খসড়ার অনুমোদন উপদেষ্টা পরিষদে

গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৫, ০৬:১২ এএম

গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যেখানে এটিকে চলমান অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন হয়। সভায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সভাপতিত্ব করেন। পরে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমির সভাতে আলোচ্য এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্রিফ করেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

প্রেস সচিব জানান, এদিন প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকা বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম না থাকায় দেশের তিনটি স্থলবন্দর বন্ধ ও একটি স্থলবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। এ ছাড়া প্রতি বছর ১৭ অক্টোবর তারিখে ‘লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস’ “ক” শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে উদযাপনের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ।

গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ : উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই অধ্যাদেশ আরও অধিকতর পর্যালোচনা শেষে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে। প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশ গত বছরের ২৯ আগস্ট জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত “ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অব অল পার্সনস ফ্রম এনফোর্সড ডিজএপিয়ারেন্স”-এ যুক্ত হয়। ওই কনভেনশনের আলোকে এবং সংবিধানে সংরক্ষিত জীবন ও ব্যক্তির স্বাধীনতার অধিকার কার্যকর করার উদ্দেশ্যে গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশটির খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘গুমসংক্রান্ত কমিশনের মতামতের ভিত্তিতে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ব্লাস্ট, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অন্যান্য মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা থেকে প্রাপ্ত মতামত বিবেচনায় নিয়ে এবং আইন ও বিচার বিভাগের দুটি মতবিনিময় সভা থেকে প্রাপ্ত মতামত ও পরামর্শ পর্যালোচনা করে খসড়া পরিমার্জন করা হয়।’

খসড়া অধ্যাদেশে গুমকে সংজ্ঞায়নসহ চলমান অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। গোপন আটক কেন্দ্র স্থাপন বা ব্যবহারকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুমসংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্ত করতে ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। খসড়া অধ্যাদেশে গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষায় ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং অভিযোগ গঠনের ১২০ দিনের মধ্যে বিচারের বাধ্যবাধকতা, ভুক্তভোগী, তথ্যপ্রচারকারী ও সাক্ষীর সুরক্ষা, ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ ও আইনগত সহায়তা নিশ্চিতের বিধান সন্নিবেশ করা হয়েছে বলে জানান প্রেস সচিব।

তিন স্থলবন্দর বন্ধ, স্থগিত একটি : অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে সরকার যে তিনটি স্থলবন্দর বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেগুলো হলো নীলফামারীর চিলাহাটি স্থলবন্দর, চুয়াডাঙ্গার দৌলতগঞ্জ স্থলবন্দর এবং রাঙ্গামাটির তেগামুখ স্থলবন্দর। একই কারণে হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার বাল্লা স্থলবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ব্রিফিংয়ে শফিকুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশে অনেকগুলো স্থলবন্দর অনুমোদন থাকলেও সেগুলোর বেশিরভাগই কার্যত অকার্যকর। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকা বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম না থাকায় এগুলো চালু রাখতে গিয়ে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়। এসব স্থানে কর্মকর্তাদের পোস্টিং দিতে হয় এবং করদাতাদের অর্থ ব্যয় হয়।’

প্রেস সচিব জানান, ‘বর্তমানে কার্যক্রমহীন আরও চারটি স্থলবন্দরের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, যেগুলোর বিষয়ে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

এর আগে, গত ২ মার্চ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, তিনটি অলাভজনক ও কার্যক্রমহীন স্থলবন্দর সম্পূর্ণ বন্ধ এবং একটি স্থলবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধের সুপারিশ করা হয়। বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্র্তৃপক্ষের আটটি স্থলবন্দর কার্যকর বা অকার্যকরের বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের গঠিত যাচাই কমিটি এ সুপারিশ করে।

লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস : উপদেষ্টা পরিষদের সভায় প্রতিবছর ১৭ অক্টোবর মহান বাউল সাধক ফকির লালন শাহের তিরোধান দিবসকে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে শফিকুল বলেন, ‘ফকির লালন শাহ শুধু একজন গীতিকার বা সংগীতশিল্পী নন, তিনি ছিলেন একজন গভীর জীবনদর্শনের সাধক ও দার্শনিক। তার গান যুগের পর যুগ বাংলার মানুষের অন্তরে সাড়া জাগিয়েছে। লালনের দর্শন সাম্য, মানবপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক হিসেবে আজও আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়।’

প্রেস সচিব বলেন, ‘লালনের সংগীত বাউল সমাজের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা গ্রাম থেকে শহর-বাংলার প্রতিটি মানুষের সাংস্কৃতিক চর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। জাতীয়ভাবে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেলে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোতে লালনচর্চা ও গবেষণা নতুন মাত্রা পাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।’

শফিকুল আলম আরও জানান, ‘এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করবে। লালন আমাদের গ্লোবাল কালচারাল হেরিটেজের অন্যতম সম্পদ।’

উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অন্যান্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব যেমন কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ, চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান এবং রক সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়েও আলোচনা হয়। তবে চূড়ান্তভাবে কেবল ফকির লালন শাহের তিরোধান দিবসকে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার ও সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত