চাঁদাবাজি অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ, যা সমাজের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তাকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিঘ্নিত করে। এটি শুধু ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিমণ্ডলে ক্ষতির কারণ হয় না, বরং রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও চরম বিপর্যয়, অরাজকতা, দুর্নীতি, বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনার জন্ম দেয়। বর্তমান সমাজে আমাদের দেশে চাঁদাবাজি যেন একটি স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে, যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
দোকানপাট, পরিবহন, ব্যবসা কিংবা নির্মাণ খাতসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই চাঁদাবাজির করালগ্রাস বিরাজমান। ইদানীং অফিস-আদালতেও চাঁদাবাজির মহড়া চলছে। এমনকি কোনো কৃষক জমি চাষ করতে গেলেও তার কাছ থেকে চাঁদাবাজি করার দৃষ্টান্ত রয়েছে। কাঠ ব্যবসায়ী কাঠ কিনতে গেলেও সেখানে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। আপনার বাড়িতে আপনি বিল্ডিং করবেন, তাতেও চাঁদাবাজি করা হচ্ছে, ইটের ভাটার মালিকদের কাছে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভিক্ষাবৃত্তির নামে চাঁদাবাজি করার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। কেউ নতুন কোনো দোকান দিলে সেখানেও আগে চাঁদা দিতে হচ্ছে। চাঁদা না দিলে মব সৃষ্টির মাধ্যমে পরিস্থিতি ঘোলাটে করা হচ্ছে। এমনকি পাথর নিক্ষেপ করে সোহাগ হত্যাকান্ডের মতো লোমহর্ষক ঘটনা ঘটানো হচ্ছে।
এ ধরনের ঘটনা চরম অমানবিক ও ঘৃণ্যতম। চাঁদাবাজি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও হারাম। ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে মানুষের জানমাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। এ ধর্ম অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ গ্রহণকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে এবং এর বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। কোরআন ও হাদিসে চাঁদাবাজির মতো অন্যায় ও জুলুমের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তির ঘোষণা। ইসলাম অপরাধের প্রতিকার ও প্রতিরোধের লক্ষ্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছে, তা সমাজে ন্যায়, শান্তি ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে।
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি : চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সচেতনতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের জাগরণ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এ অপরাধ সমাজের মূল ভিত্তিকে বাধাগ্রস্ত করে দেয়। মানুষকে নিরাপত্তাহীন, ক্ষুব্ধ ও হতাশায় নিমজ্জিত করে। তাই ইসলামি মূল্যবোধে অনুপ্রাণিত হয়ে আমাদের এ ধরনের জুলুম ও জুলুমবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ও সোচ্চার হওয়া অপরিহার্য।
চাঁদাবাজির ধরন : চাঁদাবাজি বলতে বোঝায় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দ্বারা জোরপূর্বক ভয়ভীতি দেখিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিংবা অবৈধ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে কারও কাছ থেকে অর্থ ও মূল্যবান আর্থিক দ্রব্য আদায় করা। এটি সরাসরি জুলুমের একটি রূপ। চাঁদাবাজি অনেক সময় ব্যক্তিগত পর্যায়ে, কখনো দলীয় মদদে, আবার কখনো কখনো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় হয়ে থাকে। আবার কখনো রাষ্ট্র বা প্রশাসনের কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত অংশের মাধ্যমেও সংঘটিত হয়।
কোরআনের নির্দেশনা : পবিত্র কোরআন জুলুম ও অন্যায়ভাবে সম্পদ আত্মসাতের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং বিচারকদের কাছে তা পৌঁছে দিয়ো না, যাতে জেনেশুনে মানুষের সম্পদের একটি অংশ অন্যায়ভাবে খেয়ে ফেলতে পারো।’ (সুরা বাকারা ১৮৮) আলোচ্য আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে নেওয়া হারাম। চাঁদাবাজির মাধ্যমে যেহেতু জোরপূর্বক সম্পদ নেওয়া হয়, তা এ নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত। অপর জায়গায় আল্লাহ বলেন, ‘যারা মানুষের ওপর জুলুম করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন করে, তাদের জন্য আছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা শুরা/৪২) চাঁদাবাজি একটি প্রকাশ্য জুলুম ও সীমালঙ্ঘন, যা সমাজে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
হাদিসের নির্দেশনা : অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রহণকে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় হারাম ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ গ্রহণ করে, সে কেয়ামতের দিন আগুন বহন করে আসবে।’ (সহিহ বুখারি) চাঁদাবাজি যেহেতু জোরপূর্বক সম্পদ গ্রহণের একটি পদ্ধতি, তাই এ হাদিস সেটার ওপরও প্রযোজ্য হবে। নবী করিম (সা.) আরও বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে প্রতারণা করবে, সে কেয়ামতের দিন তার প্রতারণা নিয়ে আসবে।’ (সহিহ মুসলিম) চাঁদাবাজরা সাধারণত প্রতারণা, হুমকি ও ভয়ভীতির মাধ্যমে টাকা আদায় করে, যা এ হাদিসের আওতায় পড়ে।
ইসলামে চাঁদাবাজির সুযোগ নেই : মানুষের জানমাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ইসলামে কঠোর আইন বিদ্যমান। ইসলামের নীতিমালায় সরকার, প্রশাসন বা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষে কোনো ব্যক্তির ওপর অবৈধ চাপ সৃষ্টি করে টাকা আদায়ের সুযোগ নেই। আবার প্রশাসনের কেউ যদি চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত হয়, তাহলে সে আমানতের খেয়ানত করছে। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই রক্ষক এবং প্রত্যেকেই তার অধীনদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।’ (সহিহ বুখারি) এ হাদিসটির বিষয়বস্তু প্রশাসনিক দায়িত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে এবং চাঁদাবাজিকে সম্পূর্ণভাবে অবৈধ প্রমাণ করে।
চাঁদাবাজির পরিণতি : ইসলামে অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রহণের পরিণতি খুবই ভয়াবহ। এতে আল্লাহর অভিশাপ ও গজব নেমে আসে। চাঁদাবাজির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হয়, জনগণের নিরাপত্তা বিঘিœত হয় এবং সামাজিক আস্থা বিনষ্ট হয়। এজন্য পরকালে কঠিন শাস্তি রয়েছে। অন্যায়ভাবে উপার্জিত সম্পদ জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে।
বর্তমান সমাজ ও চাঁদাবাজি : বর্তমান যুগে চাঁদাবাজি নানা রূপে বিস্তার লাভ করেছে। যেমন ট্রান্সপোর্ট চাঁদা, দোকানপাট থেকে মাসিক চাঁদা, বাসস্ট্যান্ড থেকে চাঁদা, টেম্পো স্ট্যান্ড থেকে চাঁদা, রিকশাচালকদের থেকে চাঁদা, বিভিন্ন দলের নামে চাঁদা, পুলিশের নামে চাঁদা ইত্যাদি। এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড স্পষ্টভাবে হারাম ও অন্যায়। এসব কর্মকাণ্ড সমাজে দুর্নীতি, দখলদারিত্ব, ভয়ভীতি ও অসাম্য সৃষ্টি করে, যা ইসলামের মৌলিক নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
চাঁদাবাজি থেকে মুক্তির পদ্ধতি : ইসলামি শিক্ষার প্রচার করা। কোরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক শিক্ষা সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে। আইন প্রয়োগ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। প্রশাসনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। জনগণের মধ্যে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। ইসলামে অপরাধ প্রতিরোধের অন্যতম পদ্ধতি হচ্ছে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান।
অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়া : চাঁদাবাজি একটি ঘৃণ্যতম সামাজিক অপরাধ। ইসলাম এ অপরাধের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছে। কোরআন ও হাদিসে এর শাস্তি ও নিন্দা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রসহ সবার উচিত এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং নৈতিকতা ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা। ইসলাম এমন একটি সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় যেখানে কারও ওপর কোনো ধরনের জুলুম বা অন্যায় চাপিয়ে দেওয়া হয় না। ফ্যাসিবাদী আচরণ করা হয় না। সুতরাং যারা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, রাহাজানি, খুন ও মব সংঘটিত করে অবৈধ অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে জনগণকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা ইমান ও ইসলামের অপরিহার্য দাবি।
