মুখ দেখাদেখি যেন বন্ধ না হয় দলগুলোর

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৫, ০৬:১১ পিএম

গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় জাতীয় স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘প্রিয় রাজনৈতিক দলের সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন ইস্যুতে আমাদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত থাকবে। ভিন্নমত নিরসনে আলোচনা হবে। তবে জাতীয় পরিষদে গণতন্ত্রের পক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যাতে মুখ দেখাদেখি বন্ধ না হয়। জাতীয় স্বার্থে আমাদের সবার ঐক্যবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। কারণ আমি বিশ্বাস করি, ধর্ম, দর্শন, মত যার যার, রাষ্ট্র আমাদের সবার।’ গতকাল বুধবার বিকেলে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে রাজধানীতে বিজয় র‌্যালির আগে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথি হিসেবে দেওয়া বক্তব্যে তারেক রহমান এ আহ্বান জানান। নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিকেল সাড়ে ৩টায় শুরু হয় সংক্ষিপ্ত সমাবেশ। তারেক রহমানের বক্তব্যের পর বিকেল সাড়ে ৪টায় বিজয় র‌্যালি শুরু হয়।

বর্ণাঢ্য র‌্যালিতে ঢাকা মহানগর ছাড়াও আশপাশের জেলার নেতাকর্মীরা ব্যানার-ফেস্টুন, জাতীয় ও দলীয় পতাকা নিয়ে অংশ নেন। ফকিরাপুল থেকে কাকরাইলের মোড় পর্যন্ত সড়কে হাজার হাজার কর্মীর উপস্থিতি জনসমুদ্রে রূপ নেয়। বিজয় র‌্যালিটি বিজয়নগর, পল্টন মোড়, জাতীয় প্রেস ক্লাব, কদম ফোয়ারা, মৎস্য ভবন মোড়, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন সড়ক দিয়ে শাহবাগে গিয়ে শেষ হয়। ঢাকা ছাড়াও সব বিভাগীয় শহরে একযোগে বিজয় র‌্যালি করেছে বিএনপি। কর্মসূচিগুলোতে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা প্রধান অতিথি ছিলেন।

তারেক রহমান বলেন, ‘জনগণের রায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বিএনপি কী ধরনের রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনীতি পরিচালনা করবে, দলের পক্ষ থেকে ৩১ দফার মাধ্যমে একটি রূপরেখা জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছি আমরা। অন্তর্বর্তী সরকারও সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পরামর্শ করে সংস্কার প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য বিএনপি জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা চায়। আমাদের উদ্দেশ্য দেশের ও জনগণের কল্যাণ।’

তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের সরাসরি ভোটে, জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য অন্তর্বর্র্তী সরকার গতকাল (মঙ্গলবার) জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়সীমা ঘোষণা করেছে। জনঅভিপ্রায় পূরণে জুলাই সনদ ঘোষণা করা হয়েছে। এসব উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। বর্তমানে আমরা ইতিহাসের যে সন্ধিক্ষণ পার করছি, সে ঐতিহাসিক সময়টির জন্য দেশের মানুষ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করেছে। ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটাতে আমরা হাজারো সহকর্মীকে হারিয়েছি; আমাদের অনেক সন্তান-স্বজনের বুকের তাজা রক্ত দেখতে হয়েছে।’

ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিসহ বিরোধী দল ও মতের নেতাকর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে লাখ লাখ মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দেওয়া হয়েছে। বিএনপির এমন নেতাও রয়েছেন যাদের বিরুদ্ধে দুইশ-তিনশ মামলা রয়েছে। চার শতাধিক মামলাও রয়েছে। গুম-অপহরণের শিকার হয়েছেন বিএনপিসহ বিরোধী দলের শত শত নেতাকর্মী। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে দেড় হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। খুনিদের বন্দুকের নল থেকে চার বছরের শিশুও রেহাই পায়নি। ক্ষমতালোভী ফ্যাসিস্টদের কারণে আমাদের অনেক সাহসী সেনা কর্মকর্তা হত্যার শিকার হয়েছেন; বিডিআরের নাম পর্যন্ত পাল্টে দেওয়া হয়েছে। ভেঙে দেওয়া হয়েছে পুলিশের মনোবল।’

এ বিজয় অন্ধকার থেকে আলোর কথা বলবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘পতিত পরাজিত পলাতক স্বৈরাচারের আমলে দেশে অন্ধকারের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল। আমি বলব, অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আলোর পথে যাত্রা শুরু হয়েছে। এ যাত্রা সহজ নয়। দেশের মানুষের জন্য নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার অপার সম্ভাবনা ও সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমরা যদি এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দেশের জনগণের রাজনৈতিক শক্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারি, জনগণের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সুযোগ পাবে না।’

তিনি বলেন, ‘দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করা যাবে না, আমাদের আর কখনো ’২৪-এর দৃশ্য দেখতে হবে না। আমি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, আপনার নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় একজন নাগরিক হিসেবে আপনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। আমাদের অবশ্যই মনে রাখা দরকার, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমরা কেউ নিরাপদ ছিলাম না, আমাদের সন্তানরা নিরাপদ থাকতে পারেনি।’

গণতন্ত্র না থাকলে কেউ নিরাপদ নয় উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের ভোটের অধিকার, সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। গণতন্ত্রকামী জনগণের জন্য বাংলাদেশটাকেই বর্বর বন্দিখানা, আয়নাঘর বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। দেশে যদি গণতন্ত্র ও আইনের শাসন না থাকে তাহলে নারী কিংবা পুরুষ কেউই নিরাপদ নয়। একমাত্র গণতন্ত্র ও আইনের শাসন আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারে। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নিশ্চিতের জন্য, রাষ্ট্র ও সরকারে জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোর সুষ্ঠু চর্চা করতে হবে।’

আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির প্রত্যেক নেতাকর্মী নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়েছে, কিন্তু কখনো মাথানত করেনি মন্তব্য করে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘প্রথমে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এবং পরে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা আন্দোলন করেছি। আমরা কারাভোগ করেছি, নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়েছি কিন্তু কখনো মাথানত করিনি। আমরা লড়াই করেছি, সামনের দিকে গিয়েছি।’

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিজয় অর্জনে সহযোগিতা করায় সেনাবাহিনীকে বিশেষ কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘দেশের মানুষকে, রাজনৈতিক দলগুলোকে, ছাত্রদের এবং দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। তাদের সহযোগিতায় আমরা এ বিজয় অর্জন করতে পেরেছি। আমাদের নেতা তারেক রহমানকে সবার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি আমাদের নেতৃত্ব দিয়ে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমরা যে সফলতা উদযাপন করছি, সেটি শুধু ৩৬ দিনের নয়, এটা ১৭ বছরের আন্দোলনের ফসল। আমাদের দীর্ঘদিনের ত্যাগ-সংগ্রামের কথা ভোলা যাবে না। ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কেউ ১/১১-এর পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন, কেউ গতকালের ঘোষণাপত্রের বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন। দলের নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। আমিও এটাকে স্বাগত জানাই। তবে একটি কথা বলতে চাই, ২৩ বছরের সংগ্রামের পর যে স্বাধীনতা অর্জনের কথা বলা হয়েছে, তাতে শহীদ জিয়াউর রহমানের নাম নেই।’

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির রফিকুল আলম মজনু, উত্তর বিএনপির আমিনুল হক বক্তব্য রাখেন।

র‌্যালিতে বিএনপির আসাদুজ্জামান রিপন, আমানউল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, শাহজাদা মিয়া, লুৎফুজ্জামান বাবর, খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেলসহ কেন্দ্রীয় বিএনপির এবং অঙ্গসংগঠন ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা অংশ নেন।

গতকাল বিভিন্ন কর্মসূচির কারণে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে তীব্র যানজট দেখা দেয়। এতে নাগরিকদের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বিএনপির র‌্যালির পাশাপাশি সায়েন্সল্যাবে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়ক আটকে বিক্ষোভ করেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে পাঠানোর দাবিতে রাজধানীর বাড্ডায় সড়ক অবরোধ করেন জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) নেতাকর্মীরা। তারা ভারতীয় দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচি দিয়েছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত