সফল হওয়ার আগে সবাইকেই ব্যর্থতা মোকাবিলা করে আসতে হয়। ব্যর্থতার ছাই থেকে যারা ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠতে পারে সাফল্য তাদেরই পদচুম্বন করে। ব্রিটিশ লেখিকা জোয়ান ক্যাথলিন রাওলিং (জে কে রাওলিং) যিনি হ্যারি পটার সিরিজের জন্য দুনিয়াজোড়া খ্যাতি পেয়েছেন তিনি তেমনি এক ফিনিক্স পাখি। তার জীবন হতে পারে তরুণদের অনুপ্রেরণার উৎস। লিখেছেন এবিএম সিয়াম আহমেদ
জীবনের কঠিন সময়
তারুণ্যের সূচনালগ্নে মায়ের মৃত্যুতে রাওলিংয়ের জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহ ভেঙে যাওয়ায় সন্তানকে নিয়ে তিনি হয়ে যান একা। কোনো সঞ্চয় ছিল না, বাস করতেন ছোট এক ফ্ল্যাটে। অনেক সময় না খেয়েই কাটাতে হয়েছে। সন্তানের খাবার জোগাড় করাটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও নিজের স্বপ্ন ছাড়েননি। তবুও লেখক হওয়ার স্বপ্ন ছাড়েননি।
প্রত্যাখ্যানের ধাক্কা
প্রথম বই Harry potter and philosopher’s stone শেষ করার পর রাওলিং একের পর এক মোট ১২টি প্রকাশনী থেকে প্রত্যাখ্যাত হন। সবার বক্তব্য ছিল ‘এই বই বাজারে চলবে না’। তবুও তিনি থেমে যাননি। তিনি জানতেন তার এই গল্পের ভেতর এমন এক জাদুর শক্তি আছে, যা একদিন মানুষের হৃদয় জয় করবেই।
সাফল্যের শুরু
দীর্ঘদিনের প্রত্যাখ্যান আর হতাশা শেষে অবশেষে ১৯৯৭ সালে লন্ডনের এক ছোট্ট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান Bloomsbury সাহস নিয়ে প্রকাশ করে Harry potter and the philosopher’s stone. প্রথম সংস্করণে ছাপা হয় ৫০০ কপি তার মধ্যে ৩০০ কপি পাঠানো হয় স্কুল লাইব্রেরিতে। তখন কেউ-ই কল্পনা করতে পারেনি, এই বইটি বিশ^ জুড়ে সমাদৃত হবে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই হ্যারি পটারের গল্প শিশু-কিশোরসহ সবার মন জয় করে। আর রাওলিংয়ের জীবনে শুরু হয় সাফল্যের নতুন এক অধ্যায়।
বিশ্বজোড়া খ্যাতি
তার লেখা অনুবাদ হয়েছে ৫০টিরও বেশি ভাষায়। ২০০৭ সালের ২১ জুলাই বিশ্বব্যাপী প্রকাশিত হয় হ্যারি পটার সিরিজের সর্বশেষ খ- হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ডেথলি হ্যালোজ। এই বইটি প্রথম ২৪ ঘণ্টায় সর্বাধিক বিক্রীত হিসেবে নাম লেখায় গিনেজ বুকে। কেবল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি এই তিন দেশের বাজার মিলিয়েই প্রথম ২৪ ঘণ্টায় বইটি বিক্রি হয় ১ কোটি ১০ লাখ কপিরও বেশি! প্রকাশনা জগতের ইতিহাসে প্রথম ২৪ ঘণ্টায় সর্বাধিক বিক্রিতে বই এটি। এ ছাড়াও এই বইয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয় ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র সিরিজ, যা বিশ্বব্যাপী তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। এক সময় যিনি খাবারের টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতেন, সেই রাওলিং হয়ে ওঠেন বিশ্বের অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী লেখক।
সাফল্য লাভে জে কে রাওলিংয়ের দশ পরামর্শ
ব্যর্থতা থেকে নিজেকে আবিষ্কার করা যায় : জে কে রাওলিং প্রায় ১২ জন প্রকাশক তার লেখা ফিরিয়ে দেওয়ার পরও তিনি হাল ছাড়েননি। রাওলিং বলেন, একাগ্রতা ও ধৈর্য থাকলে পছন্দের জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব এটিই তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
শুধু ভাবলে চলবে না : জে কে রাওলিং মনে করেন, শুধু ভাবনায় আটকে না থেকে তা কাজে রূপ দিতে হবে। একদিন ট্রেনের জন্য অপেক্ষার সময় হ্যারি পটারের ঘটনা মাথায় আসতেই তিনি লিখে রাখেন। পরের পাঁচ বছর ধরে সেই ভাবনাকে উপন্যাসে রূপ দেন।
সমালোচনার জন্য তৈরি থাকুন : হ্যারি পটার যেমন তুমুল প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি সমালোচিতও হয়েছে। লেখিকা এই সমালোচনা সহজভাবে নিয়েছেন।
শেকড়ের কথা মনে রাখুন : একটি তথ্যচিত্র দেখা যায়, নিজের পুরনো ঠিকানায় (যে বাড়িতে বসে তিনি হ্যারি পটার লিখেছিলেন) ফিরে আবেগপ্রবণ হয়ে রাওলিং কাঁদছেন। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী লেখক হওয়া সত্ত্বেও শুরুর দিনগুলো তিনি ভুলে যাননি।
আত্মবিশ্বাস হারালে চলবে না : ‘এটা অনেক বড়।’ এই অভিযোগে প্রকাশকরা বারবার ফিরিয়ে দিয়েছেন হ্যারি পটারের পা-ুলিপি। কিন্তু রাওলিং তার বিশ্বাসে অনড় ছিলেন।
দিন শুরু হোক খুব সকালে : জে কে রাওলিং চেষ্টা করেন যতটা সম্ভব দিনটা তাড়াতাড়ি শুরু করা যায়। তার মতে, সকালে কাজ শুরু করলে সময় সবচেয়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়।
আপনার জীবনের দায়িত্ব আপনারই : রাওলিং বলেন, আপনি যখন নিজের জীবনের চালকের আসনে বসবেন, তখন সব দায়িত্বও আপনারই হবে। দায়িত্ব নিতে শিখলেই সফল হওয়ার তাগিদ জন্মায়।
বেঁচে থাক কল্পনা : জে কে রাওলিং বিভিন্ন বক্তৃতায়, লেখায় সবসময় কল্পনাশক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, অসম্ভব কোনো কিছুকে অর্জন করতে হলে আগে কল্পনাপ্রবণ হতে হয়।
জীবনের গল্প ভালো হতে হবে : জে কে রাওলিংয়ের মতে, জীবন হলো একটা গল্পের মতো। গল্পটা কত বড়, তাতে কিছু যায় আসে না। বরং গল্পটা কতখানি ভালো, দিন শেষে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
যা ভালোবাসেন, তা-ই করুন : ‘আমার খুব সৌভাগ্য, আমি যা সবচেয়ে ভালোবাসি, সেটাই আমার কাজ। সবসময় জানতাম, আমি একজন লেখকই হতে চাই।’ বলছেন জে কে রাওলিং। যা ভালোবাসেন, তা নিয়ে কাজ করলে আপনি নিজের সেরাটা দিতে পারবেন।
লেখক : শিক্ষার্থী, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
