের মূল বই পড়তে হবে প্রতিটি বিষয়ের ক্ষেত্রে এবং ফোকাস যেন নষ্ট না হয় সে জন্য অন্য কোনো ধরনের বই না পড়াই উত্তম। সর্বোপরি প্রত্যেকটি বিষয়কে ভালোবাসতে হবে।

পরিশেষে এ কথাই বলব, উপরোক্ত বিষয়গুলো যদি একজন শিক্ষার্থী উপলব্ধি করে মেনে চলতে পারে তাহলে তাদের উচ্চমাধ্যমিক স্তরের এই কঠিন যাত্রা সহজ হয়ে ধরা দেবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, জীববিজ্ঞান বিভাগ

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ পিলখানা, ঢাকা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত