২০৪১ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘ইকোনমিক হাব’ গড়ার লক্ষ্য

  • মাস্টারপ্ল্যানে রয়েছে শিল্পাঞ্চল, শিপইয়ার্ড ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, রেলপথসহ টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা
  • ২০২৬ সালের জুলাইয়ে চালু হবে বন্দরের নিজস্ব প্রথম টার্মিনাল
  • বড় চ্যালেঞ্জ নাব্যতা রক্ষা, কর্তৃপক্ষ বলছে নাব্য রক্ষায় নিজস্ব ড্রেজিং ব্যবস্থার উদ্যোগ
আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৫, ০৩:৩৮ পিএম

পায়রা সমুদ্রবন্দর দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর, এই বন্দরকে ঘিরে তৈরি হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি ও বিস্তৃত মাস্টারপ্ল্যান। বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছেন, ২০৪১ সালের মধ্যে এ বন্দরকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইকোনমিক হাবে রূপান্তর করার লক্ষ্যেই এ পরিকল্পনা। শুধু একটি বন্দর নয়-এ অঞ্চলের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, পরিবেশ এবং জীবিকা উন্নয়নের বহুমাত্রিক লক্ষ্য নিয়েই মাস্টারপ্ল্যানটি তৈরি করা হয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, ইতোমধ্যে পায়রা বন্দরের জন্য আধুনিক ইকুইপমেন্ট সমৃদ্ধ ৬৫০ মিটারের জেটি, তিন লাখ ২৫ হাজার বর্গমিটারের ব্যাকআপ ইয়ার্ড এবং ১০ হাজার বর্গমিটার আধুনিক সিএফএস নির্মাণ করা হয়েছে। 

আন্ধারমানিক নদের ওপর সেতু এবং সংযোগ সড়কের কাজ চলছে পুরোদমে। এর মাধ্যমে আগামী বছরের জুলাইয়ে বন্দরের প্রথম টার্মিনাল কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য রয়েছে।

বন্দরের এই পরিকল্পনার আওতায় ধাপে ধাপে নির্মিত হবে মাল্টি-পারপাস টার্মিনাল, কনটেইনার টার্মিনাল, ড্রাই ও লিকুইড বাল্কসহ বিভিন্ন মেরিন টার্মিনাল। গুরুত্ব দেয়া হয়েছে অভ্যন্তরীণ জলপথ সংযোগ উন্নয়নের ওপর। বন্দরকে সড়ক, রেল ও নৌপথের মাধ্যমে সারাদেশের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি পরিকল্পনায় রয়েছে শিল্পাঞ্চল, শিপইয়ার্ড ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাবও।

বন্দর ব্যবহারকারী অংশীজন ও ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু মাস্টারপ্ল্যান করেই নয়, এটিকে বাস্তবে রূপ দেয়ার পথে এগিয়ে যেতে হবে। মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে নাব্যতা সংকট ও যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সমাধান করতে পারলে এই মাস্টারপ্ল্যান সফল হবে। সঠিক সময়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে এই বন্দর হতে পারে দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। বাড়বে বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানি ও তৈরি হবে হাজারো কর্মসংস্থানের সুযোগ। এছাড়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে গতি আনবে। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, মাস্টারপ্ল্যানটি করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ বিআরটিসি এবং নেদারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রয়্যাল হাসকোনিং ডিএইচভি। সরকারের অনুমোদনক্রমে ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মাস্টারপ্ল্যানের চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তি অনুযায়ী বন্দরের মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজটি ৮টি ধাপে দুই প্রতিষ্ঠানের শতাধিক বিশেষজ্ঞ কাজটি করেন। সম্প্রতি এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়।

পরিকল্পনাকারীদের দাবি, একটি সমুদ্র বন্দর প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মাস্টারপ্ল্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি কেবল একটি অবকাঠামোগত পরিকল্পনা নয়, বরং একটি সমন্বিত, টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন রূপরেখা। যা প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, পরিবেশগত প্রভাব, ভবিষ্যৎ চাহিদা ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার নির্দেশনা প্রদান করে। পাশাপাশি ট্রাফিক ফোরকাস্টিং স্টাডির মাধ্যমে পণ্য চলাচলের পূর্বাভাস, চ্যানেলের অবস্থা, সিলেটেশন হার, ড্রেজিংয়ের পরিমাণ ও ধরণ ইত্যাদি নির্ধারণ করা হয়। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানি, সড়ক, রেল এবং টেলিকমিউনিকেশনসহ প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সংযোগের রূপরেখাও মাস্টারপ্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। 

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, ‘রাবনাবাদ চ্যানেলের নাব্যতা রক্ষা এবং নিরবিচ্ছিন্ন লজিস্টিক সংযোগ না থাকলে পরিকল্পনার সুফল পাওয়া কঠিন হবে। নাব্যতা যদি না থাকে, তাহলে এই বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। বড় জাহাজ আনতে হলে সাড়ে ৮ মিটার থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত গভীরতা প্রয়োজন।’

বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি এবায়েদুল হক চাঁন বলেন, ‘বন্দরের শুরুতে একটু ভুলক্রুটি হতেই পারে। সেটি ধরে আলোচনা করলে হবে না। তা হলে সামনে আগানো যাবে না। আমি মনে করি, আমরা এগিয়ে যেতে পারি কিভাবে সেই ব্যাপারে আমাদের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। নদীতে ড্রেজিংয়ের কাজগুলো নৌবাহিনীকে দিলে ভাল হবে। তাহলে কাজটি সুন্দর হবে।’ 

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যানটি পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করতে পারলে বন্দরটি ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন দ্বার হিসেবে উন্মোচিত হবে। এছাড়া ইকোনমিক জোন এবং ইপিজেড হওয়ার পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রি হলে শুধু আমদানি নয়, রপ্তানিও হবে।’

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল মাসুদ ইকবাল বলেন, ‘২০২৬ সালের জুলাই নাগাদ বন্দরের প্রথম টার্মিনালের কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য আমাদের। নিজস্ব টার্মিনালে কার্যক্রম শুরুর আগেই জাহাজ হ্যান্ডেলিং করে দুই হাজার ৭৯ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করেছে সরকার। এই মাস্টারপ্ল্যান বন্দরের টেকসই অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ এবং দেশীয় ও অন্তর্জাতিক ব্যবসা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আমরা পায়রা বন্দরকে একটি আধুনিক বন্দর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। বন্দরের কার্যক্রমে যেন পরিবেশের ওপর কোন নীতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সে জন্য বন্দরের অপারেশনগুলো পরিবেশ বান্ধব করা। সেই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের জীবনমানে উন্নয়নে অবদান রাখা।’ 

নৌপরিবহন উপদেষ্টা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ড্রেজিংয়ের জন্য পায়রা বন্দরের ক্যাপাসিটি বাড়ানোর দরকার আছে। এটা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের তরফ থেকে কাজ হচ্ছে। আমরা আশা করি, দুই-এক মাসের মধ্যে পায়রা বন্দরের কমপক্ষে দুইটি ড্রেজার স্যাংশন করাতে পারবো। বরিশাল পর্যন্ত রেল লাইনের জন্য রেলপথ উপদেষ্টার সঙ্গে আলাপ হয়েছে। কেবিনেটেও আলোচনা হবে। এছাড়া পটুয়াখালী পর্যন্ত আপাতত চার লেনের সড়ক হবে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘বেসরকারি এবং বিদেশি প্রত্যেকের কাছে অনুরোধ করবো এখানে ইন্ডাস্ট্রি করার। এখানে শিল্প এলাকার জন্য জমি রাখা হয়েছে। ছোট করে হলেও শুরু করলে একদিন বড় হবে। একটি বন্দর তৈরি হতে অনেক সময় লাগে। ১০ বছর কিছুই নয়। ২০-৩০ বছর হলে বলা যাবে পরিপূর্ণ কাজ শুরু করেছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত