ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে স্বতন্ত্র সহসভাপতি (ভিপি) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী শামীম হোসেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে শামীম হোসেনের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। সেই জনপ্রিয়তার প্রভাব ভোটেও পড়বে কি না? ভিপি পদে রয়েছেন একাধিক হাইভোল্টেজ প্রার্থী। তার কথাবার্তা, ভোটারের কাছে যাওয়ার কৌশল শেষ পর্যন্ত কাজে আসবে কি না এসব বিষয় নিয়ে দেশ রূপান্তর তার সঙ্গে কথা বলেছে। সেখানেই উঠে এসেছে স্বতন্ত্র শামীমের ম্যাজিক। তিনি ডাকসুকে রাজনৈতিক দলের হস্তক্ষেপমুক্ত রেখে শুধু শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
শামীম হোসেন বেড়ে উঠেছেন সাতক্ষীরার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। অল্প বয়সেই ইউনিয়ন পরিষদে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেখান থেকেই জনসম্পৃক্ততার অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে দেখলেন শিক্ষার মান ও পরিবেশ তার কল্পনার সঙ্গে মিলছে না। ক্লাসে ঠিকমতো জ্ঞান অর্জন হচ্ছে না, জোর করে ক্লাসে বসতে হয়। একসময় এখান থেকে দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্ব বের হয়েছেন, এখন সেই পরিবেশ নেই। এসব দেখে ভেবেছেন, শিক্ষার্থীদের সমস্যার কথা বলতে এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে ডাকসুর ভিপি পদে দাঁড়ানো দরকার।
এক প্রশ্নের জবাবে শামীম হোসেন বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে, এটি স্পষ্ট। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানেন কীভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের দাবি আদায় করতে হয়। আমি মনে করি, ডাকসুকে রাজনৈতিক দলের বাইরে রেখে শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সেটিই আমার লক্ষ্য।’
ভিপিকে শামীম হোসেন দেখেন প্রশাসনের সঙ্গে থেকে জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি পদ হিসেবে। দীর্ঘদিনের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক ইনস্টিটিউশনে পরিণত হয়েছে। শামীম ভিপি হয়ে সেই জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু করতে চান।
শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়ার কথা জানান শামীম। তিনি প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের কাছে যাচ্ছেন। তাদের সমস্যার কথা শুনছেন এবং তার ইশতেহার তুলে ধরেছেন।
শামীমের চোখে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সমস্যা হচ্ছে স্বাধীনতার পর ছাত্ররাজনীতির নামে হত্যার রাজনীতি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের কণ্ঠরোধ করার জন্য ১৯৯০ সালের পর ডাকসুকে জাদুঘরে পাঠানো হয়েছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক দলের প্রক্সি সংগঠনের হাতে চলে গেছে। যোগ্যতা নয়, রাজনৈতিক পরিচয়ই শিক্ষক বা প্রশাসনের নিয়োগের মানদ- হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা আবাসন সংকট, নিম্নমানের খাবার, লাইব্রেরিতে বইয়ের অভাব, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা এসব সমস্যায় ভুগছে। অথচ এসব নিয়ে কেউ কাজ করে না। কিছুদিন আগেও রাতে শিক্ষার্থীদের বারান্দায়, গণরুমে বা ছাদে ঘুমাতে হতো। নতুন হল নির্মাণের উদ্যোগ নেই। এগুলো জবাবদিহির অভাবের ফল। প্রশাসন বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে শিক্ষার মানের অবনতির বিষয় এড়িয়ে যান।
নির্বাচিত হলে তার অগ্রাধিকার হবে প্রথম কয়েক সপ্তাহ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের দখল হয়ে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধারে কাজ করবেন। প্রশাসন, সরকার এবং সিনিয়র উপদেষ্টাদের সহযোগিতায় এ প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব। ক্যাম্পাসে সীমানা ও রাস্তা নির্ধারণ করে নিরাপত্তা জোরদার করার কথা জানিয়েছেন। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা যেন নিরাপদ থাকেন।
শামীম মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রিফর্মেশন দরকার। এক বছরেই সব করা যাবে না, কিন্তু একটি উদাহরণ তৈরি করে যেতে চান তিনি। তিনি ডাকসু নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে যুক্ত করতে চান। নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া সিনেট বসতে দেবেন না। ওয়েবসাইট ও মিডিয়া সেল তৈরি করবেন, যেখানে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ জানাতে পারবেন। হলে হলে সাব-কমিটি করে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবেন। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও শিক্ষার্থীদের এখনো ম্যানুয়ালি ব্যাংকে গিয়ে ফি জমা দিতে হয়, স্লিপ ফটোকপি করে জমা দিতে হয়। অর্থাৎ, প্রযুক্তিগত বৈশ্বিক উন্নতির পরও এখানকার প্রশাসনিক ব্যবস্থা সময়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। এ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে চান শামীম।
শামীম বিশ্বাস করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা আছে। অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজে যেমন শিক্ষার্থীরা যোগ্যতা দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, এখানেও তাই হওয়া উচিত। যদি শিক্ষার্থীরা মনে করেন তিনি যোগ্য এবং তার ভাবনার সঙ্গে তারা সংযুক্ত হতে পারেন, তাহলে শামীম আশাবাদী শিক্ষার্থীরা তাকে ভোট দেবেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে শামীম জানান, প্যানেলে গেলে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। তিনি যা ভাবেন বা করতে চান। প্যানেলের কারণে সবটা বলা সম্ভব হতো না। তাই শিক্ষার্থীদের স্বার্থে, স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্যই তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। এই স্বতন্ত্র বোধটাই স্বতন্ত্র শামীমের ম্যাজিক।
