‘কোমায়’ সহস্রাধিক তদন্ত প্রতিবেদন

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৫, ০৭:২২ এএম

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি খুন হন ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি, রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে। পুলিশ ও র‌্যাবসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এ হত্যাকা-ের তদন্ত করেছে। এখন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত করছে। কিন্তু ১৩ বছর ৬ মাসেও কোনো তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। কোমায় আছে তথা হিমঘরে আটকা পড়েছে সংস্থাগুলোর তদন্ত প্রতিবেদন।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ১ হাজার ১৩৬ জনের মৃত্যু ঘটে। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করলেও আজও প্রকাশ্যে আসেনি তদন্ত প্রতিবেদন। পুরান ঢাকার নিমতলীতে আগুনের ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনও জনসমক্ষে আসেনি। এমনই আলোচিত প্রায় সহস্রাধিক মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ‘কোমা’য় রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও বর্তমান সরকার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করার উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি বর্তমান সরকারের আমলে আলোচিত একাধিক ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনও আলোর মুখ দেখছে না। সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আলোচিত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের অপেক্ষায় থমকে আছে। মামলাগুলোর তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও তদন্ত শেষ হয় না বা চার্জশিট দেওয়া হয় না। আবার যেসব মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হচ্ছে, তার বিবরণ ভুক্তভোগীসহ কেউ জানতে পারছে না। তদন্তে কারা দোষী, কারা নির্দোষ অথবা এসবের মাস্টারমাইন্ড, গডফাদার কারা তা জানা যাচ্ছে না; ঘটনার রহস্য উদঘাটন হয়েছে কি না, তাও কেউ জানতে পারছে না। ২০০৩ সালের ৮ জুলাই ভয়াবহ লঞ্চ দুর্ঘটনায় (এমভি নাসরিন) ৩৬ শিশুসহ চার শতাধিক যাত্রীর প্রাণহানি ঘটেছিল। এ ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি হয়েছিল। ২০০০ সালের ২৯ ডিসেম্বর মেঘনায় রাজহংসী-জলকপোত দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি করা হয়। দুটি ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জমা হলেও জানা যায়নি প্রতিবেদনে কী আছে। ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধকে কেন্দ্র করে যে সহিংসতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল, সেগুলোর বিরুদ্ধে সারা দেশে ৮৩টি মামলা হয়েছিল; মাত্র ২২টি মামলার অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোর তদন্ত ঝুলে আছে। ওই সময়ের একাধিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে কী আছে কেউ জানতে পারেনি।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নানা কারণে আলোচিত মামলাগুলোর তদন্ত রিপোর্ট আলোর মুখ দেখে না। কিছু দিকনির্দেশনা থাকায় আমরা এসব প্রতিবেদন দিতে পারি না, শুধু আদালতে পাঠানো হয়। প্রতিবেদনে কী থাকে, তা জানার অধিকার আছে ভুক্তভোগীদের।’ তিনি বলেন, ‘আলোচিত ঘটনার সহস্রাধিক মামলা আছে যার তদন্ত প্রতিবেদন যে কোমায় আছে, তা সত্য। আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে অনেক ঘটনা আছে সেখানে বড় বড় রাঘববোয়াল সম্পৃক্ত। ফলে জনরোষের ভয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি। বর্তমান সরকার ইচ্ছা করলে নির্দেশনা জারি করতে পারে, যে ঘটনাই ঘটুক না কেন তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে আনতে হবে। তাতে অপরাধ অনেকাংশে কমবে বলে মনে করছি। সাংবাদিক দম্পতি সরওয়ার ও রুনি হত্যাকা-ের ঘটনায় থানা পুলিশ, ডিবি, র‌্যাবসহ এমন কোনো সংস্থা নেই যারা তদন্ত করেনি। তদন্তে অনেকের নাম থাকায় প্রতিবেদন কাউকে জানানো হয়নি। আলোর মুখ আর দেখবে কি না সন্দেহ। অন্য মামলাগুলোরও একই অবস্থা।’

পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (অপারেশন) রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনা ঘটলে তদন্ত করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়। ভুক্তভোগীরা তদন্ত প্রতিবেদনে কী আছে, তা জানতে পারেন। তারা তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। কেউ যদি সহায়তা না করে তাহলে পুলিশে অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পুলিশ সূত্র জানায়, আলোচিত মামলাগুলোর তদন্ত করতে গিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তারাও রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপের শিকার হন। এতে তদন্ত প্রতিবেদন সঠিকভাবে করা যায় না। অনেক সময় তদন্তকারী কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক সহায়তার অভাব থাকছে। আবার তারা সঠিক পদ্ধতিতে আলামত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। একজন তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে অনেকগুলো মামলার দায়িত্ব থাকার কারণে নির্দিষ্ট মামলার পেছনে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেক সময় প্রভাবশালী মহলের চাপে তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয় অথবা ইচ্ছে করে তদন্তকে ঝুলিয়ে রাখতে বাধ্য করা হয়। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় কিছু ফাঁকফোকর থাকছে, যা অভিযুক্তদের পক্ষে চলে যাচ্ছে। দুর্বল তদন্তের কারণে ৮০ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে যাচ্ছে। এসব বিষয় শুধু ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকেই হতাশ করে না, বরং পুরো বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়। সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য তদন্ত প্রক্রিয়ার দুর্বলতাগুলো দূর করা ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু আলোচিত ঘটনার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। এ কারণে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে কোনো তথ্য জানানো যাচ্ছে না। এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। প্রভাবশালী মহল তদন্তের ফল নিজেদের সুবিধানুযায়ী প্রভাবিত করে। এ কারণেও বিচার প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা কমছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির নীতিও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা সময়ের দাবি বলে তদন্তকারী কর্মকর্তারা মনে করছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, গণপিটুনি, চাঁদাবাজি, দখল, রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা ও ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে টার্গেট করে পরিকল্পিতভাবে ‘মব সন্ত্রাস’ সৃষ্টি করা হচ্ছে। লুটপাট ও হত্যায় ব্যবহার করা হচ্ছে বিক্ষুব্ধ জনতার ‘মব’ ফাঁদ। আর সুবিধাভোগীরা আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। সম্প্রতি কুমিল্লার মুরাদনগরে চুরির অভিযোগে মা, ছেলে ও মেয়েকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গাজীপুরে হৃদয় নামের এক যুবক, ঢাকায় আল-আমিন এবং সিরাজগঞ্জে এক মানসিক প্রতিবন্ধীসহ ছয়জন এমন সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন। এসব ঘটনার তদন্ত হলেও প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজির লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছে না। দুর্বৃত্তরা প্রকাশ্যে বর্বরতা চালিয়ে মানুষকে হত্যা করতে দ্বিধা করছে না। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ চাঁদাবাজদের কাছে জিম্মি। অনেকে ভয়ে মুখ ফুটে পুলিশের কাছেও অভিযোগ করতে পারছে না। গত ৯ জুলাই পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালসংলগ্ন সড়কে প্রকাশ্যে দুর্বৃত্তরা মো. সোহাগ ওরফে লাল চাঁদ নামের এক ব্যবসায়ীকে বর্বরভাবে হত্যা করে। গত ২৮ মে ঢাকার মিরপুরে নাজমুল হাসান পাপ্পু ও দোলনা নামের এক দম্পতিকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়। ৮ মে রাজধানীর বাড্ডায় ঠিকাদার আনোয়ার হোসেন, ১৫ মে একই থানার গুদারাঘাট এলাকায় বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুল আহসান সাধনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জানতে পারছেন না ভুক্তভোগীরা।

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, গত ১৫ বছরে সারা দেশে ১৬ হাজারের বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। ১ হাজার ৫৯০ জন প্রাণ হারিয়েছে। অগ্নিকাণ্ড হলেই তদন্ত কমিটি হচ্ছে। অথচ কমিটিগুলোর প্রতিবেদন জনসমক্ষে আসেনি, এমনকি আদালতেও দাখিল করা হয় না বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০১০ সালে পুরান ঢাকার নিমতলীতে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। একই পরিবারের ১১ জন মারা যান। নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের পর সরকারি পর্যায়ে গঠিত সব তদন্ত কমিটি এলাকার রাসায়নিক মজুদ দুর্ঘটনার প্রধান কারণ উল্লেখ করে এবং পুরান ঢাকার সব আবাসিক ভবন থেকে রাসায়নিক দোকান-কারখানা-গুদাম উচ্ছেদের সুপারিশ করলেও প্রতিবেদনে আরও কী তথ্য ছিল, তা আজও জানা যায়নি। চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে ৭১ জনের প্রাণহানির ঘটনায়ও তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত