অঙ্গদান ও প্রতিস্থাপনে যা বলে ইসলাম

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৫, ০৩:১১ এএম

আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে। এক সময় যেসব রোগের চিকিৎসা অসম্ভব মনে করা হতো, এখন সেসব রোগ নিরাময়ে চিকিৎসকরা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। উন্নত সার্জারি এবং জটিল অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো বিস্ময়কর চিকিৎসা পদ্ধতির ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষ করে মৃত ব্যক্তির অঙ্গ প্রতিস্থাপন এমন এক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একজন মৃত মানুষের অঙ্গ অন্য একজন অসুস্থ মানুষের দেহে প্রতিস্থাপন করে তাকে সুস্থ জীবন ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। অন্ধ মানুষ দৃষ্টি ফিরে পাচ্ছে, কিডনির অসুস্থ রোগী নতুন জীবন লাভ করছে। উন্নত বিশ্বে এই প্রক্রিয়া বহু বছর ধরে স্বীকৃত এবং ব্যাপকভাবে প্রচলিত। বাংলাদেশসহ উপমহাদেশেও এর প্রয়োগ ক্রমে বাড়ছে, যদিও তা এখনো সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। যেমন সারাহ ইসলাম নামের এক নারীর মরণোত্তর কিডনি ও চক্ষুদান সমাজে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, মরণোত্তর অঙ্গদান কি ইসলামে অনুমোদিত?

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ, বাস্তবসম্মত ও মানবকল্যাণমুখী জীবনব্যবস্থা। এটি মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। কোরআন ও সুন্নাহর বিভিন্ন নির্দেশনায় মানবজীবন রক্ষা করা একটি মহৎ কাজ হিসেবে বিবেচিত। তবে মরণোত্তর অঙ্গদানের বিষয়টি নবী যুগের না। তাই সরাসরি কোরআন বা হাদিসে এ বিষয়ে উল্লেখ নেই। এর ফলে সমকালীন আলেমদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে। কেউ শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন দিয়েছেন, কেউ সম্পূর্ণভাবে নাকচ করেছেন।

বিশেষ করে আরব বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ফিকহি বোর্ডগুলো নির্দিষ্ট শর্তাবলি পূরণ সাপেক্ষে মরণোত্তর অঙ্গদানের অনুমোদন দিয়েছে। অপরদিকে উপমহাদেশের অধিকাংশ আলেম তা নিষিদ্ধের পক্ষপাতী হলেও কিছু আলেম যুগের চাহিদা ও মানবিক প্রয়োজন বিবেচনায় সীমিত অনুমোদনের কথা বলেছেন। মূলত এই অনুমোদন কোনোভাবেই বাণিজ্যিক উদ্দেশে বা মানব অঙ্গের ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য নয়, বরং তা কেবল মানবসেবার মানসিকতা থেকে, কঠোর শর্তের অধীনে এবং ইসলামি নীতির পরিপন্থী কোনো কাজে লিপ্ত না হওয়ার শর্তে দেওয়া হয়েছে।

তাই মরণোত্তর অঙ্গদান নিয়ে আলোচনা শুধু চিকিৎসা বিজ্ঞানের সীমায় আবদ্ধ নয়, বরং এটি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি, নৈতিকতা, মানবিকতা ও আইনগত কাঠামোর সঙ্গে। এই বিষয়টির সঠিক ইসলামি অবস্থান বোঝা জরুরি, যাতে আধুনিক চিকিৎসার সুবিধা গ্রহণ করেও আমরা শরিয়তের সীমারেখা অতিক্রম না করি এবং মানবজীবনের মর্যাদা অটুট রাখি।

জীবনের সব ক্ষেত্রে ইসলামের সুস্পষ্ট নীতিমালা ও দিকনির্দেশনা রয়েছে। মানুষের সুস্থতা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার ক্ষেত্রেও রয়েছে ইসলামের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও নীতিমালা। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ো না।’ (সুরা বাকারা ১৯৫) অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘আর যে কারও প্রাণ রক্ষা করে সে যেন সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করে।’ (সুরা মায়েদা ৩২)

ওসামা (রা.) থেকে বর্ণিত, জনৈক বেদুইন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কি চিকিৎসা গ্রহণ করব? উত্তরে তিনি বললেন, হ্যাঁ। কেননা আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি যার চিকিৎসারব্যবস্থা রাখেননি। (মুসনাদে আহমদ)

এসব আয়াত ও হাদিসের নির্দেশনা হলো, মানুষ তার সুস্থতা লাভের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে এবং তার সাধ্যের ভেতর যত ব্যবস্থাপনা সম্ভব হয় তা অবলম্বন করবে এবং অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থতা লাভের জন্য অন্যরাও এগিয়ে আসবে, সব ধরনের সহযোগিতা করবে। যারা এরূপ করবে নিঃসন্দেহে তা মানবসেবা বলে গণ্য হবে এবং এতে তারা অশেষ নেকি লাভ করবে।

তবে মরণোত্তর অঙ্গদানের বিষয়টি নিয়ে আলেমদের বেশ মতানৈক্য রয়েছে। ১৯৮৮ সালে জেদ্দায় অনুষ্ঠিত মাজমাউল ফিকহিল ইসলামি থেকে এটি জায়েজ হওয়ার সপক্ষে সম্মিলিত ফতোয়া প্রকাশিত হয়। এমনিভাবে সৌদি আরবের একাধিক ফিকহি বোর্ড এবং মিসর, কুয়েত ও জর্দানের বিভিন্ন ফিকহি বোর্ড থেকেও এটার পক্ষে সম্মিলিত ফতোয়া প্রকাশিত হয়। ১৯৬৯ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইসলামিক কনফারেন্স থেকেও জায়েজ হওয়ার ফতোয়া প্রদান করা হয়। ভারত উপমহাদেশের অধিকাংশ মুফতি নাজায়েজ হওয়ার ফতোয়াই প্রদান করেছেন। তবে কিছু সংখ্যক মুফতি যুগের চাহিদা, মানুষের প্রয়োজন এবং সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় জায়েজের ফতোয়া দিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন ‘ইসলাম ও আধুনিক চিকিৎসা’ বইয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং জায়েজ হওয়ার কথা বলেছেন।

উল্লেখ্য, যারা জায়েজ বলেছেন তারাও ব্যাপকভাবে নয় এবং সীমিত পরিসরে বিশেষ প্রয়োজনে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে জায়েজের কথা বলেছেন। সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়েও কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, এই ফতোয়াকে পুঁজি করে মানব অঙ্গের ক্রয়-বিক্রয়ে জড়িত হওয়া, এটাকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়া, মানব পাচার ও লাশ চুরির মতো জঘন্য ও গর্হিত কাজে লিপ্ত হওয়া সম্পূর্ণ হারাম হবে। যে চক্র এ কাজে জড়িত হবে পরকালে মহান আল্লাহর দরবারে তাদের কঠিন জবাবদিহি করতে হবে। তাই এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মহলকে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে কঠোর আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। অঙ্গদান ও প্রতিস্থাপন জায়েজ হওয়ার জন্য ইসলামি স্কলাররা বেশ কিছু শর্তারোপ করেছেন। সেগুলো উল্লেখ করা হলো। এক. অঙ্গ প্রতিস্থাপন ছাড়া সুস্থ হওয়া অসম্ভব, এ কথা অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পক্ষ থেকে আসতে হবে। দুই. অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর রোগী সুস্থ হয়ে যাবে, সেটার নিশ্চয়তা বা প্রবল ধারণা থাকতে হবে। তিন. মুসলিমের অঙ্গ অমুসলিমের শরীরে, তদ্রুপ অমুসলিমের অঙ্গ মুসলিমের শরীরে প্রতিস্থাপন থেকে যথাসাধ্য বিরত থাকতে হবে। চার. মৃত ব্যক্তি কর্র্তৃক মৃত্যুর আগে লিখিত অনুমতি দিয়ে যেতে হবে। অবশ্য অপারগ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির বৈধ ওয়ারিশদের অনুমতি যথেষ্ট গণ্য হবে। পাঁচ. অঙ্গ নেওয়ার জন্য দেহের মূল কাঠামো বিকৃত করা যাবে না। ছয়. দাফনের আগেই অঙ্গ নিতে হবে। সাত. অঙ্গ সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে দিতে হবে।

উল্লিখিত শর্তগুলো জীবিত ও মৃত উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। জীবিত ব্যক্তি থেকে অঙ্গ নেওয়ার জন্য এ ছাড়া আরও চারটি শর্ত আবশ্যক। সেগুলো উল্লেখ করা হলো। এক. অঙ্গদান করার কারণে তার স্বাস্থ্য বড় ধরনের কোনো ঝুঁকির সম্মুখীন না হওয়া। দুই. এমন কোনো অঙ্গ দান করা যাবে না, যার ওপর মানুষের জীবন নির্ভর করে, যেমন হৃদয়, উভয় কিডনি ইত্যাদি। তিন. এমন অঙ্গ দেওয়া যাবে না, যার কারণে মানুষ তার কোনো একটি মৌলিক যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। সুতরাং উভয় চোখ দান করা যাবে না। চার. শুধু এমন অঙ্গ দান করা যাবে, যার ব্যাপারে অভিজ্ঞ চিকিৎসক আশ্বস্ত করবেন যে ওই অঙ্গ ছাড়া সে সুস্থভাবে জীবনযাপন করতে পারবে। অঙ্গ প্রতিস্থাপন শর্ত সাপেক্ষে বৈধ হওয়ার পক্ষে যারা মত দিয়েছেন, তারা এটাও বলেছেন যে, যথাসম্ভব এই পদ্ধতি এড়িয়ে চলা আবশ্যক। (ফাতাওয়া ওসমানি ৪/২২৩-২২৬, মাজাল্লাতুল মাজমায়িল ফিকহিদ দুয়ালি ১/৮৯, দারুল ইফতা, দারুল উলুম করাচি ১৭/১৮৬৩)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত