মানুষ দুর্বলতার কারণে গুনাহ ও ভুলত্রুটি করে ফেলে। আল্লাহ নিজেই কোরআনে ঘোষণা করেছেন, মানুষকে তিনি দুর্বল করে সৃষ্টি করেছেন। সেই দুর্বলতা থেকেই মানুষ শয়তানের কুমন্ত্রণা ও নফসের প্রবল টানে অনেক সময় সীমা লঙ্ঘন করে বসে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, সে আল্লাহর দয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। বরং গুনাহ করার পর মুমিন হৃদয়ে যে কষ্ট, অনুশোচনা ও অপরাধবোধ অনুভব করে, সেটিই প্রমাণ করে তার অন্তরে ইমান বিদ্যমান। কেননা কেবল মুমিনই গুনাহের পর দুঃখবোধে আচ্ছন্ন হয়, গাফেল মানুষ তাতে উদাসীন থাকে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে এ সত্য সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছে, যখন নেক আমল কারও হৃদয়ে আনন্দ আনে এবং গুনাহ তাকে কষ্ট দেয়, তখন সে প্রকৃত মুমিন। গুনাহের পর যে অস্বস্তি ও আত্মগ্লানি তৈরি হয়, সেটি আসলে আল্লাহভীতি এবং ইমানি সংবেদনশীলতারই প্রকাশ। এই অবস্থায় বান্দা হতাশ না হয়ে বরং আশার দ্বার খুলে আল্লাহর রহমতের দিকে ধাবিত হয়। সে জানে, আল্লাহ গাফুরুর রহিম, তার দরবারে অনুতপ্ত কান্না কখনো বৃথা যায় না। ইসলাম মানুষের এই দুর্বলতাকে অবহেলা করেনি। বরং ক্ষমা প্রার্থনার দ্বার সর্বদা খোলা রেখে বান্দাদের আশার আলো দেখিয়েছে।
গুনাহের পর কষ্ট পাওয়া মুমিনের ইমানি বৈশিষ্ট্য। হজরত আবু উমামা (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইমান কী, হে আল্লাহর রাসুল! (অর্থাৎ আমি কীভাবে বুঝব যে, আমার মধ্যে ইমান আছে?)’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘যখন তোমার নেক আমল তোমাকে আনন্দিত করবে এবং তোমার গুনাহ তোমাকে কষ্টে নিপতিত করবে (গুনাহের কারণে তুমি কষ্ট পেতে থাকবে), তাহলে (বুঝবে) তুমি মুমিন।’ (মুসনাদে আহমদ)
এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, গুনাহ করার পর আত্মগ্লানি, কষ্ট ও অনুশোচনা অনুভব করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এটি হৃদয়ে আল্লাহভীতি এবং তার আদেশ-নিষেধের প্রতি শ্রদ্ধার ইঙ্গিত বহন করে। ‘কেন গুনাহে জড়ালাম, কীভাবে পরিত্রাণ পাব’, এই কষ্ট থেকে মুমিন একপর্যায়ে পবিত্র হয়ে আল্লাহর কাছে সেজদায় লুটিয়ে পড়েন। ক্ষমা পাওয়ার ব্যাকুলতায় ইস্তেগফারে অশ্রুসিক্ত হন। আর তখনই গাফুরুর রাহিমের (অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু) ক্ষমার সাগরে ঢেউ খেলে যায় এবং বান্দার সব গুনাহ ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেন।
আবু বকর সিদ্দিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম যখন কোনো গুনাহ করে ফেলে, অতঃপর অজু করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে এবং উক্ত পাপের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, তখন আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।’
এরপর নবীজি (সা.) এই প্রসঙ্গে দুটি আয়াত তেলাওয়াত করেন। এক. ‘যে ব্যক্তি কোনো মন্দ কাজ করে ফেলে বা নিজের প্রতি জুলুম করে বসে, তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, সে অবশ্যই আল্লাহকে অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালুই পাবে।’ (সুরা নিসা ১১০) দুই. ‘তারা সেই সব লোক, যারা কখনো কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে বা (অন্য কোনোভাবে) নিজেদের প্রতি জুলুম করলে, সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার ফলে নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।’ (সুরা আলে ইমরান ১৩৫)
হাদিস ও কোরআনের আয়াতগুলো অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করে যে, গুনাহ করার পর অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং ক্ষমা চাওয়া বান্দার জন্য ক্ষমার দুয়ার খুলে দেয়। মহান আল্লাহ তার বান্দাদের তওবা কবুল করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকেন।
গুনাহের পর ব্যথিত হওয়া, আল্লাহর কাছে অশ্রুসিক্ত হয়ে ক্ষমা চাওয়া মুমিনের ইমানের দৃঢ়তার প্রতীক। এই প্রক্রিয়াই তাকে ক্রমে পরিশুদ্ধ করে এবং তাকওয়ার পথে এগিয়ে দেয়। তাই গুনাহের পর হতাশা নয়, বরং আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনই একজন বিশ্বাসীর শ্রেষ্ঠ ফায়দা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে অনুতপ্ত হয়ে তার কাছে ফিরে আসার এবং ক্ষমা লাভের সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।
