সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই তীব্র মৌসুমি বৃষ্টি ও বন্যায় বিপর্যস্ত। পাকিস্তানের পাঞ্জাব অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। প্রাদেশিক কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, টানা ভারী বর্ষণ এবং ভারতের দুটি বাঁধ থেকে পানি ছাড়ার সিদ্ধান্তের কারণে এই বিপদের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর লাহোরও। প্রায় একই পরিস্থিতি ভারতেও। দেশটির পাহাড়ি রাজ্য হিমাচল প্রদেশ-জম্মু কাশ্মীর এবারের বর্ষায় ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। প্রদেশের মানালির অবস্থাও শোচনীয়। বিপাশা নদীর প্লাবনে ভেসে গেছে শহরের বহু এলাকা। ভেঙে গেছে এক বহুতল হোটেলসহ বেশ কিছু দোকানপাট। মানালি-লেহ্ সড়কের বহু এলাকা প্লাবিত। আটকে রয়েছে বহু গাড়ি। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকরা উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকা বিদ্যুৎহীন। রাজ্য দুর্যোগ মোকাবিলা কর্র্তৃপক্ষের (এসডিএমএ) হিসাবে, চলতি বর্ষা মৌসুমে এখন পর্যন্ত ৩১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ভূমিধস, পাহাড়ি ঢল, ক্লাউডবার্স্ট, বজ্রপাত ও ডুবে যাওয়ার মতো ঘটনায় ১৫৮ জন মারা গেছে এবং সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৫২ জন।
ভারতের বাঁধ থেকে অতিরিক্ত পানি ছাড়ার ফলে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে আরও বড় বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধান খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত এই প্রদেশে দেশটির মোট ২৪ কোটি জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষ বসবাস করে। পারমাণবিক শক্তিধর ভারত ও পাকিস্তান গত মে মাসে সংক্ষিপ্ত সংঘাতের পর থেকেই মুখোমুখি অবস্থানে আছে। এখন বন্যার জন্য ভারতকে দায়ী করলে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা দেখা দিতে পারে। পাকিস্তানের প্রাদেশিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষ জানায়, ভারত রাভি নদীর ওপর থেইন বাঁধের সব কপাট খুলে দিয়েছে। তবে ভারতের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ভারত জানিয়েছে, তারা পাকিস্তানি কর্র্তৃপক্ষকে বন্যার বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছিল, দ্রুত ভরে ওঠা মাধোপুর বাঁধ থেকেও পানি ছাড়া হবে। দুটি বাঁধই রাভি নদীর ওপর, যা ভারতীয় পাঞ্জাব থেকে পাকিস্তানে প্রবাহিত। পাঞ্জাব কর্র্তৃপক্ষের কর্মকর্তা ইরফান আলি কাঠিয়া বলেন, বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ। আগামী ৪৮ ঘণ্টা হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষের এক মুখপাত্র জানান, স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে থেইন বাঁধ ৯৭ শতাংশ পূর্ণ। যেকোনো সময় পানি ছাড়া হতে পারে। ভারত বাঁধে অতিরিক্ত পানি জমলে নিয়মিত তা ছেড়ে দেয়, যা পাকিস্তানে প্রবাহিত হয়। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় পাঞ্জাব প্রদেশ দুই দেশে বিভক্ত হয়েছিল।
দিনের শুরুতে ভারত সরকারের এক সূত্র জানায়, তারা কোনো নির্দিষ্ট বাঁধের নাম উল্লেখ করেনি। তবে প্রবল বৃষ্টির কারণে টানা দুই দিনে দ্বিতীয় সতর্কবার্তা পাকিস্তানকে কূটনৈতিক চ্যানেলে পাঠানো হয়েছে। আরও সতর্কবার্তা দেওয়া হতে পারে কি না এমন প্রশ্নে সূত্রটি জানায়, তা সম্ভব। অন্য এক ভারতীয় সূত্র বলেন, মানবিক কারণে ইসলামাবাদের সঙ্গে তথ্য ভাগাভাগি করা হচ্ছে, যাতে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো যায়। কারণ প্রবল বর্ষণে ভারতেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষ জানায়, পাঞ্জাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ ১৪ আগস্টের পর স্বেচ্ছায় সরে গেছেন। রাভি, শতদ্রু ও চেনাব নদীর তীরবর্তী শতাধিক গ্রাম থেকে লোকজনকে সরানো হচ্ছে। সেনাবাহিনী উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করছে। তিন নদীতেই মাঝারি থেকে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। আগামী ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টায় পাঞ্জাব ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে আরও ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
ভারত সীমান্ত ঘেঁষা পশরুর শহর ঘুরে এসে ডেপুটি কমিশনার সাবা আসগর আলি জানান, ১৬টি গ্রাম বন্যার ঝুঁকিতে আছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণ শিবিরে খাবার, ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাঞ্জাব প্রদেশের সেচমন্ত্রী কাজিম রেজা পিরজাদা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পূর্বাঞ্চলীয় নদীগুলোতে আগের তুলনায় বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। জুনের শেষদিকে মৌসুমি বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর থেকে পাকিস্তানে বন্যায় ৮০২ জন মারা গেছে, যার অর্ধেকই চলতি মাসে। পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চল গিলগিট-বালতিস্তানে হিমবাহ দ্রুত গলছে। দক্ষিণের করাচি শহরের বড় অংশও গত সপ্তাহে প্লাবিত হয়েছিল।
এদিকে, প্রবল বৃষ্টি, ভূমিধস ও হঠাৎ নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বিপর্যস্ত ভারতের পাহাড়ি রাজ্য হিমাচল প্রদেশের জনজীবন। রাজ্য দুর্যোগ মোকাবিলা কর্র্তৃপক্ষের (এসডিএমএ) হিসাবে, চলতি বর্ষা মৌসুমে এখন পর্যন্ত ৩১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ভূমিধস, পাহাড়ি ঢল, ক্লাউডবার্স্ট, বজ্রপাত ও ডুবে যাওয়ার মতো ঘটনায় ১৫৮ জন মারা গেছে এবং সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৫২ জন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির খবর এসেছে কাংড়া (৩০) থেকে। এরপর মান্ডি (২৯), চাম্বা (১৪), কিন্নৌর (১৪) ও কুল্লু (১৩) জেলা থেকে। সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে চাম্বা, মান্ডি, কাংড়া, সোলান ও শিমলা জেলায়। বিপর্যয়ে রাজ্যের অবকাঠামোর ক্ষতিও বিপুল। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে সড়কপথে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১.৩১ হাজার কোটি টাকা। জল সরবরাহ ও সেচ ব্যবস্থার ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ৮৭২ কোটি টাকার বেশি আর বিদ্যুৎ খাতে ক্ষতি হয়েছে ১৩৯ কোটি টাকারও বেশি। ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষতিও কম নয়। এখন পর্যন্ত ৩২৪টি বাড়ি সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে, প্রায় ৪০০ বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাজারো দোকানপাট, গোয়ালঘর ও ছোট ব্যবসা নষ্ট হয়েছে। মারা গেছে প্রায় ১ হাজার ৮০০ গবাদিপশু ও ২৫ হাজারের বেশি হাঁস-মুরগি। এ বিপর্যয়ে রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তিনটি জাতীয় সড়কসহ অন্তত ৬৭০টি রাস্তা বন্ধ রয়েছে। অচল হয়ে পড়েছে ১ হাজার ৪১৩টি ট্রান্সফরমার ও ৪২০টি পানীয় জল সরবরাহ প্রকল্প। বিশেষ করে মান্ডি, কুল্লু, কাংড়া ও শিমলার বহু এলাকায় রাস্তা ধসে পড়ায় এসব এলাকার মানুষ কার্যত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।
এবার গোটা উত্তর ভারতে অভাবনীয় বৃষ্টি হচ্ছে। হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখন্ড ও জম্মু কাশ্মীর জুড়ে প্রকৃতির তাণ্ডব চলছে। প্রায় প্রতিদিনই হয় ভূমিধস নতুবা হড়কা বানে ভেসে যাচ্ছে জনপদ। মৃত্যু হচ্ছে মানুষ ও গবাদিপশুর। জম্মু কাশ্মীরে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে টানা চার দিন ধরে। জম্মুর পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। এই অঞ্চলের ডোডা, কিস্তোয়ার, সাম্বা, কাটরা, রিয়াসি, উধমপুর ও জম্মু জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত। প্রতিটি নদী বইছে বিপদসীমার ওপর দিয়ে। বহু স্থানে হড়পা বানে ভেসে গেছে জনপদ। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস, আরও দুই-তিন দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। গত মঙ্গলবার রাতে জম্মুতে বৈষ্ণোদেবী যাত্রাপথে ধস নামায় অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে ২৩ জন। জম্মুর রিয়াসি জেলার এসএসপি পরমবীর সিং বুধবার এই খবর জানিয়ে বলেছেন, ভারী বৃষ্টির দরুন উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। ধসের নিচে মোট কতজন আটকে রয়েছে, এখনই বলা যাচ্ছে না। চলতি মাসে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে দুর্যোগে মারা গেছে অন্তত ৬৮ জন।
বৈষ্ণোদেবী যাত্রাপথে গত মঙ্গলবার প্রথম ধস নামে দুপুরে, পরে রাতে। বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী আগে থেকে তৈরি ছিল। ধসের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় উদ্ধারকাজ। সেই কাজে হাত লাগায় সেনাবাহিনীও। কিন্তু প্রবল বৃষ্টিতে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হতে থাকে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষকে নিরাপদে সরানো হয়েছে। তাদের অস্থায়ী ত্রাণ শিবিরে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা শিবির খোলা হয়েছে। গুরুতর আহত ব্যক্তিদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিপর্যয়ের কারণে জম্মু কাশ্মীরে রেল পরিষেবা বন্ধ হয়ে গেছে। রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবহাওয়ার উন্নতি ও ভেঙে যাওয়া রেললাইন মেরামত না হওয়া পর্যন্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে। বিপর্যয়ের কারণে বিমান পরিষেবাও ব্যাহত হচ্ছে।
