অভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে? এ নিয়ে কথা বলেছেন বিএনপি মহাসচিব। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রেজাউল করিম লাবলু
গত এক বছরে জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে, জানতে চাইলে বর্ষীয়ান এই নেতা বলেন, ‘জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন জনগণের সরকার। কিন্তু ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেয়নি। দেশের মানুষ ভোট দিতে পারেনি। তারা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে সংসদে পাঠাতে পারেনি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচনের ঘোষণা এসেছে। আশা করছি, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন হবে। নির্বাচন হলে জনগণের পছন্দের সরকার ক্ষমতায় এলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। জনগণের প্রত্যাশা বহুলাংশে পূরণ হবে।’
৫ আগস্টের আগে সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ঐক্য গড়ে উঠেছিল। সময়ের ব্যবধানে সংস্কার, বিচার, নির্বাচনসহ নানা ইস্যুতে অনৈক্য দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে অনৈক্য দেখছি না। যে অনৈক্যের কথা বলা হচ্ছে, আমি তাকে দ্বিমত বলতে চাই। ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভিন্ন ভিন্ন মত থাকতে পারে। এটাই স্বাভাবিক। তবে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের ইস্যুতে সবাই একমত ছিল। তাই তৎকালীন সরকারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। আমরা সবাই একসঙ্গে আন্দোলন করেছি। এখন সেই পরিস্থিতি নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে সব রাজনৈতিক দল নির্বাচন চায়।’
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল সংস্কার ও বিচারের ওপর জোর দিচ্ছে। এ বিষয়ে বিএনপির অবস্থান জানতে চাইলে দলটির মহাসচিব বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা বিএনপি অনেক আগেই উপলব্ধি করেছে। এজন্য বিএনপি সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ৩১ দফা রূপরেখা ঘোষণা করেছে। আজ যেসব সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, তা এই ৩১ দফায় রয়েছে। আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর আগে এই ৩১ দফা রূপরেখা ঘোষণা করেছেন। জনগণের ভোটে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করবে। এর সুফল পাবে দেশ ও জনগণ।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সংস্কার প্রশ্নে বিএনপিকে কেউ কেউ বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। এতে কোনো লাভ হবে না। বিএনপি সংস্কারের পক্ষে। অতীতে বিএনপি দেশে অনেক সংস্কার করেছে। আগামীতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে।’
নির্বাচনের আগে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী হত্যা, খুন ও গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে সংস্কার এবং ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ খুন, গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচার চাই আমরা। ইতিমধ্যে সংস্কারের কাজ চলছে। ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে জুলাই সনদের খসড়া চূড়ান্ত করেছে। আমরা আমাদের মতামত দিয়েছি। সরকারের পক্ষ থেকে আজ জুলাই সনদের ঘোষণা আসবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাসহ তার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের, যারা হত্যা, খুন ও গুমের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিচার শুরু হয়েছে। চলতি বছরের শেষের দিকে শেখ হাসিনাসহ অনেকের বিচার সম্পন্ন হবে বলে আশা করছি। আগামীতে জনগণের ভোটে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে জুলাই সনদের বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিচারের কাজ এগিয়ে যাবে।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘বিএনপি জনগণের চাহিদা ও প্রত্যাশা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই এগোচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি একটি ট্রানজিশন পিরিয়ড। এখন একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। জাতীয় ঐক্যের আবহ সৃষ্টি হয়েছে। যদি এই সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জন সম্ভব। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে জনগণের ওপর। বাংলাদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ থাকলে অনেক কিছুই সম্ভব। একাত্তরে তারা তা প্রমাণ করেছে, এমনকি ২০২৪ সালেও তা আবার প্রমাণিত হয়েছে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি বিএনপির শতভাগ সমর্থন রয়েছে জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর যেমন সমর্থন ছিল, এখনো তেমনই রয়েছে। নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর পর্যন্ত এই সমর্থন অব্যাহত থাকবে। মাঝেমধ্যে সরকার ভুল করলে তা শুধরে দেওয়ার জন্য সমালোচনা করছে। এটি বিরোধিতা নয়। সরকার যাতে পথ না হারায়, সেদিকে সবসময় খেয়াল রাখবে বিএনপি।’
