কাগজেই আটকে রাজনীতি নিষিদ্ধের নির্দেশনা

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৫, ০৭:২৯ এএম

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হলেও বর্তমানে ক্যাম্পাস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উন্মুক্ত মাঠে পরিণত হয়েছে। কাগজে-কলমে রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও বাস্তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। ছাত্র সংগঠনগুলো প্রশাসনের নাকের ডগায় অবাধে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাদের দেখাদেখি কর্মচারীরাও রাজনৈতিক কার্যক্রমে জড়িত হচ্ছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে।

গত বছর ১১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৫তম সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠন ও পেশাজীবী সংগঠনের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নিষিদ্ধ ঘোষণার এক বছর না পেরোতেই ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কার্যক্রম পুনরায় জোরালোভাবে শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে এখনো কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

পেশাজীবী সংগঠনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও সম্প্রতি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়তাবাদী কর্মচারী পরিষদ নামে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন ড্রাইভার মামুন শেখ এবং সদস্য সচিব হিসেবে সিকিউরিটি গার্ড জাকির মৃধা।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলো সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গত ২৯ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই কীর্তনখোলা হলরুমে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল তাদের কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে কর্মী সম্মেলন আয়োজন করে। এ সম্মেলনের সময় হলরুমের কয়েকটি চেয়ার ভাঙার ঘটনাও ঘটেছে।

রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ছাত্রদল নেতা মোশারফ হোসেন জীবনানন্দ দাশ কনফারেন্স হল ব্যবহারের জন্য আবেদন করেছিলেন। প্রশাসন অনুমোদন না দিলে তারা জোরপূর্বক কীর্তনখোলা অডিটরিয়াম ব্যবহার করে সম্মেলন করেন। নিষিদ্ধ ক্যাম্পাসে নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় ছাত্র সংগঠনটি এ সম্মেলনের আয়োজন করে।

এ ছাড়া, তারা নিয়মিত নবীন শিক্ষার্থীদের মধ্যে কলম, ফুল এবং বিএনপির ৩১ দফা দাবি সংবলিত লিফলেট বিতরণ, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে চিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা সভা, বিজয় দিবসে র‌্যালি ও মিছিল, বিভিন্ন ইস্যুতে বিক্ষোভ মিছিল এবং অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে।

ইসলামী ছাত্রশিবিরও তাদের ব্যানারে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ‘৩৬ জুলাই’ উপলক্ষে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে মিল রেখে সাইকেল র‌্যালি, বৃক্ষরোপণ, মিলাদ মাহফিল, ঈদুল আজহায় শিক্ষার্থীদের ভোজ এবং ভর্তি সহায়তা ডেস্ক বসানোসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে তারা।

গত ২২ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল তাদের ব্যানারে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে গণভোটের আয়োজন করে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে টিএসসিতে একাধিক প্রোগ্রাম আয়োজন করেছে।

নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) কোনো কমিটি না থাকলেও পদপ্রত্যাশীরা ক্যাম্পাসে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন নম্বর গেটের সামনে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের পদপ্রত্যাশী রাশেদুল ইসলাম এনসিপির একটি বড় ব্যানার সাঁটিয়েছেন।

ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিয়ে প্রতিবেদক অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা জানান, শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু এক বছর না ঘুরতেই ছাত্র সংগঠনগুলো নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা দুঃখজনক। তারা রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকায় দেখতে চান।

শিক্ষার্থীরা বলেন, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিষেধাজ্ঞা তুলে আইনি অনুমোদন নিয়ে কার্যক্রম চালানো উচিত। প্রশাসনের নীরব ভূমিকাকে তারা রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর কাছে অসহায়ত্বের বহিঃপ্রকাশ মনে করেন। তারা জানান, গত ১৫ বছরে ছাত্রলীগের কাছে প্রশাসন যেমন অসহায় ছিল, এখনো ছাত্র সংগঠনগুলোর কাছে তেমনই অসহায়। না হলে প্রশাসন নাকের ডগায় এমন রাজনৈতিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করত না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরেবাংলা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আসিফ বিল্লাহ বলেন, ‘রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও ছাত্র সংগঠনগুলো কীভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে?’ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার বিষয়ে প্রশাসনের নীরব ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি প্রশাসনকে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করার দাবি জানান।

বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি মেহেদী হাসান সোহাগ বলেন, ‘বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলেও ক্যাম্পাসে অবাধে রাজনীতির চর্চা চলছে। ছাত্রশিবির, ছাত্রদল, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলসহ সব রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন নীরব থেকে কোনো নজরদারি করছে না, যা ১১ আগস্ট ২০২৪-এর ঘোষণার পরিপন্থী। এ বিষয়ে প্রশাসনের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

ববি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি পদপ্রত্যাশী মো. সিহাব বলেন, ‘রাজনীতি আমার সাংবিধানিক অধিকার। যারা এই অধিকার খর্ব করবে, তাদের চিহ্নিত করা হবে। গুপ্ত বা সুপ্ত যাই হোক, প্রতিটি অন্যায়ের বিচার হবে, ইনশাআল্লাহ।’

গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সাবেক আহ্বায়ক সুজয় বিশ্বাস শুভ বলেন, ‘ক্যাম্পাসে রাজনীতি করতে চায় এবং যারা করতে চায় না, উভয়ের জন্যই সুযোগ থাকা উচিত। কেউ যেন কারও ওপর নিপীড়ন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। অগণতান্ত্রিকভাবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা ঠিক হয়নি।’

ববি শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে চিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা করা উচিত। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীবান্ধব ছাত্ররাজনীতি থাকা উচিত। শিক্ষকদের অপরাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিত প্রথমে। সৃজনশীল ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে গবেষণাবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তোলা উচিত।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক ড. রাহাত হোসাইন ফয়সাল বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবিতে গত বছর সিন্ডিকেটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ নেই। যারা এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করছে, তাদের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. মুহসিন উদ্দীন বলেন, ‘রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় এমন কার্যক্রমে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।’ ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে প্রক্টর ও উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম বলেন, ‘রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তবে রাজনৈতিক কার্যক্রম চললেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না এ প্রশ্নে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত