গ্লোবাল ব্যাংকিং জায়ান্ট এইচএসবিসি বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর ব্যাংকের কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ছাঁটাই হতে পারে প্রায় তিনশ ব্যাংক কর্মকর্তা। সূত্র জানিয়েছে, ইতিমধ্যে রিটেইল ব্যাংকিংয়ে কর্মরত প্রত্যেক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাদা মিটিং করে বাধ্যতামূলক অবসরকালীন ক্ষতিপূরণ প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।
ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা। গ্লোবাল ব্যাংক হলেও, বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী প্রত্যেক কর্মকর্তাকে ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিদায় করতে চাচ্ছে এ বহুজাতিক ব্যাংকটি। অথচ বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৈশ্বিক মানদ- অনুযায়ী ভালো ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নজির রয়েছে ব্যাংকটির।
এইচএসবিসি ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বিদেশি এ ব্যাংকটি রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে গত ৩০ জুলাই। এখন ব্যাংকটি রিটেইল ব্যাংকিংয়ে নতুন কোনো ক্লায়েন্ট ডিল করবে না। পুরনো যারা আছেন, তাদের সঙ্গে সব ধরনের কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলতে চায় আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে। তবে এ প্রক্রিয়া শেষ হতে আগামী মার্চ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ছাঁটাই করার পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কী ধরনের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে, তা নিয়ে দেন-দরবার শুরু করেছে ব্যাংকটি।
ইতিমধ্যে রিটেইল ব্যাংকিংয়ে কর্মরত অধিকাংশ কর্মকর্তার সঙ্গে আলাদা আলাদা মিটিং করেছে এইচএসবিসি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। সবাইকেই বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী ছাঁটাই করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এইচএসবিসি গ্রুপ এবং বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থাপনা টিম তাদের প্রতি চরম উদাসীনতা, অপেশাদারিত্ব প্রদর্শন করছে। বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৩০ জুলাই। ওইদিন খুব ভোরে ই-মেইলের মাধ্যমে স্থানীয় কর্মীরা রিটেইল ব্যাংকিং বন্ধের খবর পান। এরপর এইচএসবিসি বাংলাদেশের সিইও মাহবুব-উর-রহমানের নেতৃত্বে একটি অভ্যন্তরীণ মিটিং হয়। কিন্তু ওই সভা কর্মীদের মধ্যে স্বচ্ছতা আনার বদলে দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘কীভাবে গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়া হবে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা না জানিয়েই রিটেইল ব্যাংকিং বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি তাদের ভবিষ্যৎ, ক্ষতিপূরণ বা কর্মজীবনের সহায়তাসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি।’
ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের দাবির মুখে ব্যাংকের মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগ প্রতিটি কর্মীর সঙ্গে আলাদা আলাদা সেশন শুরু করে। এখন পর্যন্ত ২২৭ জনের বেশি কর্মীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কর্মীরা জানিয়েছেন, যে ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ প্রস্তাব করা হয়েছে, তা অতীতে ছোট পরিসরে কর্মী ছাঁটাইয়ে যা দেওয়া হতো তার চেয়েও অনেক কম। অথচ অনেক কর্মকর্তা কম সুদে ব্যাংক ঋণ নিয়ে বাড়ি করেছেন বা ফ্ল্যাট কিনেছেন। যাদের চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে তাদের এ ঋণ পরিশোধ করতে হবে। চাকরি গেলে এ বিশাল অঙ্কের ঋণ কীভাবে শোধ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কর্মীরা।
অন্য এক ব্যাংক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিল, আমরা কীভাবে নতুন চাকরি খুঁজব যখন আমাদের বরখাস্তের খবর আগে থেকেই প্রকাশ করা হয়েছে?’
বাংলাদেশে ২০১১-১২ সালে প্রায় ১০০ জনের মতো কর্মকর্তাকে ছাঁটাই করেছিল এইচএসবিসি বাংলাদেশ। তখন তাদের দুটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তারা এইচএসবিসির অন্য কোনো সেকশনে চাকরি করতে পারেন অথবা পাঁচ বছরের বেতনের সমপরিমাণ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে পেতে পারেন। তখন যার যেটা পছন্দ হয়েছে, তা বেছে নিয়েছেন। এবার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। ব্যাংক তার নিজের স্বার্থে শ্রম আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ প্রস্তাব করছে।
গত বছরের শেষদিকে শ্রীলঙ্কায় রিটেইল ব্যাংকিং বন্ধ করে দেয় এইচএসবিসি। সেখানেও কর্মকর্তাদের একটি ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে এ বছরের শুরুর দিকে। তাদের সাত বছরের একটি প্যাকেজ প্রস্তাব দেওয়া হয়, যেখানে ছিল চার বছরের বেতনের সমপরিমাণ টাকা এবং তিন বছরের চাকরির নিশ্চয়তা। ব্যাংক বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি গ্লোবাল ব্যাংক তার স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী এমন বিষয়গুলোর সুরাহা করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং বন্ধ করে কর্মকর্তাদের ক্ষতিপূরণের যে প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে, তা দেখে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে বাংলাদেশি কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশি কর্মীদের ক্ষতিপূরণের প্যাকেজ ঠিক করতে ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান নাজিকা ইমাম, সিএফও জিগনেস চেতন রুপারেল, সিআরও চন্দ্র বাল গোস্বামী এবং সিইও দেবেশ মাথুর কাজ করেছেন। এইচএসবিসি বাংলাদেশের সিইও মাহবুব-উর-রহমান বিজনেসের সব বিষয়ে রিপোর্ট করেন এইচএসবিসি ইন্ডিয়ার সিইও হিতেন্দ্র দেবের কাছে।
এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাহবুব-উর-রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না বলে জানান। তবে তিনি জনসংযোগ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরে জনসংযোগ বিভাগে চারটি বিষয়ে প্রশ্ন করলে যথাযথ উত্তর দেয়নি তারা। জনসংযোগ বিভাগ প্রত্যুত্তরে জানিয়েছে, ‘রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধের প্রক্রিয়াটি পর্যায়ক্রমে ছয় থেকে আট মাসে সম্পন্ন করা হবে। আমরা কর্মীদের প্রদেয় সুবিধাদি বা ক্ষতিপূরণ সম্পর্কিত তথ্য শেয়ার করি না।’
