আওয়ামী লীগ আমলে বরিশাল সিটি করপোরেশন থেকে বদলি হয়ে আসা এক প্রকৌশলীকে বিধি লঙ্ঘন করে পদোন্নতি দিতে তোড়জোড় শুরু করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ প্রকৌশলী এসএম শফিকুর রহমানকে পদোন্নতি দিতে তোড়জোড় শুরু করেছে সংস্থাটি। এরই মধ্যে তাকে পদোন্নতি দিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে ডিএনসিসি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাহাঙ্গীর কবির নানকের সুপারিশে বদলি হয়ে ডিএনসিসিতে আসেন শফিকুর রহমান। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা ‘লাভজনক’ প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন তিনি। দলীয় প্রভাবে মন্ত্রণালয় থেকে বিধিবহির্ভূত একটি চিঠিও ইস্যু করিয়ে নিয়েছিলেন। ২০১৪ সালের ২৩ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ডিএনসিসিকে দেওয়া সেই চিঠিতে তাকে জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি, অবসরকালীন পাওনা বর্তমান কর্মস্থল হতে প্রদানে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। অথচ ডিএনসিসি কর্মচারী চাকুরি বিধিমালায় এমন কোনো নিয়ম নেই।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন কর্মচারী চাকুরি বিধিমালার ১ এর (২) ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, ‘এই বিধিমালা ডিএনসিসির সকল সার্বক্ষণিক কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য হবে। তবে প্রেষণে নিয়োজিত অথবা বদলি, চুক্তি বা খ-কালীন ভিত্তিতে নিয়োজিত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে তাদের চাকরির শর্তে স্পষ্টভাবে উল্লিখিত না থাকলে এ বিধিমালার কোনো কিছু প্রযোজ্য হবে না।’
তাছাড়া ২০১৩ সালের ২৬ নভেম্বর শফিকুর রহমানসহ নারায়ণগঞ্জ এবং বরিশাল সিটি করপোরেশন থেকে আসা পাঁচজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্ম বণ্টন করে একটি অফিস আদেশ জারি করে ডিএনসিসি। করপোরেশনের তৎকালীন সচিব আবু ছাইদ শেখ ওই অফিস আদেশে উল্লেখ করেন, পদোন্নতির জ্যেষ্ঠতা, অবসরকালীন পাওনাদি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হতে গ্রহণ করতে হবে।
গত ২০ জুলাই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে লেখা চিঠিতে ডিএনসিসি উল্লেখ করে, ‘শফিকুর রহমান ১৯৯৩ সালের ২৫ মে বরিশাল সিটি করপোরেশনে সহকারী প্রকৌশলী (পানি) পদে যোগদান করেন। ২০০৮ সালের ৩০ জুলাই তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী (পানি) পদে পদোন্নতি লাভ করেন। তার মূল পদ নির্বাহী প্রকৌশলী (পানি), যা ডিএনসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর/যান্ত্রিক) পদে পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত পদ নয়।’
এর আগে ২৩ এপ্রিল বাছাই কমিটির কার্যবিবরণীতে বলা হয়, শফিকুর রহমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা বৈদ্যুতিক প্রকৌশলে স্নাতক। ডিএনসিসি চাকুরি বিধিমালা, ২০১৯ অনুযায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর/যান্ত্রিক) পদে পদোন্নতির জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) পদে কমপক্ষে ৫ (পাঁচ) বছরের চাকুরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, কিন্তু তার ফিডার পদের জন্য নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী পুর বা যান্ত্রিক প্রকৌশলে ডিগ্রি নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, একসময় আওয়ামী লীগের দাপটে চলা শফিকুর রহমান এখন বঞ্চিত সেজেছেন। এই বঞ্চিত কোটায় ইচ্ছামতো ‘লাভজনক’ কাজ বাগিয়ে নিচ্ছেন। এর ধারাবাহিকতায় পদোন্নতির আবেদনও করেছেন।
সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা অনিয়ম দুর্নীতির দায়ে তাকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর গত বছর ১ সেপ্টেম্বর আমিনবাজার ল্যান্ডফিলসহ নানা অপকর্মের দায়ে তৎকালীন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এসএম শফিকুর রহমানকে নগর পরিকল্পনা বিভাগে স্থপতি পদে বদলি করেন। কিন্তু কিছুদিন পরই তিনি ‘বঞ্চিত’ সেজে পদোন্নতি ও ‘লাভজনক’ পদ বাগিয়ে নিতে তৎপর হয়েছেন। ডিএনসিসির শীর্ষ কর্মকর্তারা নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে শফিকুর রহমানের ইচ্ছামতো দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছেন।
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের ফোকাল পয়েন্ট ছাড়াও তাকে প্রধান নগর স্থপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। পদোন্নতির আলোচনার মধ্যেই অনিয়মের অভিযোগের তোয়াক্কা না করে আবারও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। গত ২৯ জুন ডিএনসিসির সচিব মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে শফিকুর রহমানকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের দায়িত্বেও আছেন।
এদিকে, গত ২৩ এপ্রিল ডিএনসিসির বাছাই কমিটির সভা হয়। সভায় এসএম শফিকুর রহমানের পদোন্নতির বিষয়টি আলোচনা হয়। কার্যবিবরণীতে বলা হয়, ‘স্থানীয় সরকার বিভাগ ২০১৪ সালে শফিকুর রহমানের জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি, অবসরকালীন পাওনা বর্তমান কর্মস্থল হতে প্রদানে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেয়। এরপর গত বছর অক্টোবর মাসে তাকে স্থপতি, নগর পরিকল্পনা বিভাগকে নিজ দায়িত্বসহ প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।’ এ ছাড়া তিনি ‘বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ’ প্রকল্পে প্রকল্প ফোকাল পারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ পাত্তা না দিয়ে ডিএনসিসি শফিকুর রহমানকে পদোন্নতির সুপারিশ প্রাতিষ্ঠানিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কেননা শফিকুর রহমানকে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে লেখা চিঠিতে ডিএনসিসি বরিশাল সিটি করপোরেশন থেকে সিলেট সিটি করপোরেশনে বদলি হয়ে পদোন্নতি পাওয়া আজিজুর রহমান নামের এক নির্বাহী প্রকৌশলীর উদাহরণ দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা বলেন, সিলেট সিটি করপোরেশন যেটি করেছে, সেটিও অনিয়ম। অনিয়ম কখনোই পদোন্নতির জন্য উদাহরণ হতে পারে না। এভাবে পদোন্নতি দিলে সিটি করপোরেশনে বদলি হয়ে আসা অনেকেই পদোন্নতি দাবি করবেন। তখন বেকায়দায় পড়তে হবে নগর প্রশাসনকে।
একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এভাবে পদোন্নতি দেওয়ার কোনো নিয়ম সিটি করপোরেশনে নেই। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যে প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিয়েছে, সেখান থেকেই পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতাসহ সব সুবিধা নিতে হবে। ইতিপূর্বে ডিএনসিসি থেকে বদলি হয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যাওয়া কর্মচারীদের পদোন্নতি ডিএনসিসি থেকে দেওয়ার নজির রয়েছে। সে ক্ষেত্রে শফিকুর রহমানের পদোন্নতি দিতে বরিশাল সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নিতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের সুপারিশে বদলি হয়ে এসে ডিএনসিসিতে দলীয় প্রভাব বিস্তার করে। সেই প্রভাবে মন্ত্রণালয় থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে তাকে পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার জন্য চিঠি আদায় করে নেন। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন সময়ে নিজের প্রকল্পের পিডি (প্রকল্প পরিচালক) পদও বাগিয়ে নেন। তার বিরুদ্ধে আমিনবাজার ল্যান্ডফিল উন্নয়ন এবং যন্ত্রপাতি ক্রয়ে কোটি কোটি টাকা লোপাট, ভুয়া বিল তৈরির মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মিত জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শফিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, পদোন্নতির বিষয়ে সচিব দপ্তরে কথা বলেন, এটি আমার বিষয় নয়।
বক্তব্য নিতে গত বুধবার ও গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ডিএনসিসির সচিব এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের দপ্তরে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল এবং এসএমএস দিয়েও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সচিব দপ্তরের দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শফিকুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে ডিএনসিসিতে কর্মরত আছেন। পদোন্নতির ব্যাপারে তিনি বঞ্চিত হচ্ছেন, এটা সত্য। তবে ডিএনসিসি কর্মচারী চাকুরি বিধিমালা এবং মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠি সাংঘর্ষিক হওয়ায় আমরা আবার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি।
