ওমান প্রবাসী মো. বাহার উদ্দিন আড়াই বছর পর দেশে ফিরছিলেন। পরিবারের সবার মধ্যে ফেরার আনন্দে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছিলেন, ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার’। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্ন। ভয়াবহ এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি বেঁচে গেলেও হারিয়েছেন মা, স্ত্রী, মেয়ে, নানি, ভাবি ও দুই ভাতিজিকে। চোখের সামনে সাত স্বজনকে হারিয়ে বাহার উদ্দিন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তার আহাজারি ও স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে পুরো গ্রামের পরিবেশ।
গতকাল বুধবার ভোরে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে লক্ষ্মীপুরের বাড়ি ফেরার পথে বাহারদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় এলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খালে পড়ে যায়। গাড়িতে সে সময় ১১ জন আরোহী ছিলেন। বাহারসহ চারজন ডুবে যাওয়া মাইক্রোবাস থেকে বের হতে পারলেও গাড়ির মধ্যেই আটকা পড়ে মারা যান বাহারের স্ত্রী কবিতা আক্তার (২৪), মেয়ে মীম আক্তার (২), মা মুরশিদা বেগম (৫০), নানি ফয়জুন নেছা (৭০), বড় ভাইয়ের স্ত্রী লাবনী আক্তার (২৫) এবং ভাতিজি রেশমি আক্তার (৯) ও লামিয়া আক্তার (৮)।
পুলিশ বলছে, দুর্ঘটনার সময় চালক ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বলে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে মনে করা হচ্ছে।
দুর্ঘটনাস্থলে থাকা স্থানীয় লোকজন জানান, ঘটনার পরপরই গাড়ির চালক খালের পানি থেকে বের হয়ে পালিয়ে যান। বাহার উদ্দিন ও তার শ্বশুর ইস্কান্দার মির্জাসহ চারজন গ্লাস ভেঙে বের হয়ে আসতে পারলেও বাকি সাতজন গাড়ির ভেতরে আটকা পড়েন। তারা প্রায় দুই ঘণ্টা পানির নিচে ছিলেন। পরে পুলিশের রেকার দিয়ে গাড়িটি ওঠানোর পর মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়।
গতকাল দুপুরে জেলার চন্দ্রগঞ্জ থানার উত্তর জয়পুর ইউনিয়নের পশ্চিম চৌপল্লী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, দুই বছর বয়সী শিশুকন্যা মিম আক্তারের নিথর দেহ বুকে চেপে ধরে চিৎকার করে কাঁদছেন বাহার। বারবার বলছেন, আমার সব কেড়ে নিল কে?
তার স্বজনরা জানান, দুই বছরের মেয়ে মীমকে দেখেছেন প্রথমবারের মতো মঙ্গলবার রাতে বিমানবন্দরে। কোলে নিয়েছেন একবার তিনি।
বাহারের দুই ভাতিজি রেশমি ও লামিয়া ছিল তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তাদের জন্য নতুন বই ও স্কুলব্যাগ কেনা হয়েছিল কিছুদিন আগেই। সেই ব্যাগ আর বইয়ের দিকে নিথর হয়ে তাকিয়ে আছেন। শোকে পাথর বাহারের ভাই রুবেলও বিলাপ করতে করতে বলছেন, ‘কাদের নিয়ে থাকবেন তিনি?’
বাহারের শ্বশুর ইস্কান্দার মির্জা আক্ষেপ করে বলেন, চালকের ঘুমের কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। তিনি জানান, বিকেল ৫টায় পশ্চিম চৌপল্লী গ্রামের কাচারিবাড়ি এলাকায় ছয়জনের দাফন সম্পন্ন হয়। নিহত ফয়জুন নেছাকে দাফন করা হয় হাজির পাড়ার চর মোহাম্মদপুর গ্রামে।
চন্দ্রগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি মো. মোবারক হোসেন বলেন, এটা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটা পুরো একটি পরিবারের নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনা। চালক ঘুমিয়ে পড়ার অসতর্কতায় এভাবে একটি পরিবার শেষ হয়ে যাবে, এটা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে। তিনি জানান, এ ঘটনায় চালক এনায়েতুল্লাহ আকবর (২৪) পলাতক রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সুনামগঞ্জে বাস-সিএনজি মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩ জন নিহত : সুনামগঞ্জে বাস-সিএনজি মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। গতকাল বুধবার দুপুরে সুনামগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের বাহাদুরপুর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। জানা যায়, সুনামগঞ্জ থেকে একটি সিএনজি শান্তিগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দিলে বিপরীতমুখী সিলেট থেকে আসা দ্রুতগামী একটি বাসের সঙ্গে বাহাদুরপুর এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত এবং তিনজন গুরুতর আহত হন। পরে পুলিশ গিয়ে ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে এবং বাকি তিনজনকে চিকিৎসার জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে প্রেরণ করে। তাৎক্ষণিকভাবে নিহত ও আহতদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি।
